কিছুক্ষণ পর বারোজন গেরিলার একটি বাহিনী সুলতানের সামনে হাজির ২লা। খৃস্টানরা হাবের বাহিনীকে দাহ্য পদার্থ ভর্তি যে মটকাগুলো প্রেরণ করেছিলো, সেগুলো রণাঙ্গনে নিয়ে আসা হয়েছে। সুলতান আইউবীর চররা সেগুলোর অবস্থান জেনে নিয়েছে। সুলতান আগে নির্দেশ দিয়েছিলেন, দুশমন যখন হামলা করবে, তখন মটকাগুলো ধ্বংস করে দেবে। এর জন্য বারোজন জানবাজ এবং উন্মাদ প্রকৃতির কমান্ডো নির্বাচন করা ছিলো। এখন তাদেরকেই সুলতান আইউবীর সম্মুখে উপস্থিত করা হলো। তান তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। এক গেরিলাকে দেখে তিনি মুচকি স বললেন- আনতান! তুমি এই বাহিনীতে এসে পড়েছো?
আমাকে এই বাহিনীতেই আসা প্রয়োজন ছিলো- আনতামূন বললো আপনাকে বলেছিলাম, আমি পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবো।
আমার প্রিয় বন্ধুগণ!- সুলতান আইউবী গেরিলাদের উদ্দেশে বললেন –তোমরা এ যাবত বহু কুরবানী দিয়েছে। কিন্তু এখন দ্বীন ও জাতির ইজ্জত তোমাদের থেকে আরো বেশী ত্যাগ দাবি করছে। তোমরা যুদ্ধের গতি পাল্টে দিতে পারো। তোমাদেরকে টার্গেট বলে দেয়া হয়েছে। তোমরা যদি এগুলো ধ্বংস করে দিতে পারো, তাহলে অনাগত প্রজন্ম তোমাদেরকে স্মরণ করবে। তোমরা জানো, আমাদের সেনাসংখ্যা কম। দুশমনের বাহিনী তিনটি। তাদের থেকে নিজেদের বাহিনীকে তোমরা রক্ষা করতে পারো।
আমরা দ্বীন ও জাতিকে নিরাশ করবো না। গেরিলাদের কমান্ডার বললো।
সুলতান আইউবী আরো কিছু দিক-নির্দেশনা দিয়ে তাদেরকে বিদায় জানালেন।
পরদিন ভোর বেলা। এক ব্যক্তি ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটে এসে উপস্থিত হয়। সুলতান আইউবী এখনো তাঁবুতে অবস্থান করছেন। অশ্বারোহী সংবাদ দেয়, শত্রুবাহিনী এগিয়ে আসছে। এখন তারা এখান থেকে মাত্র এক মাইল দূরে। তাদের গতি হামাতের দিকে। ইত্যবসরে আরো এক আরোহী এসে পৌঁছে। তার সংবাদ হলো, ডানদিক থেকেও দুশমন আসছে। এই বাহিনীর গতি থেকে সুলতান আইউবী অনুমান করলেন, এরা ডান পার্শ্ব অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে। এই দিকটা নিয়ে সুলতানের পেরেশানী ছিলো। এবার তিনি আরো বেশি অস্থির হয়ে ওঠেন। এই বাহিনীর সম্মুখ ভাগে অবস্থান করছে আযর, যে কিনা এখান থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে পালিয়েছিলো। সুলতান আইউবী বললেন আর গত রাতেই পৌঁছে গিয়েছিলো এবং তার অখ্য মোতাবেক দুশমন হামলা করে বসেছে।
সুলতান আইউবী প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। তাঁর দূত চারদিকে ছুটে চলে। হামাতের মধ্যস্থানে তাঁবু খাটানো আছে। সৈন্যরা তাঁবুতে অবস্থান করছে কিংবা এদিকে-ওদিক ঘোরাফেরা করছে, যেন দুশমন মনে করে, তারা প্রস্তুত নয়। তীরন্দাজ সৈনিকরা টিলার উপর প্রস্তুত হয়ে যায়।
তীব্ৰগতিতে এগিয়ে আসছে শত্রুবাহিনী। তাদের অগ্রগামী বাহিনী দেখতে, পেলো, সুলতান আইউবীর তাঁবুগুলো এখনো পঁড়িয়ে আছে। তারা এই ভেবে দ্রুত এগিয়ে আসার জন্য পেছনে সংবাদ পাঠায় যে, তারা সুলতান আইউবীর বাহিনীকে অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে গেছে।
সুলতান আইউবী একটি উঁচু টিলার উপর উঠে যান, যেখান থেকে চারদিকের সমস্ত দৃশ্য দেখা যায়। তিনি দেখলেন, গোমর্ন্তগীনের বাহিনী সোজা শিং-এর দিকে এগিয়ে আসছে। সুলতান বিস্মিত হন। তিনি তার সৈনিকদেরকে সেই সময় ঘোড়ায় জিন বাঁধার নির্দেশ দেন, যখন দুশমন একেবারে নিকটে এসে পড়েছে। দুশমনের পদাতিক বাহিনী সম্মুখে অগ্রসর হয়ে কয়েকটি তীর নিক্ষেপ করে। ওদিক থেকে ডাক-চিৎকার ভেসে আসে- পিষে ফেলো, একজনকেও জীবিত ছেড়ে দিও না, সালাহুদ্দীন আইউবীকে জীবিত ধরে ফেলল। তার মাথাটা কেটে ফেলো।
সুলতান আইউবীর অশ্বারোহী বাহিনী কিছুটা সম্মুখে অগ্রসর হয়ে আবার পিছনে সরে আসে। পদাতিক ও আরোহী বাহিনী শত্রুবাহিনীর সম্মুখভাগের আক্রমণের মোকাবেলা করতে করতে পিছন দিকে সরে আসতে থাকে। এভাবে আক্রমণকারী প্রত্যেকে হামাতের সেই ফাঁদের ভেতরে এসে পড়ে, যেখানে সুলতান আইউবী তাদেরকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন।
টিলা-পর্বতবেষ্টিত এই ময়দানটা দৈর্ঘ্য-প্রস্থে দেড় মাইলের মতো। দুমশন যেইমাত্র তার ভেতরে প্রবেশ করলো, অমনি উভয় দিকের টিলার উপর থেকে তাদের উপর তীর বর্ষিত হতে শুরু করলো। দুশমনের ঘোড়াগুলো তীর বিদ্ধ হয়ে নিজেদেরই লোকদেরকে পিষতে পিষতে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করে। শত্রু বাহিনীর কমান্ডার বুঝতেই পারলো না, এখানে তাঁবুগুলোর মধ্যে যে সৈনিকরা ছিলো, তারা কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলো। সামনের টিলাগুলোর ভেতরে দিয়ে একটা পথ, যা উপত্যকার দিকে বেরিয়ে গেছে এবং সুলতান আইউবীর সৈন্যরা সেই পথেই লাপাত্তা হয়ে গেছে, তা তাদের জানা ছিলো না। ময়দানে তাঁবু খাটানো ছিলো, যার রশিগুলো শত্রু বাহিনীর জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছিলো।
কিছুক্ষণ পর সলিতাওয়ালা অগ্নিতীর আসতে শুরু করে। এই তীর ভাবুগুলোকে জ্বালিয়ে দিতে শুরু করে। তারা তাঁবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। রণাঙ্গন থেকে অগ্নিশিখা উঠতে শুরু করে। দুশমনের কমান্ডারদের জন্য বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়ে যায়। তাদের দলবদ্ধতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। ঘোড়াগুলোর হেষারব, আহতদের আর্ত-চিৎকার এবং আন্ডারদের হাঁক-ডাক এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যেনো এখানে প্রলয় ঘটে গেছে।
