আল্লাহ তোমার অপরাধ ক্ষমা করুন- সুলতান আইউবী বললেন- আমি আল্লাহর বিধানে হাত দিতে পারি না। আমি শুধু এটুকু দেখতে চেয়েছিলাম, সেই লোকটা কেমন মুসলমান, একটি নারী যার হাত থেকে ছিনিয়ে তরবারী নিয়ে তাকে ধরে ফেললো। আচ্ছা, তুমি এখানে কী কী দেখেছো?
এখানে আমি বহু কিছু দেখেছি- আযর জবাব দেয়- অবশিষ্ট তথ্য আমার সেই দুই সঙ্গী দিয়েছে, যারা পূর্ব থেকেই এখানে অবস্থান করছিলো। আমাকে মিনজানীক এবং তীরন্দাজদের অবস্থান জানবার জন্য বলা হয়েছিলো। আমি তা দেখে নিয়েছি।
তোমার আগে তোমার কোনো সঙ্গী কি এখান থেকে তথ্য নিয়ে গেছে? সুলতান আইউবী জিজ্ঞাসা করেন।
না- আযর জবাব দেয়। আমরা তিনজন ছাড়া এখানে আমাদের আর কোনো সঙ্গী নেই।
তোমার কি জানা আছে, তুমি কত সুদর্শন ও সুঠাম দেহের অধিকারী? সুলতান আইউবী জিজ্ঞাসা করেন- আর তুমি কি জানো, মেয়ে হয়েও কিভাবে ও তোমাকে ফেলে দিয়েছিলো?
সে যদি পেছন দিক থেকে আমার উভয় পায়ের গোড়ালি ধরে না ফেলতো, তাহলে আমি পড়তাম না। আযর জবাব দেয়।
তারপরও তুমি পড়ে যেতে- সুলতান আইউবী বললেন- যাদের ঈমান বিক্রি হয়ে যায়, তারা অনায়াসেই পড়ে যায়। আর তারা তোমার মতো উপুড় হয়েই পড়ে থাকে। তুমি যদি সত্য ও ঈমানওয়ালাদের সঙ্গে থাকতে, তাহলে দশজন কাফির মিলেও তোমাকে ফেলতে পারতো না। আসল শক্তি বাহু আর তরবারীর নয়; আসল শক্তি ঈমানের।
আপনি আমাকে একটিবার সুযোগ দিন। আযর বললো।
সেই সিদ্ধান্ত দামেস্কের বিচারপতি নেবেন- সুলতান আইউবী বললেন আমি তোমার সঙ্গে এসব কথা এ জন্য বলছি যে, তুমি মুসলমান। তোমাকে আমাদের প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু তুমি ওদিকে চলে গেছে। আমি জানি, দামেস্কের দু-চারটা মেয়ে তোমার ভালোভাসায় বিভোর। চেহারা-শরীরে তুমি এর উপযুক্ত যে, মেয়েরা তোমাকে ভালোবাসবে। কিন্তু এখন সেসব মেয়ে তোমার মুখে থু থু নিক্ষেপ করবে। আল্লাহও তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। দামেস্কের কাজী তোমাকে কী শাস্তি দেবেন, আমি তা বলতে পারবো না। তিনি যদি তোমাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন, তাহলে সে পর্যন্ত যে কদিন বেঁচে থাকবে, আল্লাহর নিকট পাপের জন্য প্রার্থনা করতে থাকো। অন্ততপক্ষে মৃত্যুর আগে মুসলমান হয়ে যাও।
আমার পিতাকে শাস্তি দেবেন? আযর ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো- এই পাপের উৎসাহ তো আমাকে তিনিই দিয়েছিলেন। তিনিই আমার অন্তরে প্রলোন ঢুকিয়েছেন। তিনিই আমার হৃদয় থেকে ঈমান বের করে ফেলেছিলেন।
আল্লাহর বিধান তাকে ক্ষমা করবে না- সুলতান আইউবী বললেন দৌলতের নেশা অস্থায়ী হয়ে থাকে। ঈমানের শক্তি মৃত্যুর পরও নিঃশেষ হয় না।
আমার পিতা সম্পদশালী লোক ছিলেন না- আযর বললো- তিনি সম্পদের পুজারী ছিলেন। আমার দুটি বোন ছিলো। যৌবনে উপনীত হওয়ার পর তিনি তাদেরকে দুজন আমীরের হাতে তুলে দিয়ে দরবারে স্থান করে নেন। তিনি তার কন্যাদের বিপুল মূল্য উসুল করেন। তারপর চরবৃত্তি করতে শুরু করেন। আমাকেও তিনি এ কাজে লাগিয়ে দেন এবং আমার অন্তরে সম্পদের মোহ সৃষ্টি করে দেন। নূরুদ্দীন জঙ্গীর ওফাতের পর তিনি দরবারে আরো উচ্চ মর্যাদা পেয়ে যান। এক পর্যায়ে তিনি একজন বিজ্ঞ কুচক্রী ও ভাঙ্গা-গড়ার সুদক্ষ কারিগরে পরিণত হন। এক পর্যায়ে তিনি বিপুল পরিমাণ জায়গীরের মালিক হয়ে যান। আপনার বাহিনী এসে পড়ার পর যখন আল মালিকুস সালিহ, তার দরবারী আমীর ও জাগিরদারগণ দামেস্ক থেকে পালিয়ে যায়, তখন তাদের সঙ্গে আমার পিতাও ছিলেন। আমি কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই দামেস্ক থেকে যাই। কিছুদিন পর হাল্ব থেকে এক ব্যক্তি দামেস্ক আসে। সে আমার পিতার একটি বার্তা নিয়ে আসে, আমি যেন গুপ্তচরবৃত্তির কাজ শুরু করে দেই। সেই লোকটিই আমাকে সেই আস্তানায় নিয়ে যায়, আমি যার ঠিকানা আপনাদেরকে দিয়েছি। সেখানে আমাকে প্রচুর অর্থ দেয়া হয় এবং দু তিন দিনের মধ্যেই আমাকে জানিয়ে দেয়া হলো আমাকে কী করতে হবে এবং কিভাবে করতে হবে। আমি তাদের দলে ঢুকে পড়ি। একদিন আমাদের দলনেতা বললেন, স্বেচ্ছাসেবীরা রণাঙ্গনে যাচ্ছে। তোমরা তিন থেকে চারজন লোক তাদের দলে ঢুকে পড়ে। আমরা তিনজন ঢুকে পড়লাম। দুজন আগেই এখানে এসে পৌঁছেছে। আমিও গেলাম। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়, যেনো আমিও এখানে চলে আসি এবং আপনার বাহিনীর পূর্ণ অবস্থা জেনে সকল তথ্য যৌথ বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিকট পৌঁছিয়ে দেই। আমি এসে পড়লাম। আমার সঙ্গীরা এখানকার নকশা প্রস্তুত করে রেখেছিলো। তারা এও জেনে নিয়েছিলো যে, আপনি শত্রু বাহিনীকে সেই স্থানটিতে নিয়ে এসে লড়াতে চাচ্ছেন, যা চারদিকের পর্বত ও টিলা-বেষ্টিত। আমি টিলার আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে আপনার তীরন্দাজ এবং মিনজানীকের অবস্থান দেখে নিয়েছিলাম।
আযরের চোখ থেকে অশ্রু গড়াতে শুরু করে। সে বললো- ধরা পড়ার পর এখন আমি অনুভব করছি, আমি অপরাধ করছিলাম। আপনার বক্তব্য আমার ভেতরে ঈমানের উত্তাপ জাগ্রত করে দিয়েছে। আমার পিতা যদি তার কন্যাদের বিক্রি করে সম্পদশালী না হতেন, তাহলে আমার ঈমান অটুটই থাকতো। অপরাধ আমার পিতার। মহামান্য সুলতান! আপনার মর্যাদা বুলন্দ হোক। আপনি দয়া করে আমাকে এই পাপের কাফফারা আদায় করার সুযোগ দিন।
