সুলতান আইউবীর ফৌজের অবস্থান এলাকায় পাহাড়ের উপর দন্ডায়মান এক ব্যক্তি চিৎকার করছে- আকাশ জ্বলছে। খোদার গজব নাযিল হচ্ছে।
সংবাদ পেয়ে সুলতান আইউবী দৌড়ে একটি টিলার উপরে উঠে যান। দুশমনের শিবিরের দিককার আকাশ লালে লাল দেখে তিনি নিজের অজ্ঞাতে, বলে ওঠেন- শাবাশ! শাবাশ! আল্লাহ তোমাদেরকে বিনিময় দান করুন।
এখনই পাল্টা হামলা চালাবে সেই শক্তি মসুলের বাহিনীর শেষ হয়ে গেছে। সুলতান আইউবীর কমান্ডো সেনারা তৎপর হয়ে ওঠেছে। তারা তিন রাত গোমস্তগীন, সাইফুদ্দীন ও আল-মালিকুস সালিহর শিবিরগুলোতে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালায় যে, তাদের কেন্দ্র পর্যন্ত হেলে ওঠেছে। অবশেষে তারা অন্য কোন দিক থেকে আক্রমণ করার নির্দেশ প্রদান করে। ঠিক সে সময় তারা জানতে পারে, পেছনে সুলতান আইউবীর ফৌজ এসে পড়েছে।
এদিকে সুলতান আইউবী তার বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করে দুশমনকে বেহাল করে দেন। তিনি হত্যাও করছেন না, ছেড়ে দিচ্ছেন না। এই যুদ্ধ আঘাত করো আর পালাও নীতি অনুযায়ী লড়া হচ্ছিলো। শত্রু বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছে এবং অস্ত্র ত্যাগ করতে শুরু করে। সুলতান আইউবীর লক্ষ্যও ছিলো এই।
৫৭০ হিজরীর রমযান মোতাবেক ১৯৭৫ সালের ১৩ এপ্রিল। সাহরী খাওয়ার পর সুলতান আইউবী তার পরিকল্পনার শেষ অংশটি কার্যকর করেন, যার দিক-নির্দেশনা তিনি একদিন আগেই দিয়ে রেখেছেন। তিনি খোলাখুলি আক্রমণ করে বসেন। উল্লেখযোগ্য সংঘাত হলো না। তিনি গোমস্তগীন ও সাইফুদ্দীনের তাঁবু এলাকা পর্যন্ত পৌঁছে যান। কিন্তু তারা দুজনই উধাও। তারা এমন কাপুষের ন্যায় পালিয়ে গেছে যে, তাদের জঙ্গলের মঙ্গল তাঁবুগুলো যেমনটা তেমন পড়ে আছে। হেরেমের নারী, গায়ক-গায়িকা এবং তাদের বাদ্যযন্ত্রগুলো যথাস্থানে রয়েছে। সুলতান আইউবীর ফৌজ দেখে তারা আতঙ্কিত মনে এদিক-ওদিক পালাতে শুরু করে। তাদেরকে ধরে সুলতান আইউবীর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। সুলতান তাদের প্রত্যেককে মুক্তি দিয়ে দামেস্ক পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। মসুলের গবর্নর সাইফুদ্দীনের তাঁবুটা সবচেয়ে আকর্ষণীয়। মেয়েদের ছাড়া সেখানে সুন্দর সুন্দর পিঞ্জিরাও ছিলো, যেগুলোতে রং বেরংয়ের পাখি বাঁধা ছিলো।
সে রাতে আরো একটি মেয়েকে সুলতান আইউবীর সম্মুখে উপস্থিত না হয়, যে কিনা শত্রু বাহিনীর সেই শিবিরটিতে লাশ শনাক্ত করে ফিরছিলো, যার উপর সুলতান আইউবীর কমান্ডো সেনারা রাতে অতর্কিত হামলা করে দাহ্য পদার্থের মটকা ধ্বংস করেছিলো। সুলতান আইউবী মেয়েটিকে চিনে ফেললেন এবং বললেন- তুমি আমার গোয়েন্দা আনতানূনের সঙ্গে হাররান থেকে এসেছিলো
জি হ্যাঁ- মেয়েটি বললো- আমার নাম ফাতেমা। আমি নারী ফৌজের সঙ্গে দামেস্কে থেকে এসেছি। মেয়েটি আহত। সে বলতে লাগলো- আমি নতে পেরেছি আননূন এখানে গেরিলা হামলায় অংশ নিয়েছিলো। মি তার লাশ অনুসন্ধান করছিলাম।
লাভ নেই। সুলতান আইউবী বললেন।
সে-ও বলতো, গেরিলা সৈন্যের লাশ পাওয়া যায় না- ফাতেমা উদাস কণ্ঠে বললো- সে আমাকে বলেছিলো, আসো, আমরা নিজ নিজ কর্তব্যে কুরবান হয়ে যাই। আমার খুশি লাগছে এ জন্য যে, আনতানূন তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত আদায় করেছে। কিন্তু আমার কর্তব্য এখনো অনাদায়ী রয়ে গেছে। আমি গোমস্তগীনকে হত্যা করতে এসেছিলাম।
মেয়েটির আবেগময় অবস্থা দেখার পর কেউ অশ্রু সংবরণ করতে পারলো না। সুলতান আইউবী বললেন- দামেস্ক থেকে যে মেয়েগুলো এসেছিলো, তাদেরকে পাঠিয়ে দাও। তারা দুশমনকে পরাজিত করার কাজে আমাকে সাহায্য করেছে। এ সময় সাহায্যের কতো প্রয়োজন ছিলো, আমিই তা জানি। এই মেয়েগুলো যেন অদৃশ্য থেকে এসেছিলো; কিন্তু আমি তাদেরকে সঙ্গে রাখতে পারি না।
***
মেয়েদের প্রতিবাদ এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদেরকে দামেস্কে পাঠিয়ে দেয়া হলো। সুলতান আইউবী এখন আর কোথাও থামতে চাচ্ছেন না। তিনি দুশমনকে যে পরাজয় দান করেছেন, তা থেকে তিনি পুরোপুরি ফায়দা তুলতে চাচ্ছেন। তিনি নির্দেশ দেন, সমস্ত ফৌজকে হাল্ব অভিমুখে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত করো। তিনি সালারদেরকে পরবর্তী পরিকল্পনা। সম্পর্কে অবহিত করছেন।
এমন সময় হঠাৎ দেখা গেলো, এক অশ্বারোহী এদিকে ছুটে আসছে। তার হাতে বর্শা। বর্শার আগায় কি একটি বস্তু গাঁথী। লোকটি নিকটে চলে আসলে সুলতান আইউবীর দেহরক্ষীরা তাকে থামিয়ে দেয়। সুলতান দেখলেন, তার বর্শার আগায় গেঁথে রাখা বস্তুটা মানুষের মাথা। তিনি তাকে সম্মুখে আসার অনুমতি প্রদান করেন।
লোকটি আযর ইবনে আব্বাস। সেই গুপ্তচর, যাকে দামেস্ক নিয়ে যাওয়ার পথে যে রক্ষীদের হেফাজত থেকে পালিয়ে গিয়েছিলো। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে সে বর্শা থেকে মাথাটা খুলে সুলতান আইউবীর পায়ে নিক্ষেপ করে বললো- আমি আপনার পলাতক কয়েদী। আমি নিবেদন করেছিলাম, আমাকে ক্ষমা করে দিন; আমি আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত আদায় করবো। কিন্তু আপনি আমার আবেদন মঞ্জুর করেননি। আমি পথে চিন্তা করলাম, আমাকে ইসলামের বিপক্ষে পথে নামিয়েছেন আমার পিতা। তিনিই আমার অন্তরে সম্পদের মোহ সৃষ্টি করেছেন। আমি শুধু এই কাজের জন্য পালিয়েছিলাম। আমি হাল্ব গেলাম। পিতাকে হত্যা করলাম। তার মাথা কেটে এনে আপনার পায়ে অর্পন করলাম। এবার বলুন, আমার পাপের কাফফারা আদায় হলো কিনা। না হলে আপনি আমাকে আবারো বন্দী করুন এবং এভাবে আমার মাথাটাও কেটে ছুঁড়ে ফেলুন।
