এখানে আটক শত্রুসেনাদের কিরূপ নির্যাতন-নিপীড়ন করা হচ্ছে, এই পাতাল কক্ষে ঘুরিয়ে ইসহাককে তার দৃশ্য দেখানো হলো। স্থানে স্থানে রক্ত। কোনো কোনো বন্দী বমি করছে। কয়েকজন অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। নির্যাতনের সব ধরন প্রদর্শন করিয়ে সুদানী সালার ইসহাককে জিজ্ঞেস করে এবার বলো কোন্ পন্থাটি তোমার পছন্দ হয়। তবে নির্যাতন-নিপীড়ন ছাড়াই যদি তুমি আমাদের কথা মেনে নাও, তাহলে তোমারই জন্য তা কল্যাণকর হবে।
তোমাদের যেমন খুশী আমার উপর নিপীড়ন চালাও। আমাকে যেখানে খুশী নিয়ে যাও। আমি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবো না। ইসহাক বললেন।
তোমাকে দিয়ে আমরা কী করাতে চাই, আমি পুনরায় তোমাকে বলে দিচ্ছি- সালার বললো- তোমাকে বলা হয়েছিলো, সবকটি মুসলিম কবিলাকে সুদানী বাহিনীতে নিয়ে আসো। বিনিময়ে তোমাকে মুক্তি দেয়া হবে এবং মুসলিম গোত্রসমূহের শাসকও নিযুক্ত করা হবে। কিন্তু সেই সুযোগ তুমি হারিয়ে ফেলেছে। এবার প্রস্তাব হলো, আমাদের মতে চলে আসো, বিনিময়ে তোমাকে নিপীড়ন থেকে রেহাই দেয়া হবে এবং সুদানী ফৌজের সম্মানজনক একটি পদ দেয়া হবে।
আমার কোন পদের প্রয়োজন নেই। তোমরা আমার সঙ্গে যেমন খুশী আচরণ করো। ইসহাক বললেন।
ইসহাকের নিপীড়নের পালা শুরু হলো। পায়ে শিকল পরিয়ে পা দুটো ছাদের সঙ্গে বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হলো। সালার সিপাহীদের বললো- একে সন্ধ্যা পর্যন্ত এভাবে থাকতে দিও। সন্ধ্যার সময় লাশের কক্ষে ফেলে এসো। আশা করি, এতটুকুতে লোকটার মস্তিষ্ক পরিষ্কার হয়ে যাবে।
***
সন্ধ্যা নাগাদ ইসহাক সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। যখন জ্ঞান ফিরে পান, তখন তিনি মিশরী সহকর্মীর লাশের নিকট পড়ে আছেন। কক্ষের এক কোণে সামান্য পানি আর কিছু খাবার রাখা ছিলো। ইসহাক পানিটুকু পান করেন এবং খাবার খান। তিনি লাশটিকে উদ্দেশ করে বললেন- আমি তোমার আত্মার সঙ্গে প্রতারণা করবো না। শীঘ্রই আমি তোমার নিকট চলে আসছি।
কথা বলতে বলতে ইসহাকের চোখ বুজে আসছে। ইসহাক ঘুমিয়ে পড়েন।
মধ্যরাতে তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে চাকার সঙ্গে বাঁধা হলো। সুদানী সালার উপস্থিত। সে বললো- হাজার হাজার মুসলমান আমাদের সঙ্গে আছে। তুমি বোধ হয় পাগল হয়ে গেছো। তুমি ইসলামের জন্য ত্যাগ দিচ্ছে; অথচ সালাহুদ্দীন আইউবী নিজের রাজত্ব বিস্তারের জন্য তোমার ন্যায় পাগলদেরকে মৃত্যুর হাতে তুলে দিচ্ছে। লোকটা মদও পান করে, নারীও ভোগ করে। আর তোমরা কিনা তার নামে জীবন উৎসর্গ করছে।
সেনাপতি মহোদয়!–ইসহাক বললেন তোমাকে আমার ধর্ম ও সুলতানের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলা থেকে বিরত রাখার সাধ্য আমার নেই। আর তুমিও আমাকে আমার ধর্ম ও রাজ্যের জন্য জান কুরবান দেয়া থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারবে না। আমার জাতির কোনো গোত্রের একজন মুসলমানও তোমার ফৌজে যোগ দেবে না। মুসলমান মুসলমানের বিরুদ্ধে তরবারী উত্তোলন করে না।
তুমি সম্ভবত জানো না আরবে মুসলমান মুসলমানের রক্ত ঝরাচ্ছে- সালার বললো- খৃস্টানরা ফিলিস্তিনে বসে বসে তামাশা দেখছে। সকল আমীর ও মুসলিম শাসকগণ সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।
তারা হয়ত করেছে- ইসহাক বললেন- কিন্তু আমি করবো না। যারা ইসলাম ও ইসলামী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, তারা এ জগতেও ভুগবে, পরজগতেও ভুগবে। তুমি তোমার সময় নষ্ট করো না। আমার সঙ্গে যা কিছু করতে চাও করে ফেলে। তারপর আরেকজন সুদানী মুসলমানকে ধরে আনো। তার দ্বারা তোমার কাজ হতে পারে।
আমরা জানতে পেরেছি, তুমি শুধু একটা ইশারা করলেই সমস্ত মুসলমান আমাদের সঙ্গে চলে আসবে- সালার বলল- আমরা তোমার দ্বারা এ কাজ বিনামূল্যে করাতে চাই না। আমরা তোমার ভাগ্য বদলে দেবো।
আমি শেষবারের মতো বলছি, আমি আমার জাতিকে বিক্রি করবো না। ইসহাক বললেন।
ইসহাক চাক্কির সঙ্গে বাঁধা। লম্বা যে খুঁটিটা ধাক্কা দিলে চাক্কি নড়তে শুরু করে, তিন-চারজন হাবশী তার সন্নিকটে দণ্ডায়মান। সুদানী সালারের ইঙ্গিত। পেয়ে তারা খুঁটিটা ধাক্কা দিয়ে একপা সম্মুখে সরিয়ে দেয়। চাক্কি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে। ইসহাকের দেহটা একবার উপরে একবার নীচে উঠানামা করতে থাকে। তার বাহুদ্বয় কাঁধ থেকে আর পদদ্বয় হাঁটু থেকে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। শরীর থেকে তার এমন ধারায় ঘাম ঝরতে শুরু করে, যেনো কেউ উপর থেকে পানি ঢেলে দিয়েছে।
এবার ভেবে-চিন্তে জবাব দাও। ইসহাকের কানে সুদানী সালারের কণ্ঠ ভেসে আসে।
আমি ঈমান বিক্রি করবো না। ইসহাক ক্ষীণকণ্ঠে জবাব দেন।
চাক্কিটা আরো সম্মুখে টেনে নেয়া হয়। ইসহাকের গায়ের চামড়া ছিলে যেতে শুরু করে।
এখনও সময় আছে, জবাব দাও।
আমার লাশও একই উত্তর দেবে- আমি ঈমান বিক্রি করবো না। বড় কষ্টে ইসহাক জবাব দেন।
একে কিছুক্ষণ এভাবে থাকতে দাও- সালার আদেশ করে। তারপর প্রস্তাব মেনে নেবে।
ইসহাক কুরআন তিলাওয়াত করতে শুরু করেন। সালার চলে যায়। তার দেহের জোড়াগুলো যেনো খুলে যাচ্ছে। চামড়াগুলো ছিলে যাচ্ছে। মুখটা আকাশের দিকে। তিনি কল্পনায় মহান আল্লাহকে সম্মুখে দেখতে পান। বললেন- ইয়া আল্লাহ! আমি গুনাহগার। তুমি আমাকে আরো শাস্তি দাও। আমি যদি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি, তাহলে তুমি আমাকে শাস্তিদান করো। তোমার সম্মুখে আমি লজ্জিত হতে চাই না।
