আমি তার মেয়ে। মানসূরা বললো।
তুমি আমার বিস্ময় দূর করে দিয়েছ- হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন আমাদের মেয়েরা তোমার চেয়ে সাহসী হতে পারে; কিন্তু এরকম বুদ্ধিমত্তা কমই পাওয়া যায়, যার প্রমাণ তুমি দিয়েছে।
আমাকে আমার আব্বাজান প্রশিক্ষণ দিয়েছেন- মানসূরা বললো– আমার কানে মাত্র দুটি বাক্য প্রবেশ করে আর আমি বুঝে ফেলি ব্যাপারটা কী ঘটছে।
আযরের পোশাক তল্লাশি করা হয়। ভেতর থেকে এক খণ্ড কাগজ বেরিয়ে আসে, যাতে এই যুদ্ধে সুলতান আইউবীর বাহিনীর বিন্যাস-পজিশনের নকশা অংকিত আছে। আঁকা-বাঁকা দাগ টেনে হামাত শিং-এর চিত্র আঁকা আছে এই কাগজে। অস্পষ্ট বুঝা গেলো। সুলতান আইউবীর পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা দুশমনের কাছে যাচ্ছিলো।
আযর ভাই!- হাসান ইবনে আবদুল্লাহ আরকে কাগজগুলো দেখাতে দেখাতে বললেন। এরপরও যদি সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে, তাহলে বলল, আমি তোমাকে মুক্ত করে দেবো। তুমি যদি নির্দোষ হয়ে থাকো, তবে বলল, আমাকে নিশ্চয়তা দাও। আচ্ছা, তুমি কি মুসলমান?
মহান আল্লাহর কসম।
হাসান ইবনে আবদুল্লাহ আযরের মুখের উপর সজোরে একটা ঘুষি মারেন। আযর কয়েক পা পেছনে চিৎ হয়ে পড়ে যায়। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ ধীর অথচ রোষ কষায়িত কণ্ঠে বললেন- চরবৃত্তি করছে কাফেরদের, আর কসম করছে আমাদের মহান আল্লাহর নামে। আমি তোমাকে একথা জিজ্ঞেস করছি যে, তুমি গুপ্তচর কিনা। আমি জানতে চাচ্ছি, এখানে তোমার সহকর্মী কারা। তাদের নাম বলল, আস্তানার ঠিকানা বলল।
আমি মুসলমান- আযর অনুনয়ের স্বরে বললো- আমি আপনাকে সবদি; বলে দেবো। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবো।
তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও- হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন- এ মুহূর্তে আমার উপর কোনো শর্ত আরোপ করার অধিকার তোমার নেই।
আমি একা, এখানে আমার কোন সহকর্মী নেই। আর হঠকারী উত্তর দেয়।
এই মেয়েটি তোমার তাঁবুতে যে লোকটিকে তোমার সঙ্গে কথা বলতে শুনেছিলো, সে কে? হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ জিজ্ঞেস করে।
আমি তাকে চিনতে পারিনি- আযর জবাব দেয়- সে অন্ধকারে এসে অন্ধকারেই ফিরে গিয়েছিলো।
হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর দুজন লোককে ডেকে বললেন- একে নিয়ে যাও। এর সহকর্মী কারা, তারা কোথায় অবস্থান করছে জিজ্ঞেস করো। মানসূরাকে বললেন- তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ে। ফজরের পর তোমাকে তলব করবো।
***
ফজর নামাযের পর সুলতান আইউবী এসে উপস্থিত হন। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর সঙ্গে। হাসান সুলতানকে জানান, খতীব ইবনুল খামদূমের কন্যা রাতে একজন গুপ্তচর ধরে নিয়ে এসেছে। তিনি পুরো ঘটনা বিবৃত করলে সুলতান বললেন- ইসলামের কন্যাদের কাজ এমনই হয়ে থাকে। আমরা যদি আমাদের কালেমাপড়া দুশমনকে রক্তে লেখা পাঠ না পড়াই, তাহলে তারা জাতির কন্যাদের প্রতিভা নিঃশেষ করে দেবে। আচ্ছা, গুপ্তচর কোথায়?
আপনি এখনই তাকে দেখতে পাবেন না- হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন- তার কক্ষটা শূন্য করার পর আমি তাকে আপনার নিকট নিয়ে আসবো। সুদর্শন এক যুবক। দামেস্কের অধিবাসী বলে দাবি করছে। এখানে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে এসেছিলো।
আযর একটি বৃক্ষের সঙ্গে ঝুলে আছে। মাথাটা নীচের দিকে আর পা দুটো উপর দিকে। মাটি থেকে মাথা এক-দেড় গজ উপরে। নীচে অঙ্গার জ্বলছে। এক সৈনিক কিছুক্ষণ পরপর আগুনের মধ্যে কি যেন নিক্ষেপ করছে, যার ধোয়ায় আর ছটফট করছে ও কাশছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তাকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামিয়ে আনেন। চোখ দুটো ফুলে গেছে। শরীরের সমস্ত রক্ত মুখমণ্ডলে নেমে এসেছে। বাধন খুলে দেয়ার পর আযর দাঁড়াতে পারলো না। কিছুক্ষণ অচেতন অবস্থায় মাটিতে পড়ে রইলো। মুখে পানির ছিটা দেয়া হলো। খানিক পর চোখ খুললে হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন- মাত্র শুরু। না বলো যদি, তাহলে এক এক করে দেহের প্রতিটি জোড়া আলাদা করে ফেলবো।
আযর পানি প্রার্থনা করে। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন- পানি নয়, দুধ পান করাবো। তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। এক সৈনিককে বললেন এক গ্লাস দুধ আর একটি ঘোড়া ও একখানা রশি নিয়ে আসো। রশির এক মাথা তার পায়ের সঙ্গে, অপর মাথা ঘোড়ার সঙ্গে বাঁধো।
আযর দুব্যক্তির নাম বলে। দুজনই স্বেচ্ছাসেবী। এর মধ্যে রাতের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট লোকটিও আছে। সে দামেস্কের আস্তানার ঠিকানাও বলে দেয়। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তৎক্ষণাৎ উভয় স্বেচ্ছাসেবীকে ধরে আনার নির্দেশ দেন এবং আয়রকে সুলতান আইউবীর নিকট নিয়ে যান।
বাড়ী কোথায়?
দামেস্ক।
কার ছেলে?
আর এক জাগিরদারের নাম বলে।
আমি সম্ভবত তাকে চিনি? সুলতান আইউবী বললেন- তিনি কি দামেস্কে আছেন?
আল-মালিকুস সালিহ যখন দামেস্ক থেকে পলায়ন করেন, তখন তিনিও হাব চলে গেছেন। আযর জবাব দেয়।
আর তোমাকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য রেখে গেছেন। সুলতান আইউবী বললেন।
না, আমি নিজেই দামেস্ক থেকে গেছি- আযর বললো- পরে আব্বাজান হাল্ব থেকে এক লোকের মাধ্যমে বার্তা প্রেরণ করেন, আমি যেন গুপ্তচরবৃত্তি করি। আমি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা এবং দিক-নির্দেশনাও পেয়েছিলাম। হাতজোড় করে আযর সুলতান আইউবীকে অনুনয়ের সঙ্গে বললো- আমি মুসলমান। আমার পিতা আমাকে বিভ্রান্ত করেছেন। এখন আপনি আমাকে আপনার সঙ্গে রাখুন। আমি এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবো।
