কনুই আর দেহের সমস্ত ওজন দিয়েও তাগড়া একটা যুবককে কাবু করা একটা মেয়ের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। কিন্তু ঘাড়ের উপর খঞ্জরের আগা আযরকে নিক্রিয় করে ফেলে। তার তরবারীটা হাত থেকে ছুটে পড়ে যায়।
তুমি কে? উপুড় হয়ে পড়ে থাকা অসহায় অবস্থায় নিজ্ঞেস করে আযর।
যার হাত থেকে তুমি বাঁচতে পারবে না। মানসূরা বললো।
তুমি কি নারী?
হ্যাঁ- মানসূরা জবাব দেয়- আমি নারী, তোমার পরিচিত এক নারী। আমার নাম মানসূরা।
উহ্, পাগলী মেয়ে!–আযর হেসে বললো- তুমি ঠাট্টা করছো? আমি তে ভয় পেয়ে গেছি। ঘাড় থেকে খঞ্জর সরাও। ওটা চামড়ায় ঢুকে যাচ্ছে।
এটা ঠাট্টা নয় আযর। তুমি কোথায় যাচ্ছিলে?
আল্লাহর কসম! আমি অন্য কোনো মেয়ের পেছনে যাচ্ছিলাম না- আযৰু বন্ধুসুলভ কণ্ঠে জবাব দেয়- তোমার চেয়ে ভালো মেয়ে আছে বলে আমি মনে করি না। আমি তোমাকে ধোঁকা দিচ্ছি না।
আমাকে নয়, তুমি আমার জাতিকে ধোঁকা দিচ্ছো- মানসূরা বললো তুমি আমাকে সবচেয়ে ভালো মেয়ে মনে করছে। আর আমি তোমাকে সবচেয়ে ভালো পুরুষ মনে করতাম। কিন্তু এখন না তুমি আমার কাছে ভালো, না আমি তোমার কাছে ভালো। কর্তব্যের কাছে আবেগ পরাজিত হয়েছে। তুমি তোমার দায়িত্ব পালনে যাচ্ছে আর আমি আমার কর্তব্য পালন করছি। তুমি যদি আমার স্বামী, আমার দেহ ও আত্মার মালিক কিংবা আমার সন্তানদের পিতা হতে, তবুও আমার খঞ্জর তোমার ঘাড় স্পর্শ করতো।
আচ্ছা, তুমি আমাকে কী মনে করে ফেলে দিয়েছ? আযর জিজ্ঞেস করে।
নামের মুসলমান আর খৃস্টানদের চর মনে করে- মানসূরা জবাব দেয় তুমি খৃস্টান বন্ধুদের বলতে যাচ্ছে যে, সাবধানে আক্রমণ চালাবে এবং পবর্তমালার অভ্যন্তরে ঢুকবে না।
তুমি আসলে জানোই না চর কাকে বলে- আযর বললো- আমি দুশমনকে পর্যবেক্ষণ করতে যাচ্ছিলাম।
আমি জানি, গুপ্তচর কেমন হয়ে থাকে- মানসূরা বললো- আমি অনেক বড় এক গোয়েন্দার কন্যা। ইবনুল মাখদুম কাকরূরীর নাম কখনো শুনেছো? তিনি মসুলের খতীব ছিলেন। আমি তারই দলের গোয়েন্দা। আমি আমার পিতাকে মসুলের কারাগারের পাতাল কক্ষ থেকে বের করে এনেছি এবং নিজে তাঁর সঙ্গে মসুল থেকে পালিয়ে এসেছি। তুমি আনাড়ী গুপ্তচর। অভিজ্ঞ গুপ্তচররা দূরে গিয়ে কথা বলে। কারো তাবুর নিকট দাঁড়িয়ে গোপন কথা বলে না। তুমি স্বেচ্ছাসেবী হয়ে এসেছিলে। এখন এখানে কী করছো?
আমার উপর থেকে সরে যাও- আযর বললো- খঞ্জর সরাও। আমি একটি জরুরী কথা বলতে চাই।
তোমার যবান মুক্ত- মানসূরা বললো- বলো, জরুরী কথা বলো। আমি শুনছি।
আর চুপ হয়ে যায়। তার দেহটা নির্জীব হয়ে গেছে। নিজের মাথাটা মাটির সঙ্গে লাগিয়ে দেয়। মানসূরার সম্মুখে এখন প্রশ্ন- তাকে বাঁধবে কিভাবে এবং কিভাবেই এখান থেকে তাকে নিয়ে যাবে। আয়রকে হত্যা করার ইচ্ছা থাকলে তা কঠিন ছিলো না। কিন্তু মানসূরা তাকে জীবিত সুলতান আইউবীর নিকট নিয়ে যেতে চায়। গুপ্তচরদের জীবিত গ্রেফতার করাই নিয়ম মানসূরার তা জানা আছে। হঠাৎ তার মাথায় ভাবনা আসে যে, আশপাশে কোথাও তাদের সৈনিক থাকতে পারে। তাই মানসূরা সর্বশক্তি দিয়ে উচ্চস্বরে একটা চিৎকার দেয়- কেউ থাকলে এদিকে আসো। আসো, আসো, আসো।
নির্জীব পড়ে থাকা আর হঠাৎ এতো জোরে নড়ে উঠে যে, তার পিঠের উপর কনুই চাপা দিয়ে বসে থাকা মানসূরা একদিকে পড়ে যায়। আর তরবারীর প্রতি হাত বাড়ায়। মানসূরা বিদ্যুাতিতে উঠে পেছন দিক থেকে আয়রকে এমনভাবে ধাক্কা দেয় যে, সে সামনের দিকে পড়ে যায়। মানসূরা তারবারীটা তুলে নেয়। আযর উঠে দৌড় দেয়। তার পক্ষে এই পরিস্থিতিতে মোকাবেলা করার চেয়ে জীবন নিয়ে পালিয়ে যাওয়া বেশী আবশ্যক। মানসূরা চিৎকার করতে করতে তার পেছনে দৌড়াতে শুরু করে। তার পায়ে বিড়ালের শক্তি এসে গেছে। দূরে কোথাও পেট্টোল সেনারা টহল দিচ্ছিলো। তারা মানসূরার চিৎকার শুনতে পেয়ে ছুটে আসে।
সামনে নদী। আযরকে থেমে যেতে হলো। মানসূরা পৌঁছে যায়। দুজন সান্ত্রীও এসে পড়ে। আর নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মানসূরা চিৎকার করে ওঠে ওকে যেতে দিও না, গুপ্তচর। জীবিত ধরে ফেলল।
সান্ত্রীরাও নদীতে ঝাঁপ দেয়। তারা আরকে ধরে ফেলে। কিন্তু একটি মেয়েকে দেখে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তারা ভাবে এটা অন্য কোন ব্যাপার হবে। তাদের জিজ্ঞাসার জবাবে মানসূরা নিজের পরিচয় প্রদান করে এবং লাঙ্গনে কিভাবে এসেছে তার বিবরণ দেয়। মানসূরা জানায়, এই লোকটি বেসেবী হয়ে এসেছিলো। কিন্তু লোকটি সন্দেহভাজন। একে সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট নিয়ে চলো।
শোনো বন্ধুগণ!- আযর সান্ত্রীদের বললো- এখানে তোমরা কী পাও? কটা টাকা আর দুবেলার রুটির জন্য এখানে তোমরা মরতে এসেছে। আমার
সে চলল, তোমাদেরকে রাজপুত্র বানিয়ে দেব। এর মতো মেয়েদের সঙ্গে। মি দেবো। সম্পদ দ্বারা লাল করে দেবো।
যাবো- এক সান্ত্রী বললো- তবে তার আগে তুমি আমাদের সঙ্গে চলো। তুমিও চলো মেয়ে! ওখানে নিয়ে দেখবো, এই লোক গোয়েন্দা, নাকি তুমি। নাকি দুজন এখানে ফস্টিনস্টি করতে এসেছিলে।
***
সুলতান আইউবীর তাবুর সামান্য দূরে হাসান ইবনে আবদুল্লাহর তাঁবু। সান্ত্রীরা আযর ও মানসূরাকে তাদের কমান্ডারের নিকট নিয়ে যায়। কমান্ডার তাদেরকে হাসান ইবনে আবদুল্লাহর নিকট নিয়ে যান। হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে ঘুম থেকে তুলে আযরকে তার হাতে তুলে দেয়া হয়। মানসূরা হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে সমস্ত কাহিনী শোনায়। পশ্চাদ্ধাবনের ঘটনাও সবিস্তারে বিবৃত করে। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ মানসূরাকে নিরীক্ষার সাথে, দেখে বললেন- তোমার চেহারাটা আমার কাছে অপরিচিত নয়। তুমি সম্ভবত মসুল থেকে পালিয়ে এসেছিলে। তোমার সঙ্গে মসুলের খতীব ইবনুল মাখদূমও ছিলেন?
