তারপর চোখ বুজে পুনরায় কুরআন তিলাওয়াত আরম্ভ করেন।
তুমি চিৎকার করছো না কেন?- ইসহাকের পার্শ্বে দণ্ডায়মান সিপাহী বললো তুমি উচ্চস্বরে চিৎকার করো; তাতে তোমার কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে।
আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না- ইসহাক বললেন- চাক্কিটা আরো সামনের দিকে ঠেলে দাও।
কয়েদখানার হিংস্র প্রকৃতির এই সিপাহী হাবশীদের বললো- চাক্কি আরো চালাও। হাবশীদের ধাক্কা খেয়ে চাক্কি আরো সম্মুখে চলে যায়। ইসহাকের দেহটা মট মট করে শব্দ করে ওঠে। শুনে অপর এক সিপাহী ছুটে আসে। এসে সঙ্গীকে বললো- তোমাকে কে চাক্কি চালাতে বললো? লোকটা তো মরে যাবে। একে আরো কিছু সময় বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
চাকি কিছুটা নীচু করে দেয়া হয়।
লোকটা বলছে, তার নাকি কোনো কষ্ট হচ্ছে না। সিপাহী তার সঙ্গীকে বললো।
তোমার কি চেতন আছে?- সিপাহী ইসহাককে জিজ্ঞেস করে- তুমি কী বলছো?
অবচেতন মনে বলছে- অপর সিপাহী বললো- তুমি চাক্কি যে পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে গেছো, সে পর্যন্ত গেলে মানুষ মারা যায়। লোকটার চেতন থাকতে পারে না।
আমার হুশ-জ্ঞান ঠিক আছে বন্ধুগণ!- ক্ষীণ কণ্ঠে ইসহাক বললেন- আমি আমার প্রভুর সঙ্গে কথা বলছি।
সিপাহীদ্বয় বিস্ময়ের সাথে পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ী করে। একজন বললো- লোকটাকে তো অতোটা শক্তিশালী মনে হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে তো মহিষের ন্যায় হাবশীরাও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। লোকটা বোধ হয় আলিম হবে। তার সঙ্গে আল্লাহর শক্তি আছে।
হা, তোমরা ঠিক বলেছো- ইসহাক বললেন- আমার নিকট আল্লাহর শক্তি আছে। আমি তাঁর কালাম পাঠ করছি। তোমরা চাক্কি পুরোপুরি চালিয়ে দেখো, আমার দেহ দুভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে এবং উভয় অংশ থেকে এই আওয়াজই শুনতে পাবে, যা এ মুহূর্তে শুনতে পাচ্ছো।
সিপাহী মুসলমান নয়। সুস্থ কোনো আদর্শ তার নেই। কুসংস্কারই তার ধর্ম। পীর-ফকির, পাগল-দেওয়ানারা তার খোদা। মূর্তিপূজাও করে সে। এই চাক্কির মর্ম ভালোভাবে বুঝে সে। ইতিপূর্বে সে দেখেছে, এই চার্জির সঙ্গে বাঁধা মানুষটি তার সামান্য আন্দোলনেই চিৎকার করে ওঠতো এবং সবকিছু মেনে নিতো। চাক্কির আন্দোলন একটু বাড়িয়ে দিলে অজ্ঞান হয়ে যেতো এবং কিছুক্ষণ পর মরে যেতো। কিন্তু ইসহাক চাক্কির সর্বশেষ কার্যকারিতা পর্যন্ত বেঁচে রইলো এবং সচেতন রইলো। তাতে সিপাহী বুঝে ফেলেছে এই লোকটি কোনো সাধারণ মানুষ নয়।
তুমি কি আকাশের অবস্থা জানো? এক সিপাহী জিজ্ঞেস করে।
আমার আল্লাহ জানেন। ইসহাক জবাব দেন।
তোমার আল্লাহ কোথায়? সিপাহী জিজ্ঞেস করে।
আমার অন্তরে- ইসহাক জবাব দেন- এতো নির্যাতনের পরও তিনি আমাকে যন্ত্রণা হতে রক্ষা করছেন। আমার কোনো কষ্টই হচ্ছে না।
আমি গরীব মানুষ- এক সিপাহী বললো- এখানে তোমার মতো মানুষদের হাড় ভেঙ্গে স্ত্রী-সন্তানদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করি। তুমি আমার অবস্থার পরিবর্তন করে দিতে পারো।
বাইরে গিয়ে- ইসহাক বললেন- আমি যা কিছু পাঠ করছি, তোমাকে শিখিয়ে দেবো তোমার কিসমত বদলে যাবে।
আমরা চাক্কি নীচু করে দিচ্ছি- এক সিপাহী বললো- সালারকে আসতে দেখলে আবার উপরে তুলে দেবো।
না- ইসহাক বললো- আমি তোমাকে এই খেয়ানত করতে দেবো না। এটাই আমার শক্তি। একেই আমরা ঈমান বলে থাকি।
আমরা তোমাকে সাহায্য করবো- এক সিপাহী বললো- তুমি যখন যা বলবে, তা-ই করে দেবো। সম্ভব হলে তোমাকে কয়েদখানা থেকে বের হতে সাহায্য করবো।
***
সালার এসে গেছে।
কী ব্যাপার, এখনও তোমার জ্ঞান ঠিক আছে বিস্ময়ের সুরে সালার জিজ্ঞেস করে।
আমার আল্লাহ আমার হুশ-জ্ঞান ঠিক রেখেছেন। ইসহাক জবাব দেন।
সালারের ইঙ্গিতে চাক্কিটা আরো সম্মুখে চালানো হয়। ইসহাক স্পষ্ট অনুভব করেন, তার দেহটা দ্বিখণ্ডিত হয়ে আলাদা হয়ে গেছে এবং তার জীবনের শেষ হূর্ত এসে পড়েছে। তিনি কোঁকাতে কোকাতে আরো উচ্চস্বরে কালামে পাক তিলাওয়াত শুরু করেন। চাক্কি আরো সম্মুখে এগিয়ে নেয়া হলো। ইসহাকের দেহ থেকে মট মট শব্দ শোনা যায়, যেনো তার হাড়গুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে।
এই ভেবে খুশী হয়ো না যে, আমরা তোমাকে জীবনে মেরে ফেলবো নী সালার বললেন- তুমি জীবিত থাকবে এবং তোমার সঙ্গে প্রতিদিন এরূপ আচরণ হতেই থাকবে। মেরে ফেলে আমরা তোমাকে নিপীড়ন থেকে মুক্তি দেবো না।
ইসহাক কোনো জবাব দিলেন না। তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকেন।
সালারের ইঙ্গিতে চাক্কি কিছুটা নীচে নামিয়ে দেয়া হলো। ফৌজের অপর এক অফিসার সালারের সঙ্গে ছিলো। সালার তাকে সরিয়ে নিয়ে বললো লোকটা বড় কঠিনপ্রাণ মনে হচ্ছে। এতো নিপীড়নের পরও অচেতন পর্যন্ত হলো না। শাস্তির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলে মারা যাবে। কিন্তু লোকটাকে আরো কদিন বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমি অন্য একটি পন্থা ভাবছি। জানতে পেরেছি তার চৌদ্দ-পনের বছরের একটি মেয়ে আছে। স্ত্রীও আছে। তাদেরকে এই বলে এখানে নিয়ে আসবে যে, ইসহাক কয়েদখানায় মৃত্যু শয্যায় শায়িত। ইচ্ছে হলে তাকে দেখে যেতে পারে। আর যদি মৃত্যুবণ করে, লাশটা নিয়ে যাবে।
হ্যাঁ- অফিসার বললো- এভাবে ধোকা দিয়েই আনতে হবে। অন্যথায় ওখানকার মুসলমানরা আমাদের কাউকে তাদের এলাকায় ঢুকতে দেবে না।
এনে তাদেরকে উলঙ্গ করে এর সম্মুখে দাঁড় করিয়ে রাখবো- সালার বললো- তারপর তাকে বলবো, আমাদের শর্ত মেনে নাও, অন্যথায় তোমার যুবতী মেয়ে ও স্ত্রীকে তোমার চোখের সামনে অপদস্ত করা হবে।
