সুলতান আইউবী আয়রকে হাসান ইবনে আবদুল্লাহর হাতে তুলে দিয়ে বললেন- এর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিন। লোকটি আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফেলেছে। আমি ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না, দুশমনের গুপ্তচর পূর্ণ তথ্য নিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তারা আমাদের ফাঁদে এসে পা দিলো কেন! এবার বুঝলাম, আযর পালিয়ে সংবাদ জানাতে যায়নি- গিয়েছিলো পিতাকে খুন করতে!
পরদিন। সুলতান আইউবী তাঁবুতে ঘুমিয়ে আছেন। বাইরে অনেকগুলো লোকের কথোপকথনে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সুলতান দারোয়ানকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন- বাইরে কী হচ্ছে? দারোয়ান বললো- আপনার মোহাফেজদের উর্দি পরে এবং আপনার ঝাণ্ডা উঁচিয়ে নয়জন লোক এসেছে। বলছে, তারা দামেস্ক থেকে এসেছে। তারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে আপনার রক্ষী বাহিনীতে কাজ করতে চায়। বাধা দেয়া হলে তারা বললো, তারা বহুদূর থেকে পরম ভক্তি ও জযবা নিয়ে এসেছে। তারা আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায়।
এরা শেখ সান্নান ও গোমস্তগীনের প্রেরিত সেই ঘাতকচক্র। কৌশল তাদের সফল। সুলতান আইউবী দারোয়ানকে বললেন- তাদেরকে ভিতরে পাঠিয়ে দাও।
তাদের হাতের বর্শাগুলো বাইরে রেখে দেয়া হয়েছে। তারা সুলতান আইউবীর তাবুতে প্রবেশ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে যার যার খঞ্জুর ও তরবারী বের করে হাতে নেয়। সুলতান আইউবীর দুজন রক্ষীও তাদের সঙ্গে প্রবেশ করে। এক ঘাতক সুলতান আইউবীর উপর হামলা করে বসে। সুলতান দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে আক্রমণ প্রতিহত করেন। তিনি নিজের তরবারীটা হাতে তুলে নেন। প্রথম আঘাতেই আক্রমণকারী দুবৃত্তের পেট চিড়ে ফেলেন। তাঁবুর ভেতরের স্থানটা সংকীর্ণ। অন্যান্য ঘাতকরাও সুলতানের উপর আক্রমণ করে। রক্ষীদ্বয় শক্ত হাতে তাদের মোকাবেলা করে। বাহির থেকে অন্যান্য রক্ষীরাও এসে পড়ে।
সুলতান আইউবীর তাবুতে তরবারী ও খঞ্জরের সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। দেহরক্ষীরা ঘাতকদেরকে নিজেদের সঙ্গে ব্যস্ত করে ফেলে। লড়াই করতে করতে তারা তাঁবুর বাইরে চলে আসে। সুলতান আইউবীর লম্বা তরবারী কাউকে কাছে আসতে দিচ্ছে না। পাঁচ-ছয়জন ঘাতক প্রাণ হারায়। অন্যরা টিকতে না পেরে পালাতে উদ্যত হয়। তাদেরকে জীবিত ধরে ফেলা হলো।
ইত্যবসরে তাঁবুর ভেতর থেকে এক ঘাতক সদস্য বেরিয়ে আসে। তার পোশাক রক্তরঞ্জিত। সুলতান আইউবীর পিঠটা ছিলো তার দিকে। সুযোগ বুঝে সে সুলতানের উপর পিছন থেকে আঘাত হানতে উদ্যত হয়। এক দেহরক্ষী যথাসময়ে ঘটনাটা দেখে ফেলে। সে চিৎকার করে ওঠে নীচে সুলতান! বলেই সে আক্রমণকারীর দিকে ছুটে যায়। সুলতান আইউবী সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়েন। ঘাতকের তরবারী বাতাসে আঘাত হেনে সুলতানের উপর আক্রমণ করে। দেহরক্ষী ঘাতক সদস্যের পাজরে বর্শী সেঁধিয়ে দেয়। লোকটা পূর্ব থেকেই আহত ছিলো। এবার আঘাত খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ও মারা যায়।
সুলতান আইউবী এই আক্রমণ থেকেও প্রাণে রক্ষা পেয়ে যান।
শেখ সান্নান ও গোমস্তগীন প্রেরিত এই নয় ঘাতক সদস্য শপথ করে এসেছিলো, হয়তো তারা সুলতান আইউবীকে হত্যা করবে, অন্যথায় জীবন নিয়ে ফিরবে না। তারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্য করতে পারেনি। তবে জীবিতও ফেরত যেতে পারেনি। যাঁরা আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়ে বেঁচে গিয়েছিলো, সুলতান আইউবী তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
৫.২ দৃষ্টির আড়ালে
দৃষ্টির আড়ালে
সুলতান সালাউদ্দীন আইউবীর এক সালার আহার পরবর্তী আসরে কোনো এক যুদ্ধের আলোচনা করছিলেন। এক সৈনিকের বীরত্বের আলোচনা উঠলো। সুলতান আইউবী বললেন
কিন্তু ইতিহাসে নাম আসবে শুধু আপনার আর আমার। এটা ইতিহাস রচয়িতাদের চরম অবিচার যে, তারা সুলতান আর সালারের নীচের আর কারো প্রতি চোখ তুলে তাকায় না। জয়-পরাজয় আল্লাহর হাতে বটে; কিন্তু সাধারণ সৈনিকদের আত্মত্যাগ ছাড়া জয় সূচিত হয় না। আমাদের জানবাজ সৈনিকরা দুশমনের কাছে গিয়ে যদি তাদের আপন হয়ে যায়, তাহলে আমরা তাদের কী করতে পারবো? যুদ্ধের সময় সৈনিকরা লড়াই করার পরিবর্তে যদি নিজের জীবনের চিন্তা বেশী করে, তাহলে আমরা কিভাবে বিজয় অর্জন করবো? ইনসাফের দাবি হলো, ইতিহাসে আমাদের সেই সৈনিকদের কথাও উল্লেখ থাকতে হবে, যারা এক একজন দশ দশজন শত্রুসেনার মোকাবেলা করে বিজয় ছিনিয়ে আনছে এবং জাতীয় পতাকা অবনমিত হতে দিচ্ছে না। এই সৈনিকরা যদি কখনো পরাজিত হয়, হবে আপনার-আমার অযোগ্যতার কারণে। কিংবা তাদেরকে সেই গাদ্দার ও ঈমান নিলামকারীরা পরাজয়ের মুখে ঠেলে দেবে, যারা আপন সেজে শত্রুর হয়ে কাজ করছে।
আচ্ছা, আল্লাহ আমাদেরকে কোন্ পাপের শাস্তি প্রদান করছেন যে, তিনি আমাদের মাঝে গাদ্দার সৃষ্টি করে দিচ্ছেন? আসরের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলো।
আমি আলিম নই যে, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো- সুলতান আইউবী বললেন- তবে সম্ভবত আল্লাহ গাদ্দারের মাধ্যমে আমাদের সদা শংকিত করে রাখতে চাচ্ছেন, যাতে আমরা প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকি এবং একের পর এক বিজয় অর্জন করে প্রবঞ্চিত না হয়ে পড়ি। তবে আল্লাহর প্রকৃত ইচ্ছা কি, তা তিনিই জানেন। আমার ভয় হচ্ছে, ঈমান-বিক্রেতারা কোন না কোন কালে ইসলামের মর্যাদাকে ডুবিয়ে ছাড়বে। খৃস্টানদের প্রত্যয় আপনার অজানা নয় যে, তাদের যুদ্ধ আপনার-আমার বিরুদ্ধে নয়- ইসলামের বিরুদ্ধে। তাদের ঘোষণা হলো, যতোদিন পর্যন্ত ক্রুশের অস্তিত্ব থাকবে, তারা চাঁদ-তারার বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকবে। এই প্রত্যয় তারা অনাগত প্রজন্মের জন্যও রেখে যাবে। আমি চাই, আমাদের সেই সাধারণ সৈনিকদের জীবনী ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকুক, যারা উত্তর মিশরের মরু প্রান্তরে, হামাতের বরফ-টাকা উপত্যকায় লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। আমি চাই, সেই জানবাজ গেরিলাদের কথাও ইতিহাসে লিখে রাখা হোক, যারা দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে বিজয় কেড়ে এনেছে, যা সমগ্র বাহিনীর পক্ষে সম্ভব ছিলো না। এদের কজন জীবন নিয়ে ফিরে আসে? দশজনের মধ্য থেকে একজন। তাও আসে আহত হয়ে।
