প্রায় দুঘন্টা ধরে দুশমনের কমান্ডাররা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে তাদের সৈনিকদেরকে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। কিন্তু তারা সুলতান আইউবীর তীরন্দাজদের হাতে হতাহত হতেই থাকে। কিন্তু তারা তা মুসলমান সৈনিক। সামরিক চেতনা তাদেরকে পিছপা হতে দিচ্ছে না। দের কয়েকজন সৈনিক যে পাহাড়টির উপর থেকে তীর আসছিলো, তাতে আরোহনের চেষ্টা করে। কিন্তু এটা ছিলো নিছক তাদের সাহসিকতা প্রদর্শন। কিন্তু উপর থেকে ধেয়ে আসা তীর তাদেরকে পাথরের ন্যায় গড়িয়ে নীচে ফেলে দেয়।
অবশেষে শক্র কমান্ডাররা তাদের সৈনিকদেরকে পেছনে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু খানিকটা পিছু হটার পর তারা টের পেলো, পেছনে সুলতান আইউবীর ফৌজ দাঁড়িয়ে আছে। ঘোষণা শুরু করলো- অন্ত্র ফেলে দাও। তোমরা আমাদের ভাই। আমরা তোমাদেরকে হত্যা করবো না।
ঘোষণার তালে তালে আইউবী বাহিনীর সেনারা সম্মুখে অগ্রসর হতে এবং চারদিক ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। চারদিক থেকে অবরুদ্ধ গোমস্তগীন বাহিনীর এখন আর লড়াই করার সাধ্য নেই। তাদের অর্ধেকই হতাহত হয়েছে। যারা জীবিত আছে, তারাও চরম ভীতসন্ত্রস্ত। তারা এসেছিলো অন্য আশা নিয়ে। তাদের বলা হয়েছিলো, এই জয় অতি সহজে হবে। কিন্তু রণাঙ্গন তাদের জন্য জাহান্নামে পরিণত হলো।
তারা অস্ত্র সমর্পণ করতে শুরু করে।
***
সুলতান আইউবীর এই কৌশল সফল হয়েছে বটে; কিন্তু অপরদিকে দুশমন তাকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। তা হলো ডান পার্শ্বের সেই : ময়দান, যার ব্যাপারে পূর্ব থেকেই তিনি চিন্তিত ছিলেন। ওদিক থেকে শত্রুবাহিনী মরুঝড়ের ন্যায় এগিয়ে আসছে। তার মোকাবেলায় সুলতান আইউবীর ক্ষুদ্র দুটি ইউনিট। আক্রমণকারীদের পতাকা নজরে পড়তে শুরু করে। এটি হাবের ফৌজ। সুলতান আইউব হাব অবরোধ করে এই বাহিনীর পরাকাষ্ঠা দেখেছিলেন। তাঁর জানা আছে, এই বাহিনী গোমস্তগীন ও সাইফুদ্দীনের বাহিনী থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। সামরিক যোগ্যতা ও বীরত্বের দিক থেকে এই ফৌজ সত্যিই প্রশংসাহ্য। সুলতান আইউবী কখনো আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হন না। তিনি তৎক্ষণাৎ বুঝে ফেলেন, তাঁর বাহিনী এই বাহিনীকে প্রতিহত করতে পারবে না। আবার রিজার্ভ বাহিনীকেও তিনি ব্যবহার করতে চাচ্ছেন না। ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে কাছে দণ্ডায়মান সালারকে নির্দেশনা প্রদান করে পাঠিয়ে দেন।
সুলতান আইউবী রিজার্ভ বাহিনী ছাড়াও বাছাইকরা একটি বাহিনীকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। তিনি ওদিককার পাহাড়ের উপর মোতায়েন তীরন্দাজদের কমান্ডারকে নির্দেশ দিলেন, তোমার শিং এলাকা থেকে সরে পেছনদিকে মুখ ফিরাও এবং ঐ পজিশনেই নতুন আক্রমণকারীদেরকে টার্গেট করো। তিনি তাঁর বিশেষ অশ্বারোহী বাহিনীর কমান্ডারকে নির্দেশ দিলেন, তোমার বাহিনীকে ময়দানে নিয়ে আসো; আমি নিজে তাদের কমান্ড করবো। স্বল্প সময়ের মধ্যে সুলতান আইউবী পাহাড়ের উপর থেকে নীচে নেমে আসেন। তাঁর বাহিনী প্রস্তুত দণ্ডায়মান। তিনিও ময়দানে অবতীর্ণ হোন।
সুলতান আইউবী যুদ্ধের ময়দানে তাঁর পতাকা উড়ালেন না, যেন দুশমন বুঝতে না পারে তিনি কোথায় আছেন। কিন্তু আজ তিনি সেই নিয়মে ব্যত্যয় ঘটালেন। তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দেন, আমার পতাকা উঁচু করে রাখে।
কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর রোজনামচায় লিখেছেন– এই যুদ্ধে পতাকা উড়িয়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তার বাহিনীকে বুঝাতে চাচ্ছিলেন যে, সুলতান স্বয়ং তাদের কমান্ড করছেন। পাশাপাশি হাবের আক্রমণকারী শত্রুসেনাদেরকে জানান দিতে চেয়েছিলেন, তাদের মোকাবেলায় সুলতান আইউবী স্বয়ং ময়দানে।
সুলতান আইউবী অতিদ্রুত অশ্বারোহী সৈন্যদের এভাবে বিন্যস্ত করে ফেলেন যে, দুটি ঘোড়া সম্মুখে, চারটি পিছনে। তার পিছনে ছয়টি। তারপর আটটি। অবশিষ্ট সকল সৈন্য আট আটজন করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে চলন্ত অবস্থায় সম্পন্ন করেছেন। সম্মুখ থেকে দুশমন সারিবদ্ধভাবে বিস্তৃত হয়ে এগিয়ে আসছে। নিকটে গিয়ে সুলতান আইউবীর অশ্বারোহী নারাও বিন্যস্ত হয়ে যায়। মোকাবেলাটা এরূপ হয় যে, সুলতান আইউবীর অশ্বারোহীরা একটি পেরেকের ন্যায় দুশমনের অভ্যন্তরে ঢুকে ড়। সুলতান আইউবী হলেন এই বিন্যাসের মধ্যখানে। দুশমনের রোহীরা ডান-বাম থেকে সম্মুখ দিকে এগিয়ে যায়। পথে যাকেই লো আঘাতে আহত করতে থাকে।
শত্রুবাহিনী আরোহী সেনাদের পেছনে পতাদিক বাহিনী। সুলতান ইউবী সম্মুখে বেশ দূরে এবং সঙ্গে সঙ্গে সারির অভ্যন্তরে ঢুকে গিয়ে তিক ইউনিটের উপর হামলা করে বসেন। পদাতিক শত্রুসেনার। যথাসাধ্য মোকাবেলা করে। কিন্তু আইউবী বাহিনীর ঘোড়া এবং আরোহী এরা তাদের পিষে মারতে মারতে ও তারবারীর আঘাত হানতে, হানতে মনের দিকে এগিয়ে যায়। সুলতান আইউবীর পদাতিক বাহিনীটি ছিলো সম্মুখে। তারাও দুশমনের অশ্বারোহী বাহিনীর মোকাবেলা করে। পিছন দিক থেকে সুলতান আইউবী হঠাৎ আক্রমণ করে বসেন। নিকটস্থ পাহাড়গুলোর উপর থেকে তীরন্দাজরা তীরবর্ষণ করতে শুরু করে। কিন্তু এতোকিছুর পরও হাবের সৈন্যদের মনোবল অটুট থাকে। সুলতান আইউবী তাঁর কমান্ড বিক্ষিপ্ত হতে দিলেন না। লড়াই অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী এবং তীব্র আকার ধারণ করলো।
