টিলার উপর থেকে নেমে সুলতান আইউবী সামনের দিকে এগিয়ে যান। নারীফৌজ ও পুরুষ স্বেচ্ছাসেবীদের কাফেলাটি নিকটে চলে আসে। কমান্ডার আবু ওয়াক্কাস ঘোড়া থেকে নেমে সুলতান আইউবীর নিকট চলে যান। তিনি সালাম দিয়ে নূরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রীর পত্রখানা সুলতানের হাতে তুলে দেন। সুলতান পত্র পাঠ করতে শুরু করেন
আমার ভাই! আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুন। আমার স্বামী জীবিত থাকলে আজ আপনাকে এতোগুলো দুশমনের সম্মুখে একা থাকতে হতো। আমি আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারছি না। যা সব ছিলো, আপনার সখীপে পেশ করলাম। এই মেয়েগুলোকে আমি আহতদের ব্যান্ডেজ-চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছি। বিপুল পরিমাণ ঔষধপত্রও পাঠিয়ে দিলাম। সঙ্গে একশত পুরুষ স্বেচ্ছাসেবী প্রেরণ করলাম। প্রবীণ যোদ্ধারা এদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। প্রত্যেককে কমান্ডো আক্রমণের অনুশীলনও প্রদান করেছে। সবাই উদ্দীপ্ত-উজ্জীবিত। আমি জানি, আমার মেয়েগুলোকে ময়দানে প্রেরণ করা আপনি পছন্দ করবেন না। আমি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অবগত আছি। কিন্তু আপনাকে স্মরণ রাখতে হবে, যদি আপনি এদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দেন, তাহলে দামেস্কবাসীর মন ভেঙ্গে যাবে। এই নগরীর লোকদের মাঝে কিরূপ চেতনা বিরাজ করছে, আপনি তা জনেন না। পুরুষরা ময়দানে যেতে প্রস্তুত। নারীরা আপনার নেতৃত্বে লড়াই করতে অস্থির। এই বাহিনীকে সকল নপরবাসী পরম শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসার সঙ্গে বিদায় করেছে। এখানকার শিশু-কিশোররাও সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। আপনার সৈন্যের অভাব থাকবে না।
সুলতান আইউবী পত্রখানা পাঠ করেন। তাঁর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তিনি মেয়েগুলোর প্রতি চোখ তুলে তাকান। ওরা মেয়ে বটে; কিন্তু ঘোড়ার পিঠে তাদেরকে সৈনিক বলেই মনে হচ্ছে। সুলতান আইউবী তাদের সবাইকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে নিজের সম্মুখে দাঁড় করান। তিনি বললেন
আমি তোমাদের প্রত্যেককে যুদ্ধের ময়দানে স্বাগত জানাচ্ছি। তোমাদের জযবার মূল্য আমি পরিশোধ করতে পারবো না। আল্লাহ তোমাদেরকে উপযুক্ত বিনিময় দান করবেন। মেয়েদের যুদ্ধের ময়দানে ডেকে আনবো আমি কখনো ভাবিনি। আমার ভয় হচ্ছে, ইতিহাস বলবে, সালাহুদ্দীন আইউবী নারীদের দিয়ে যুদ্ধ করিয়েছেন। তবে আমি তোমাদের চেতনাকে বিক্ষতও করতে পারি না। তোমাদের মধ্যে যদি কোনো মেয়ে এমন থাকে যে স্বেচ্ছায় আসেনি, সে আলাদা সরে দাঁড়াও। আর তারাও আলাদা হয়ে যাও, যাদের অন্তরে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ কিংবা ভীতি আছে?
কিন্তু মেয়েদের কেউই সরে দাঁড়ালো না।
সুলতান আইউবী বললেন–
আমি তোমাদেরকে নিরাপদ স্থানে রাখবো। যুদ্ধের সময় আমি তোমাদেরকে সামনে যেতে দেবো না। তারপরও ভূখণ্ডটা এমন যে, তোমরা দুশমনের নাগালে এসে যেতে পারো। কেউ বর্শার আঘাতে মারাও যেতে পারো। এমনও হতে পারে, তোমাদের কেউ দুশমনের হাতে ধরা পড়ে যাবে। এ কথাও শুনে রাখো যে, তীর-তরবারী ও বর্শার জখম খুবই শহর ও গুরুতর হয়ে থাকে।
এক মেয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলো- আপনি ইতিহাসকে ভয় করছেন আর আমরাও ইতিহাসকে ভয় করছি। আমরা যদি ফিরে চলে যাই, তাহলে ইতিহাস বলবে, জাতির মেয়েরা সুলতান আইউবীকে একাকী ময়দানে ফেলে ঘরে বসেছিলো।
অপর এক মেয়ে বললো, আল্লাহ সালাহুদ্দীন আইউবীর তরবারীতে আরো শক্তি দান করুন। আমরা হেরেমের জন্য জন্মাইনি।
আরেক মেয়ে বললো- তিন চাঁদ আগে আমার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। আপনি যদি আমাকে ফেরত দেন, তাহলে আমি আমার স্বামীকে নিজের জন্য হারাম মনে করবো।
তোমার স্বামী নিজে কেন আসেনি? সুলতান জিজ্ঞাসা করলেন- সে, তার স্ত্রীকে কেনো পাঠিয়ে দিয়েছে?
তিনি আপনার ফৌজেই আছেন। মেয়েটি জবাব দেয়।
এবার সবগুলো মেয়ে একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। তারা তাদের জোশ ও জযবার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। হৈ-চৈ কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসলে এক মেয়ে বলে উঠলো- মহামান্য সুলতান! আপনি আমাদেরকে যুদ্ধ করার সুযোগ দিন; আমরা আপনাকে নিরাশ করবো না।
আমি তোমাদেরকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেবো, এ কথা তোমরা ভুলে যাও- সুলতান আইউবী বললেন- আমি তোমাদেরকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করবো
সুলতান আইউবী সেদিনই মেয়েদেরকে চার-চারজনের দলে বিভক্ত করে দেন। প্রতিটি দলের সঙ্গে একজন করে স্বেচ্চাসেবী নিয়োজিত করেন। স্বেচ্চাসেবীদের সম্পর্কে বলা হয়েছিলো, তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সুলতান আইউবী তাদের সেবা-শশ্রুষার কাজে নিয়োজিত করেন। কেননা, তারা নিয়মিত সৈনিক নয়। ফৌজের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা তাদের নেই। সুলতান আইউবী তাদেরকে সেই সৈনিকদের হাতে তুলে দেন, যারা শহীদদের লাশ ও আহত সৈনিকদের তুলে আনা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্বে নিয়োজিত। তারা মেয়ে এবং স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ শুরু করে দেয়।
***
ফাতেমা, মানসূরা, হুমাইরা ও সাহার পড়ে একদলে। তাদের একদলে একত্রিক হওয়া একটি অলৌকিক ব্যাপার। কেননা, তারা দামেস্কও। এসেছিলো একসঙ্গে। হৃদয়ের বাসনা, জ্বলন এবং চেতনাও তাদের অভিন্ন। তাদের দলের স্বেচ্ছাসেবীর নাম আযর ইবনে আব্বাস। আযরের ক্ষুদ্র তবুটি আলাদা। তার সন্নিকটেই স্থাপন করা হয়েছে চার মেয়ের বড় তাবু। এই চার মেয়ের মধ্যে খতীবের কন্যা অন্যদের তুলনায় সর্বল, বুদ্ধিমতি ও চতুর। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে মানসূরা দেখতে পেলো, আর একটি টিলার উপর উঠে এদিকে-ওদিক তাকাতে শুরু করেছে। দেখে সেও উপরে চলে যায় এবং ইতিউতি তাকায়। উপত্যকা ও পাহাড়ের ঢালুতে সৈনিক দেখা যাচ্ছে। আর মানসূরাকে বললো, এসো আমরা আরো একটু সম্মুখে যাই। মানসূরা আযরের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে। আর প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী এবং পাহাড়ী এলাকার প্রশংসা করতে শুরু করে।
