আযর সুদর্শন যুবক। কথাবার্তা বেশ আকর্ষণীয়। মানসূরার সঙ্গে সালাপ করতে শুরু করে সে। মানসূরাও তাতে স্বাদ নিতে আরম্ভ করে। তারা সূর্যাস্তের আগে আগেই ফিরে আসে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে আর মানসূরার অন্তরে বাসা বেঁধে ফেলে।
ইফতারের পর মেয়েরা তাদের তাঁবুতে বসে আহার করছে। ফৌজের এক কমান্ডার তাঁবুর ভেতর উঁকি দিয়ে তাকায় এবং মেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করে- কোন অসুবিধা নেই তো? মেয়েরা জানায়- না, আমাদের কোন সমস্যা নেই। কমান্ডার ফিরে যায়।
সে সময় আযর বাইরে দাঁড়ানো ছিলো। সে কমান্ডারের সাথে কথা বলতে থাকে। মানসূরা তাদের কথোপকথন শুনছিলো। আর কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করে, এই সামান্য ফৌজ দ্বারা সুলতান তিনটি বাহিনীর মোকাবেলা কিভাবে করবেন?
দুশমনের জন্য ফাঁদ বসানো আছে। যুদ্ধ সেই ময়দানে হবে না, যে ময়দানে হবে বলে দুশমন মনে করছে। আমরা তাদেরকে টেনে সেই জায়গায় নিয়ে যাবো, যেখানে তাদের জন্য আমরা ফাঁদ প্রস্তুত করে রেখেছি। কমান্ডার আযরের আবেগে প্রভাবিত হয়ে বলে দেয়, সুলতান আইউবী তার ফৌজকে কোথায় কিভাবে বণ্টন করেছেন এবং তিনি কী করবেন। মিশরের রিজার্ভ বাহিনীর কথাও বলে ফেলে কমান্ডার।
সে রাতের ঘটনা। মধ্যরাতে মানসূরার চোখ খুলে যায়। আর ইবনে আব্বাসের তাঁবু থেকে কথার শব্দ শুনতে পায়- তোমরা এখনই বেরিয়ে যাও। কিছু বিষয় তোমরা নিজেরা জেনে নিয়েছে। বাকি তথ্য আমি তোমাদেরকে বলে দিয়েছি। আমার পক্ষে এখান থেকে বের হওয়া সম্ভব ছিলো না। ভালোই হলো যে, তোমরা এসে গেছে। এবার রাস্তা চিনে নাও।
আযর পথের বিবরণ দিয়ে বললো- তুমি পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। পায়ে হেঁটেই যেতে হবে। ফাঁদ প্রস্তুত। পাহাড়ের অভ্যন্তরে ঢোকা যাবে না।
মানসূরা এক ব্যক্তির পায়ের শব্দ শুনতে পায়। লোকটি চলে গেছে। মেয়েটি তাঁবুর দরজা সামান্য ফাঁক করে বাইরের দিকে তাকায়। আর তার তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সে একদিকে চলে যায়। মানসূরা তার তাবুর কাউকে না জাগিয়েই সামান থেকে খঞ্জরটা বের করে বেরিয়ে পড়ে।
আকাশে হালকা মেঘ। ফলে জোৎস্না রাত হওয়া সত্ত্বেও কিছুটা অন্ধকার দেখাচ্ছে। আযরকে ছায়ার মতো দেখতে পাচ্ছে মানসূরা। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে আড়ালে আড়ালে আয়রকে অনুসরণ করছে সে। আর একটি টিলার কোল ধরে সম্মুখপানে হাঁটতে শুরু করে। মানসূরাও একই পথ ধরে এগুতে থাকে। পথে কোনো সান্ত্রী কিংবা অন্য কোনো সৈনিক চোখে পড়ছে না। তাতে মানসূরা বুঝে ফেলে, নারী সৈনিক ও স্বেচ্ছাসেবীদের তাঁবু সম্মুখের মোর্চাগুলো থেকে অনেক পেছনে স্থাপন করা হয়েছে এবং তার পেছনে আর কোনো ফৌজ নেই। কিন্তু সেখানে কয়েকটি স্থানে যে ফৌজ বিদ্যমান, মানসূরার তা অজানা। কিন্তু আর আগন্তুককে এমন পথ বলে দিয়েছে, যে পথে কোনো ফৌজ তাকে দেখতে পাবে না। আযর দুটি টিলার মধ্যকার সরু একটি গলির অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। মানসূরা প্রথমে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। সেও তাতে প্রবেশ করে।
সম্মুখে গাছ-গাছালিতে পরিপূর্ণ সমতল ভূমি। আর কোনো একটি গাছের আড়ালে গিয়ে থেমে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আবার হাঁটছে। মানসূরাও একই ধারায় অগ্রসর হচ্ছে।
বেশকিছু পথ অতিক্রম করার পর এখন আবার পাহাড়ের পাদদেশ। আযর এগিয়ে চলছে। মানসূরাও তাকে অনুসরণ করছে। পাহাড়টির অভ্যন্তরে একটি গিরিপথ। আর তাতে ঢুকে পড়ে। ঢুকে পড়ে মানসূরাও।
গিরিপথে ঢোকামাত্র হিমশীতল বাতাসের ঝাঁপটায় মানসূরার পা উপড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তার দেহ নির্জীব হতে শুরু করে। আযরের মনে কী যেন সংশয় জাগে। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পেছন দিকে ফিরে তাকায়। তৎক্ষণাৎ মানসূরা বিশাল একটি পাথরের আড়ালে বসে পড়ে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আর আবার সম্মুখপানে এগুতে শুরু করে। মানসূরা উঠে দাঁড়ায় এবং পাহাড়ের ছায়াটা যেদিকে গিয়ে পড়েছে, মানসূরা সেদিকে এগিয়ে যায়।
গিরিপথ থেকে বের হওয়ার পর এখন খোলা মাঠ। আর দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। মানসূরাও হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সে তো মহিলা। তদুপরি এততক্ষণ বহু পথ অতিক্রম করেছে সে। একদিকে প্রচণ্ড শীত, অপরদিকে পায়ের তলে কংকর। মানসূরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এটা একটা আবেগ, যা মানসূরাকে আযরের পশ্চাতে হাঁকিয়ে নিয়ে এসেছে। এবার তার মনে ভাবনা জাগে, এই পশ্চাদ্ধাবনের ফল কী দাঁড়াবে। আর যদি দৌড় দেয়, তাহলে মানসূরা তার সঙ্গে পেরে উঠবে না। কিন্তু আযরের প্রতি মানসূরার সন্দেহ বাস্তব। আর দুশমনের দিকেই যাচ্ছে। মানসূরা তাকে ধাওয়া করছে ঠিক; কিন্তু তাকে কিভাবে ধরবে বা ধরাবে, ভেবে দেখেনি। এখন তো আর হাঁটছে খুব দ্রুত। এই পরিস্থিতিতে তাকে ধরতে গেলে মুখোমুখি মোকাবেলা করতে হবে। মানসূরার কাছে খঞ্জর আছে। আছে খঞ্জর ব্যবহারের প্রশিক্ষণও। কিন্তু দুশমনের মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা তার নেই। এই দুশমন স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী। মানসূরা কি পারবে পরাস্ত করে তাকে ধরে ফেলতে!
মানসূরা ভাবছে আর দ্রুত হাঁটছে। হঠাৎ আযর থেমে যায়। সে পেছনে ফিরে তাকায়। মানসূরার নিকটে একটি গাছ ছিলো। সে দ্রুত গাছটির আড়ালে চলে যায়। গাছের স্থানটা সামান্য উঁচু। আশপাশটা পাথরে পরিপূর্ণ। মানসূরা পাথরের পেছনে নেমে পড়ে। রাতের নীরবতায় পাথরের শব্দ কানে আসে আযরের। আর পেছন দিকে ফিরে আসে। মানসূরা তার আগমন দেখে ফেলে। সে উঠে না দাঁড়িয়ে গাছটির পিছনে শক্ত করে ধারণ করে। আর গাছটির একেবারে নিকটে চলে আসে। মানসূরা দেখতে পায় তার হাতে খাপখোলা তরবারী। গাছটি অতিক্রম করে আযর সামান্য এগিয়ে গেলে মানসূরা পেছন দিকে থেকে খপ করে তার দুপায়ের গোড়ালী ধরে ফেলে পূর্ণ শক্তিতে পেছন দিকে ঝটকা টান দেয়। আর উপুড় হয়ে সম্মুখ দিকে পড়ে যায়। পরক্ষণেই মানসূরা তার পিঠের উপর দুই চাপা দিয়ে ডান হাতে খঞ্জরের আগাটা তার ঘাড়ে স্থাপন করে। ঘটনাটা দু থেকে তিন সেকেন্ডের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যায়।
