আমিও কর্তব্য পালন করতে এসেছি- ফাতেমা বললো- আমি গোমস্তগীনকে হত্যা করতে এসেছি।
অসম্ভব- আনতামূন বললেন- মহামান্য সুলতান নারীদেরকে রণাঙ্গন থেকে অনেক দূরে রাখেন। তিনি সম্ভবত তোমাদের প্রত্যেককে ফিরিয়ে দেবেন।
আমি ফিরে যাবো না- ফাতেমা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো- আমি প্রমাণ করবো, নারী হেরেমের জন্য নয়- জিহাদের জন্য জন্মেছে। আনতান! আমাকে তুমি সঙ্গে করে নিয়ে যাও। আমার আকাঙ্খটা তুমি পূর্ণ করো। আমাকে পুরুষের পোশাক পরিয়ে দাও।
এ হতে পারে না- আনতানূন বললেন- আমি যদি তোমাকে সঙ্গে রাখি, তাহলে আমার মনোযোগ তোমার উপর আটকে থাকবে। আমি কর্তব্য পালন করতে ব্যর্থ হবে। আর যদি ধরা খেয়ে যাই, তাহলে একটি মেয়েকে সঙ্গে রাখার অপরাধে আমাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হবে। আমাদের উদ্দেশ্য যতোই পবিত্র ও সৎ হোক না কেন, এই অন্যায় সামান্য নয়। ফাতেমা! যুদ্ধ আবেগ দ্বারা লড়া যায় না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখো। তুমি যেদিকে যাওয়ার জন্য এসেছে, চলে যাও। হতে পারে, সুলতান তোমাদেরকে জখমীদের ব্যান্ডেজ-চিকিৎসার দায়িত্বে নিয়োজিত করবেন।
তারপর আবার কবে কোথায় দেখা হবে? ফাতেমা জিজ্ঞেস করে।
যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে হতে পারে; জীবিত কিংবা মৃত আনতান জবাব দেয়- একজন গেরিলা সৈনিক আগাম বলতে পারে না কখন কোথায় থাকবে এবং তার লাশ কোথা থেকে উদ্ধার করা হবে। তাছাড়া গেরিলাদের লাশ পাওয়া যায় না। তারা দুশমনের ভিড়ের মধ্যে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে। তারপরও যদি আমি বেঁচে থাকি, সোজা তোমার নিকট এসে যাবো।
এমনও তো হতে পারে যে, তুমি যুদ্ধে আহত হবে আর আমি তোমার ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করবো। ফাতেমা বললো।
গেরিলা সৈনিকদের ব্যান্ডেজ-চিকিৎসা করে শত্রুরা- আনতানূন জবাব দেয়- তুমি আবেগপ্রবণ হয়ে না ফাতেমা! আমাদেরকে আবেগ ত্যাগ করতে হবে, ত্যাগ করতে হবে ভালবাসাও। তুমি যদি এই কামনা করো, যে, তুমি কোনো মুসলমানের হেরেমেও যাবে না, দুশমনের হিংস্রতা থেকেও বেঁচে থাকবে, তাহলে আমার চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলল। যুদ্ধের ময়দানে তোমাকে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হবে, তা-ই শুধু পালন করবে। আর তুমি গোমস্তগীনকে হত্যা করতে পারবে না। এই ভাবনাটাও মাথা থেকে ফেলে দাও।
আনতানের কোনো কথাই ফাতেমাকে প্রভাবিত করলো না। না তার অন্তর থেকে গোমস্তগীন হত্যার চিন্তা দূর হলো, না আনতানূনের ভালবাসা।
***
সুলতান আইউবীর তৎপরতা দুটি। হয় তিনি রণাঙ্গনের মানচিত্র দেখে তাতে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন, নয়তো ঘোড়ার পিঠে চড়ে নিজ বাহিনীর মোর্চাগুলো পরিদর্শন করবেন। তিনি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত প্রতিরক্ষা যুদ্ধ লড়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। আসল যুদ্ধটা তিনি হামাতের অভ্যন্তরে লড়তে চাচ্ছেন, যার পরিকল্পনা তার ঠিক করা আছে। কিন্তু একটা সমস্যা হলো, ডান পার্শ্বে টিলার সংখ্যা বেশি নয়। তার পিছনে খোলা মাঠ। দুশমন সেই পথে বেরিয়ে যেতে কিংবা সেদিক থেকে এসে ক্ষতিসাধন করতে পারে। আর তাতে সুলতান আইউবীর সমস্ত পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যাওয়ার আশংকা বিদ্যমান। তার কাছে এতে সৈনিকও নেই যে, তিনি এই ময়দানে অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর দেয়াল তৈরি করে ফেলতে পারবেন। পার্শ্ববর্তী টিলার উপর তিনি তীরন্দাজ বসিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এতোটুকু আয়োজন যথেষ্ট নয়। ময়দানের জন্য তিনি দুই ইউনিট আরোহী ও পদাতিক বাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছেন। কিন্তু তাদেরকে এখনো লুকিয়ে রেখেছেন। এই ময়দানই সুলতান আইউবীকে বেশি অস্থির করে তুলছে। তাছাড়া আরো একটা বিশেষ বাহিনী তিনি তৈরি করে নিজের কাছে রেখেছেন।
সুলতান আইউবী একটা টিলার উপর দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক পর্যবেক্ষণ করছেন। এমন সময় দূরদিগন্তে তিনি ধূলি উড়তে দেখতে পান। একজন সৈনিক এই ধূলির তাৎপর্য ভালোভাবেই বুঝে। সুলতান বুঝে ফেললেন, কোনো অশ্বারোহী বাহিনী এগিয়ে আসছে। ধূলির বিস্তৃতিদেখে বুঝা যাচ্ছে ঘোড়াগুলো এক সারিতে নয়- চার কিংবা ছয় সারিতে সারিবদ্ধ হয়ে সুবিন্যস্তরূপে অগ্রসর হচ্ছে। এই বাহিনী দুশমন ছাড়া আর কারো হতে পারে না। সুলতান ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন- এই পথে কি আমাদের একজন লোকও ছিলো না। প্রস্তুতির নির্দেশ দাও।
প্রস্তুতির ঘণ্টা বেজে ওঠে। প্রতিরক্ষার জন্য যে পদ্ধতিতে প্রস্তুত হওয়ার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিলো, তারা সে পদ্ধতিতেই প্রস্তুত হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর ঘোড়া চোখে পড়তে শুরু করে। কিন্তু তাদের চলন শত্ৰু কিংবা আক্রমণকারীসুলভ নয়। সুলতান আদেশ করেন, দু-চারজন অশ্বারোহী এগিয়ে গিয়ে জেনে আস, তারা কারা? কয়েকজন অশ্বারোহী ছুটে যায়। ফিরে এসে তারা দূর থেকেই চিৎকার করে বলতে শুরু করে- দামেস্ক থেকে স্বেচ্ছাসেবী এসেছে। সঙ্গে নারী ফৌজও আছে।
নারী ফৌজ?- কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে যায় সুলতান আইউবীর। কণ্ঠে বিস্ময়- নারী ফৌজ! কিছুক্ষণ নীরব থেকে স্তস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন- এই বাহিনী আমার বিধবা বোনটি গঠন করে পাঠিয়ে থাকবেন। জঙ্গী মরহুমের বিধবাই এ কাজ করতে পারেন।
সুলতান আইউবী হাসতে শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সুলতান অতীতে কখনো এতো হাসেননি। হাসতে হাসতে তিনি আবেগাপুত হয়ে পড়েন। তিনি উফুল্লচিত্তে পার্শ্বে দণ্ডায়মান সালারদের বলতে শুরু করলেন আমার জাতির মেয়েরা তোমাদেরকে সফলকাম না করে নিঃশ্বাস ফেলবে না। এই কিশোরীগুলোর ইজ্জতের জন্য আমরা কেননা জীবন বিলিয়ে দিচ্ছি না। কিন্তু… কিন্তু আমি তাদেরকে ফিরিয়ে দেবো। একটি মেয়েও যদি শক্রর হাতে। চলে যায়, তাহলে আমি মরেও শান্তি পাবো না।
