হ্যাঁ, মোহতারাম সুলতান!- সালার বললেন- এ এক মূল্যবান সম্পদ, যা আমরা ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য রেখে যাব। বীরত্বের কাহিনী পাঠ করে জাতিসমূহ বেঁচে থাকে।
তুমি সম্ভবত জানো না, আমাদের সৈনিকরা দেশ থেকে অনেক দূরে জাতির দৃষ্টির আড়ালে এমন যুদ্ধ লড়ে যাচ্ছে, যার নির্দেশ আমরা তাদেরকে দেইনি। সুলতান আইউবী বললেন- তাদের উপর তাদের ধর্মের মর্যাদাবোধ জাগ্রত থাকে। তাদের নিজেদের জীবন বলতে কিছু থাকে না। তাদের কোনো ব্যক্তিসত্ত্বা নেই। তারা দুশমনের কজায় পড়েও স্বাধীন থাকে। জাতি যখন বিজয় অর্জন করে, তখন তারা তাদের সম্পর্কে অবহিত থাকে। তারা পর্দার আড়ালে থেকে বিস্ময়কর ও অভিনব পদ্ধতিতে লড়াই করে জাতির নাম উজ্জ্বল করে থাকে।
সে যুগের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিতে এরূপ জনাকয়েক সৈনিকের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাদের আলোচনা সুলতান আইউবী করেছিলেন। তাদের একজনের নাম আমর দরবেশ। লোকটি সুদানী মুসলমান। উপরে উল্লেখিত হয়েছে যে, সুলতান আইউবীর ভাই তকিউদ্দীন সুদানের সেনা অভিযান প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তারা দুশমনের প্রতারণার শিকার হয়ে সুদানের মরু অঞ্চলে এতো দূরে চলে গিয়েছিলো যে, সে পর্যন্ত রসদের সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব ছিলো না। দুশমন তাদের রসদের পথ বন্ধ করে দেয় এবং তকিউদ্দীনের বাহিনীকে বিক্ষিপ্ত করে তাদের কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে বিচ্ছন্ন করে দিয়েছিলো। তাতে ইসলামী বাহিনীর অনেক ক্ষতি সাধিত হয়েছিলো। অগ্রযাত্রার আশা তো শেষ হয়েই গিয়েছিলো। এমনকি পিছপা হওয়াও সম্ভব ছিলো না। বহু সৈন্য বন্দীত্ব বরণ করে। তাদের মধ্যে তকিউদ্দীনের দু তিনজন নায়েব, সালার এবং কমান্ডার ছিলেন।
এই বন্দীদের মধ্যে মিশরী এবং বাগদাদীদের সংখ্যা ছিলো বেশী। কয়েকজন সুদানী মুসলমানও ছিলো। শেষে সুলতান আইউবী তার সামরিক দক্ষতা এবং অস্বাভাবিক বিচক্ষণতার বিনিময়ে তকিউদ্দীনের বিক্ষিপ্ত সৈন্যদেরকে সুদান থেকে বের করে এনেছিলেন। তারপর তিনি এই বার্তাসহ সুদানীদের নিকট দূত প্রেরণ করেন যে, আমার যুদ্ধ বন্দীদের মুক্তি দিয়ে দাও। সুদানীরা আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। কারণ, সুলতান আইউবীর নিকট তাদের কোনো বন্দী ছিলো না। তারা বন্দীদের বিনিময়ে মিশরের কিছু ভূখণ্ড দাবি করে। সুলতান আইউবী জবাব দেন- তোমরা আমাকে ও আমার সন্তানদের ফাঁসি দিয়ে দাও। তবু আমি সালতানাতে ইসলামিয়ার এক ইঞ্চি ভূমি তোমাদেরকে দেবো না। আমার সৈনিকরা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মুসলমান। তারা জাতির ইজ্জতের জন্য জীবন কুরবান করতে জানে।
তারপর সুদান সরকার হাবশীদের দ্বারা মিশর আক্রমণ করায়। এই আক্রমণ অভিযানে অংশগ্রহণকারী একজন হাবশীও সুদান ফিরে যেতে পারেনি। যারা জীবিত ছিলো, তাদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। আশা ছিলো, সুদানীরা বন্দীদের মুক্তির দাবি জানাবে। কিন্তু তারা কোনো দূত প্রেরণ করেনি। এই হাবশীদেরকে তারা ধোকা দিয়ে মিশর এনেছিলো। এরা তাদের নিয়মিত সৈনিক ছিলো না। সুলতান আইউবী এই হাবশী কয়েদীদেরকে তার সেনাবাহিনীর শ্রমিক বানিয়ে নেন। তাদের দ্বারা মাটি খনন, বোঝা বহন এবং এ জাতীয় অন্যান্য কাজ নেয়া হতো।
সুদানীরা সুলতান আইউবীর সৈন্যদেরকে মুক্তি না দেয়ার মূল কারণ ছিলো, তারা তাদেরকে সুদানী ফৌজে যোগ দেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছিলো। সুদানীদের নিকট খৃস্টান উপদেষ্টা ছিলো। তারাই তাদেরকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করছিলো। মিশরী সৈন্যদেরকে ফুসলিয়ে সুদানী বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার পরিকল্পনাও তাদেরই শেখানো ছিলো। তারা কতজন মিশরী সৈনিককে এভাবে দলে ভেড়াতে সক্ষম হয়েছিলো, ইতিহাস তার সংখ্যা জানাতে অপারগ। ভরে সুদানীদের প্রতি ভালোবাসার অস্ত্র যাকেই ঘায়েল করতে ব্যর্থ হয়েছিলো, তাকেই অত্যন্ত নির্দয় ও নির্মম নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে হত্যা করেছিলো, সে তথ্য প্রমাণিত।
এই কয়েদীদের মধ্যে ইসহাক নামক এক সেনা কর্মকর্তা ছিলেন, যিনি সুলতান আইউবীর কোন এক সেনা ইউনিটের কমান্ডার ছিলেন। তিনি ছিলেন সূদনের অধিবাসী। যৌবনেই মিশরী বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। সুদানের এক পাহাড়ী এলাকায় কিছু মুসলমানের বাস ছিলো। যাদের সংখ্যা চার থেকে পাঁচ হাজারের মধ্যে। তাদের বিভিন্ন গোত্র ছিলো। কিন্তু ইসলাম তাদের মাঝে ঐক্য সৃষ্টি করে রেখেছিলো। সবকটি গোত্রের কমান্ডারদের একটি পঞ্চায়েত ছিলো। সকল গোত্রের সব মানুষ এই পঞ্চায়েতের আইন ও সিদ্ধান্ত মেনে চলতো। তারা মিশরী ফৌজে ভর্তি হতো এবং সুদানী ফৌজকে এড়িয়ে চলতো। তারা ছিলো যোদ্ধা এবং সাহসী। তীরন্দাজীতে অভিজ্ঞ ছিলো তারা। সুদানী ফৌজ ও সরকার প্রলোভন দেখিয়ে এবং আক্রমণ করে নিঃশেষ করে দেয়ার হুমকি দিয়েও তাদেরকে ঘায়েল করতে পারেনি। কিন্তু ঈমানী শক্তির পাশাপাশি তাদের একটি সহায়ক শক্তি ছিলো পাহাড়। সুদানীরা তাদের উপর। দুবার আক্রমণ করেছিলো। কিন্তু তীরন্দাজরা পাহাড়ের চূড়া থেকে তীর বর্ষণ করে তাদেরকে প্রতিহত ও পরাজিত করে।
তকিউদ্দীনের সামরিক পদস্খলনের কারণে সুদানীদের হাতে বহুসংখ্যক মিশরী সৈন্য বন্দী হয়েছিলো। ইসহাক তাদের একজন। নিজ গোত্রসমূহের উপর তার ব্যাপক প্রভাব ছিলো। বন্দী হওয়ার পর সুদানীরা তাকে প্রস্তাব করে, তুমি তোমার মুসলিম গোত্রগুলোকে সুদানী ফৌজে যোগ দিতে সম্মত করো, তাহলে তোমাকে শুধু মুক্তিই দেয়া হবে না বরং যে পাহাড়ী অঞ্চলগুলোর অধিবাসীরা মুসলমান, সেই সবগুলো অঞ্চল নিয়ে একটি আলাদা রাজ্য গঠন করে তোমাকে তার গভর্নর বা রাজা নিযুক্ত করা হবে।
