দেখো মেয়ে- ইসহাক বললেন- আমি মুসলমান। আমার চিন্তাধারা ও চরিত্র তোমার চেয়ে ভিন্ন। আমার ধর্ম আমাকে বেগানা মেয়েকে সঙ্গে রাখার অনুমতি দেয় না। আমি তোমাকে আমার এই কক্ষে রাখতে পারি না। যদি তুমি এই কক্ষে রাত কাটানোর আদেশ নিয়ে এসে থাকো, তাহলে তুমি থাকো, আমি বাইরে গিয়ে ঘুমাই।
আমার জন্য এটাও অপরাধ বলে বিবেচিত হবে- মেয়েটি বললো আপনি আমাকে এই কক্ষে থাকতে দিন। আমার প্রতি দয়া করুন। মেয়েটি বুঝে ফেললো, লোকটি পাথর। তাই সে ইসহাকের নিকট অনুনয়-বিনয় করতে শুরু করলো।
তোমার কাজ কী?- ইসহাক জিজ্ঞেস করেন- তোমাকে আমার কাছে কী উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে? যদি বলো, থাকতে দেবো।
আমার কাজ হলো আপনার ন্যায় পুরুষদেরকে মোমে পরিণত করা- মেয়েটি জবাব দেয়- আপনিই প্রথম পুরুষ, যিনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। আমি বহু ধর্মীয় কর্ণধারকে আমার অনুরক্ত বানিয়েছি এবং তাদেরকে সুদানের ছাঁচে ঢেলে নিজের মতো করে প্রস্তুত করেছি। মেয়েটি জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা, সত্যিই কি আপনি আমাকে কুৎসিত ভেবেছেন, নাকি ঠাট্টা করলেন?
তোমরা যাকে সুগন্ধি বলো, আমার কাছে তা দুর্গন্ধ- ইসহাক বললেন আমার দৃষ্টিতে তুমি বাস্তবিকই কুৎসিত। যা হোক, তুমি যেখানে ইচ্ছা শুয়ে পড়ো। আচ্ছা, তুমি খাটে শোও, আমি মেঝেতে শোবো।
মেয়েটি মেঝেতে শুয়ে পড়ে।
তোমার নাম কী মেয়ে? ইসহাক জিজ্ঞেস করেন।
আশি।
তোমার ধর্ম?
আমার কোনো ধর্ম নেই।
তোমার পিতামাতা কোথায় থাকেন?
জানি না।
ইসহাকের চোখে ঘুম এসে যায়। অল্পক্ষণ পরই তিনি নাক ডাকতে শুরু করেন।
***
আপনারা এমন এক ব্যক্তির পেছনে সময় নষ্ট করছেন- আশি বললো। তার সম্মুখে সুদানী ফৌজের পদস্থ অফিসারগণ উপবিষ্ট- তার মধ্যে চেতনা বলতে কোনো বস্তু নেই। আমি কত কঠিন পাথরকে মোমে পরিণত করেছি, আপনারা তা জানেন। কিন্তু এর মতো মানুষ আমি আর দেখিনি।
বোধ হয় তুমি কোনো ত্রুটি করেছে। এক অফিসার বললো।
ইসহাককে জালে আটকবার জন্য যা যা করেছে, যতো সব ফাঁদ-ফন্দি অবলম্বন করেছে, মেয়েটি তার সবিস্তার বিবরণ প্রদান করে এবং জানায় আমি যতো যা কিছু করেছি, তিনি হেসে উড়িয়ে দিয়ে আমার প্রতি নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকেন এবং কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়েন।
সুদানী কর্মকর্তাগণ চার-পাঁচদিন পর্যন্ত ইসহাককে তাদের মতে আনার চেষ্টা চালাতে থাকে। তার মানসিকতা পরিবর্তনের কোনো পন্থাই তারা বাদ রাখেনি। কিন্তু ইসহাকের একটাই কথা- আমি মিশরী ফৌজের একটি ইউনিটের কমান্ডার, আমি মুসলমান, আমি একজন বন্দী।
অবশেষে তাকে মহল থেকে বের করে কয়েদখানায় নিয়ে একটি সংকীর্ণ প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ করে রাখা হলো। কক্ষের ছিদ্রযুক্ত দরজা তালাবদ্ধ করে রাখা হলো। কক্ষটি এতোই দুর্গন্ধময় যে, ইসহাকের মস্তিষ্ক বিগড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
রাতের বেলা। কক্ষটি অন্ধকার। এক সৈনিক একটি বাতি নিয়ে এসে দরজার ছিদ্র দিয়ে ইসহাকের হাতে দেয়। ইসহাক বাতিটি মেঝেতে রেখে দেয়। বাতির আলোতে তিনি কক্ষে পচা-গলা লাশ দেখতে পায়। লাশটির মুখ খোলা। চোখও খোলা। ইসহাক সৈনিককে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, এটি কার লাশ?
তোমার কোনো এক বন্ধুর- সৈনিক জবাব দেয়- কোনো এক মিশরী। যুদ্ধে ধরা পড়েছিলো। লোকটাকে অনেক নির্যাতন করে খুন করা হয়েছে। পাঁচ-ছয় দিন আগে এই কক্ষে মারা গেছে।
তা লাশটা এখানে পড়ে আছে কেন? ইসহাক জিজ্ঞেস করেন।
তোমার জন্য- সৈনিক অবজ্ঞার সুরে বললো- তাকে তুলে নেয়া হলে তুমি একা হয়ে যাবে তাই। সৈনিক অট্টহাসি হেসে চলে যায়।
ইসহাক বাতিটা উপরে তুলে লাশটা পরখ করতে থাকে। পোশাক দেখে বুঝে ফেলেন লোকটা মিশরী ফৌজের সদস্য।
ইসহাক কক্ষে প্রবেশ করার পর যে দুর্গন্ধ অনুভব করেছিলেন, তা উবে যায়। তিনি গলিত লাশটির মুখমণ্ডলে হাত বুলিয়ে বললেন- তোমার দেহ নিঃশেষ হয়ে যাবে। তোমার আত্মা সতেজ থাকবে। তুমি আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছো। তুমি আমার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। তুমি জীবিত আছে এবং জীবিত থাকবে! সৈনিক ঠিকই বলেছে যে, তুমি না থাকলে আমি নিঃসঙ্গ হতাম।
ইসহাক দীর্ঘক্ষণ সঙ্গীর লাশের সঙ্গে কথা বলেন। তারপর তার পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ভোরে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তিনি দেখতে পান, সেই সুদানী সালার দাঁড়িয়ে আছে। সৈনিক বললো- কিছুর প্রয়োজন হলে বলুন, এনে দেই।
আমি তোমার উদ্দেশ্য বুঝি-ইসহাক বললেন- আমি পরাজিত। তুমি আমাকে তিরস্কার করতে পারো। তবে সত্যিই যদি তুমি আমার প্রয়োজন পূরণ করতে আগ্রহী হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই রণাঙ্গন থেকে তোমরা মিশরের পতাকা কুড়িয়ে পেয়ে থাকবে। আমাকে একটি পতাকা এনে দাও, লাশটা ঢেকে রাখি।
সালার অট্টহাসি হেসে বললো- আমরা কি তোমাদের পতাকা বুকে জড়িয়ে। রেখেছি? মিশরের কোনো পতাকায় হাত লাগানোকেও আমরা অপমানবোধ করি। সে সিপাহীকে বললো- একে এখান থেকে বের করে নীচে নিয়ে যাও। লাশ এখানে পড়ে থাকুক।
ইসহাককে কয়েকখানার পাতাল কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। এখানে অসহনীয় উকট দুর্গন্ধ। ইসহাক বুঝে ফেললেন, এখানেও লাশ আছে, অনেকগুলো লাশ। সুদানী সালার আগে আগে হাঁটছে। এক স্থানে ছয়-সাতজন মিশরী উল্টো মুখো ঝুলে আছে। তাদের বাহুর সঙ্গে পাথর বাঁধা। এক ধারে এক ব্যক্তিকে বড় একটি ক্রুশের সঙ্গে এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে যে, তার দুহাতের তালুতে একটি করে পেরেক গাঁথা। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে।
