সুলতান আইউবী হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে ইঙ্গিত করেন। হাসান আয়রকে তাবুর বাইরে নিয়ে যান।
***
সেদিনই আয়রকে দামেস্ক পাঠিয়ে দেয়া হয়। তার সঙ্গে দুজন মোহাফেজ দেয়া হয়। তিনজনই অশ্বারোহী। আযরের হাত রশি দ্বারা বাঁধা। সূর্যাস্তের খানিক আগে তারা অর্ধেক পথ অতিক্রম করে ফেলে। রাতে কোথাও যাত্রাবিরতি দিতে হবে। পথে মোহাফেজগণ আযরের অপরাধের বিবরণ শুনতে থাকে। আযর আবেগপ্রবণ কথা বলে বলে তাদেরকে প্রভাবিত করে ফেলে। সন্ধ্যার সময় সে মোহাফেজদের বললো, সামান্য সময়ের জন্য তোমরা আমার হাতের বাঁধন খুলে দাও। মোহাফেজরা এই ভেবে তার হাত খুলে দেয় যে, নিরস্ত্র পালিয়ে যাবে কোথায়। তারা তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে দেয়। বাঁধনমুক্ত হয়ে আযর মাটিতে বসে পড়ে। মোহাফেজরা তাকে নিয়ে খেতে শুরু করে।
আযর পূর্ব থেকেই ফন্দি এঁটে রাখে। আহাররত অবস্থায় হঠাৎ সে উঠে দেীড়ে গিয়ে দ্রুত ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে। মোহাফেজরা উঠে ঘোড়ার পিঠে চড়তে চড়তে আযর বেশ দূরে চলে যায়। তারা পলায়নপর আয়রকে ধাওয়া করে। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
সন্ধ্যা গাঢ় হতে শুরু করে। উঁচু-নীচু ভূমি। মাঝে-মধ্যে টিলা এবং বড় বড় এর আছে। মোহাফেজরা তাকে বহুদূর পর্যন্ত ধাওয়া করে। কিন্তু আযর চলে আসছে দৃষ্টিসীমার বাইরে।
পরদিন ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মোহাফেজদ্বয় পরাজিতের ন্যায় অবনত মস্তকে সন ইবনে আবদুল্লাহর নিকট এসে হাজির হয়। একজন বললো- আমাদের তার করুন; বন্দী পালিয়ে গেছে। তারা জানালো, বন্দীর দাবিতে তারা তার হাতের বন্ধন খুলে দিয়েছিলো। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তাদেরকে হেফাজতে নিয়ে নেন। কিন্তু ভয়ে-শংকায় তার ঘাম বেরিয়ে আসে। কেননা, আযর সাধারণ কোন বন্দী ছিলো না। সে সুলতান আইউবীর সমস্ত পরিকল্পনা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলো। জয়-পরাজয় ঐ পরিকল্পনার উপর নির্ভরশীল ছিলো। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ সুলতান আইউবীকে জানাতে চাচ্ছিলেন না যে, ধৃত গোয়েন্দা হাতছাড়া হয়ে গেছে এবং আপনার সব পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে গেছে। তবে সুলতানকে বিষয়টা না জানিয়েও উপায় নেই।
সংবাদটা শোনার পর সুলতানের চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাঁর মুখ থেকে কোন কথাই বের হলো না। তিনি বসা থেকে উঠে তাঁবুর ভেতরে পায়চারি করতে শুরু করলেন। তৎকালের ঐতিহাসিক আসাদুল আসাদী লিখেছেন- সালাহুদ্দীন আইউবী চরম বিপদের সময়ও বিচলিত হতেন না। কিন্তু গুপ্তচরের পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ শোনার পর তার চেহারার রক্ত উধাও হয়ে যায় এবং চোখ জ্যোতিহীন হয়ে পড়ে। তিনি তাঁবুর ভেতরে পায়চারি করতে করতে হঠাৎ থেমে যান এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন- মহান আল্লাহ! এটা কি ইঙ্গিত যে, আমি এখান থেকে ফিরে যাবো? আপনার মহান সত্ত্বা কি আমার পাপ ক্ষমা করেনি? আমি তো কখনো অস্ত্র ত্যাগ করিনি। আমি কখনো পিছপা হইনি।
তারপর তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। সম্ভবত তিনি অদৃশ্যের কোনো ইশারা লাভ করতেন, যা সেদিন এই পরিস্থিতিতেও পেয়েছিলেন। তিনি হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে বললেন- ঐ মোহাফেজদ্বয়কে বেশী শাস্তি দিও না। শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা পালাতে পারতো। কিন্তু তারা আমাদের নিকট চলে এসেছে। তাদেরকে শুধু ভুলের শাস্তি দেবে। সত্য বলা এবং সরলতার পুরস্কারও প্রদান করবে। সালারদেরকে ডাকো। তার চেহারায় রওনক এবং চোখে চমক ফিরে আসে।
তিন সালার এসে হাজির হন। সুলতান আইউবী তাদেরকে বললেন সেই গুপ্তচর পালিয়ে গেছে, যার কাছে আমাদের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ছিলো। সে যে মানচিত্রটা প্রস্তুত করেছিলো, সেটি আমাদের নিকট রয়ে গেছে বটে; কিন্তু সে বহু কিছু চোখে দেখে গেছে এবং আমরা দুশমনকে কোথায় নিয়ে লড়াতে চাই, সেই তথ্যও সে জেনে গেছে। ফলে দুশমনের জন্য আমরা যে ফাঁদ প্রস্তুত করেছিলাম, তা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তারা এখন পর্বতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে না। হয়তো তারা আমাদেরকে অবরোধ করে ফেলবে এবং আমাদের রসদের পথ বন্ধ করে দেবে। আপনারা পরামর্শ দিন এ মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী। আমরা কি পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ফেলবো, নাকি বহাল রাখবো।
তিন সালার ভিন্ন ভিন্ন অভিমত ব্যক্তি করেন। তারা সকলে একটি ব্যাপারে একমত পোষণ করেন যে, পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ফেলা হোক। সুলতান আইউবী তাদের সঙ্গে একমত হলেন। তিনি বললেন- পরিকল্পনা পরিবর্তন করার জন্য সময় দরকার। আমাদের হাতে সময় নেই। আশংকা থাকে, এই রদবদলের মধ্যে যদি দুশমন হামলা করে বসে, তাহলে সমস্যা হয়ে যাবে। মুক্ত মাঠে মুখোমুখি লড়াই করার জন্য সৈন্যও অপ্রতুল।
সিদ্ধান্ত হলো, পরিকল্পনা অপরিবর্তিত থাকবে। গেরিলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হলো, যেন তারা ব্যাপকহারে অতর্কিত হামলা চালায় এবং দুশমনের সম্মিলিত কমান্ড ও তিন বাহিনীর কেন্দ্রের উপর গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করে। রসদের পথকে আরো বেশি নিরাপদ করা হবে। তিনি গেরিলা বাহিনীর সালারকে বললেন, আপনি সেই দলটিকে ফিরিয়ে আনুন, যাদেরকে মটকা অঙ্গার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিলো।
নতুন আদেশ নিয়ে সালার চলে যান। সুলতান আইউবী এই সিদ্ধান্ত— আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রদান করেন বটে; কিন্তু মনটা তার অস্থির। তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চিত, পালিয়ে যাওয়া গোয়েন্দা তার সমস্ত পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে। এখন জানা নেই, কী হবে?
