সকল ঐতিহাসিক লিখেছেন, সুলতান আইউবী যদি এই যুদ্ধের কমান্ড নিজে করতেন, তাহলে এই বাহিনীর দ্বারাই তার সমস্ত পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যেতো।
কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ ইতিহাসবিদদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাঁর রোজনামচা থেকে প্রমাণিত হয় যে, এই আক্রমণকারী বাহিনীটি হাবের নয়- মসুলের ফৌজ ছিলো এবং সালার মুজাফফর উদ্দীন ইবনে যাইনুদ্দীন তার সেনাপতিত্ব করছিলো। তার ভাষ্য মতে, এই কমান্ড এভো নিপুণ ছিলো যে, মুজাফফর উদ্দীন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এই বাহিনীটিকে উপড়ে ফেলে দিয়েছিলো। নেতৃত্বের বিচক্ষণতার কারণ এই বর্ণনা করেছেন যে, মুজাফফর উদ্দীন একসময় সুলতান সালাউদ্দীন আইউবীর সালার ছিলো এবং এই বিদ্যা সে সুলতান আইউবীর নিকট থেকে শিক্ষালাভ করেছিলো। সৈন্য সংখ্যার আধিক্যের পাশাপাশি তার অতিরিক্ত সুবিধা এই ছিলো যে, সে সুলতান আইউবীর কৌশল ভালভাবেই বুঝতো।
সুলতান আইউবী দূতদের সঙ্গে রাখতেন এবং তাদের মাধ্যমে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। তিনি এমন কৌশল প্রয়োগ করেন যে, শত্রু বাহিনীকে তিনি সেই পর্বতের নিকট নিয়ে যান, যার উপর তার তীরন্দাজরা প্রস্তুত ছিলো। জীরান্দাজ সংখ্যায় কম হলেও কাজ অনেক আঞ্জাম দেয়। সুলতান তার সেনাসংখ্যার স্বল্পতায় এতো। অনুভূতি ছিলো যে, তাকে তার প্রথম পরিকল্পনাটি পাল্টে ফেলতে হয়। তিনি রিজার্ভ বাহিনীকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হন। কিন্তু ঠিক এমন মুহূর্তে এক দূত তাকে সংবাদ জানায় যে, একদিক থেকে, আপনার চার-পাঁচশত অশ্বারোহী আসছে। সুলন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন, তারা কোন্ বাহিনীর এবং কেন? আসছে। তিনি যুদ্ধের ময়দানে শৃখলার অত্যন্ত পাবন্দ ছিলেন। অথচ এই ময়দানে তাঁর সাহায্যের তীব্র প্রয়োজন। কিন্তু তার অনুমতি ও নির্দেশনাবিহীন একটি পদক্ষেপ তার পছন্দ হয়নি। তিনি দূতকে বললেন- এক্ষুণি যাও। জিজ্ঞেস করে আসো, তোমরা কারা?
দূতের নিয়ে আসা সংবাদ শুনে সুলতান আইউবী হতভম্ভ হয়ে পড়েন। এরা চারশত মেয়ে এবং একশত স্বেচ্ছাসেবীর বাহিনী। হাজ্জাজ আবু ওয়াক্কাস তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা সালার শামসুদ্দীনের অনুমতিক্রমে এসেছে। এ হলো সংবাদ।
সুলতান আইউবী তাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু এই পাঁচশত অশ্বারোহী যে ধারায় অগ্রসর হয়েছে, তাতে সুলতান বুঝে ফেলেন, কমান্ড সালার শামসুদ্দীন নিজেই করছেন। এই বাহিনীটি শত্রুকে পাহাড়ের দিকে ঠেলে নিয়ে আসছিলো। তারা দুশমনের অগ্রযাত্রা ব্যহত করে দিয়েছে।
মুসলমান মুসলমানের হাতে মারা যাচ্ছে। আল্লাহু আকবর তাকবীর ধ্বনি আল্লাহ আকবর ধ্বনির সঙ্গে সংঘর্ষিত হচ্ছে। জমিন কাঁপছে। আকাশ নীরব দর্শকের ন্যায় তাকিয়ে আছে। খৃস্টানরা তামাশা দেখছে। ইতিহাস নির্বিকার হয়ে আছে। মেয়েরা ভাইয়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। রক্তের সয়লাব বয়ে যাচ্ছে। জাতির মর্যাদা অশ্বখুরের নীচে পদদলিত হচ্ছে। আল্লাহ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন।
সারাদিনকার যুদ্ধের পরিণতি এই দাঁড়ালো যে, দুশমনের মনোবল নিঃশেষ হয়ে গেছে এবং তারা অস্ত্র ত্যাগ করতে শুরু করেছে। তারা এখন আঁধা অবরোধে অবরুদ্ধ। তাদের সেনাপতি বেরিয়ে গেছে। আহতদের আর্ত-চিৎকারে রাতের নীরব পরিবেশ প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে। সারাদিনের যুদ্ধক্লান্ত নারী সৈনিকরা আহতদের তুলে আনতে থাকে। রাত পোহাবার পর ময়দানের এক ভয়াবহ দৃশ্য চোখে পড়লো। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত লাশের পর লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অসংখ্য মৃত ঘোড়া এদিক-ওদিক পড়ে আছে। যুদ্ধবন্দীদেরকে দূরে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। লাশগুলোর মধ্যে নারী সৈনিকদের লাশও আছে। তাদেরকেও তুলে আনা হলো।
রাজত্বের নেশা মানুষকে এমন এক স্তরে নামিয়ে নিয়ে আসে, সেখানে একজন মানুষ তার জাতিকে দুটি দেহে বিভক্ত করে তাদেরকে পরস্পর যুদ্ধে জড়িয়ে দেয়– সুলতান আইউবী ময়দানের দৃশ্য দেখে বললেন ভাই তার বোনের সন্ত্র হরণ করছে। আমরা যদি রাজত্বের মোহ থেকে মুক্ত হতে না পারি, তাহলে কাফেররা এই জাতিকে আপসে যুদ্ধ করিয়ে জাতিরই কর্ণধারদের হাতে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।
হামাত শিং ও তার পার্শ্ব এলাকার যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। অন্যত্র এখানে যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের রাতে বারো কমান্ডো হাব বাহিনীর সেই স্থানটিতে পৌঁছে যায়, যেখানে দাহ্য পদার্থের মটকাগুলো রাখা আছে।
হালবের একটি বাহিনী এখনো রিজার্ভ অবস্থায় আছে। তারা সংবাদ পেয়ে গেছে, তাদের দুই বাহিনীর হামলা ব্যর্থ হয়ে গেছে। আক্রমণে সাফল্য অর্জনের জন্য আগুন নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।
সুলতান আইউবীর বারো কমান্ডো তাদের টার্গেট ঠিক করে নিয়েছে। তাদের চার-পাঁচজনের নিকট ধনুক এবং সলিতাওয়ালা তীর আছে। তারা ঘোড়া থেকে নেমে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সলিতায় আগুন ধরিয়ে তীর নিক্ষেপ করে। আগুন লাগানো সলিতা গিয়ে মটকার ডিপোতে নিক্ষিপ্ত হয়। মটকাগুলোতে দাউ দাউ করে আগুন ধরে যায়। আগুনের লেলিহান শিখায় আকাশ ছেয়ে যায়। শত্রু শিবিরে হৈ-হুঁল্লোড় পড়ে যায়।
কমান্ডোদের জানানো হয়েছিলো, মটকার সংখ্যা অনেক। সেখানে স্থলস্থূল শুরু হয়ে গেলে কমান্ডোরা পুনরায় আঘাত হানে। আগুনের শিখায় স্থানটি আলোকিত হয়ে যায়। কমান্ডোরা নিরাপদ মটকাগুলোর অবস্থান দেখতে পায়। তারা আগেই বর্শার সঙ্গে হাতুড়ীর ন্যায় লোহার টুকরো বেঁধে রেখেছিলো। ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে বসেই তারা মটকাগুলো পিটিয়ে ভাঙ্গতে শুরু করে। শত্রু সেনারা তাদেরকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে। এ এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। বারোজন জানবাজ সেনা হাজার হাজার শত্রুসেনার নাগালের মধ্যে যুদ্ধ করছে। আগুনের শিখা সবদিক ছড়িয়ে পড়ে। শিবিরময় ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। উট-ঘোড়াগুলো রশি ছিঁড়ে ছিঁড়ে পালাতে শুরু করে।
