নূরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রী হাজ্জাজ আবু ওয়াক্কাসকে একটি লিখিত বার্তা দিয়ে বললেন, এটি সালাহুদ্দীন আইউবীকে দেবে। আমার যা বলার সব লিখে দিয়েছি। তাকে বলবে, এই মেয়েগুলোকে আহতদের সেবা-শশ্রুষার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তুমি ভালোভাবে শুনে নাও, এই মেয়েগুলোকে এবং স্বেচ্ছাসেবী মোহাফেজদেরকে তোমার সঙ্গে রাখবে। এরা প্রত্যেকে গেরিলা হামলার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। মেয়েরাও যুদ্ধ করতে জানে। আহতদের সেবার বাহানা দেখিয়ে তোমরা লড়াই করবে। সুযোগ পেলেই দুশমনকে দুর্বল করে ফেলবে। আমি মেয়েদেরকে বলে দিয়েছি, তারা যেন দুশমনের হাতে ধরা না পড়ে। তারা নিজেরাই বলছে, ধরা পড়ার আশংকা দেখা দিলে নিজের তরবারী দ্বারাই নিজেকে শেষ করে ফেলবে।
চারশত মেয়ে ও একশত স্বেচ্ছাসেবী পুরুষ যোদ্ধার এই বাহিনীটি ঘোড়ায় আরোহন করে যখন রওনা হয়, তখন সমগ্র শহর যেনো হুমড়ি খেয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়ে। জনতা ইসলামের এই সৈনিকদেরকে ফুল ছিটিয়ে স্বাগত জানায়। নারায়ে তাকবীর-আল্লাহ আকবার, ইসলাম জিন্দাবাদ, সালাহুদ্দীন আইউবী জিন্দাবাদ স্লোগানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। জনতা তাদেরকে এই বলে উৎসাহিত করে যে, তোমরা ফিরে এসো না, সম্মুখপানে এগিয়ে যাও। সালাহুদ্দীন আইউবীকে বলবে, দামেস্কের সকল নারী আসবে। আল্লাহ তোমাদেরকে বিজয়, দান করুন। ইসলামের একজন শত্রুও বেঁচে থাকতে পারবে না। শহরের বহু মানুষ উট-ঘোড়ায় আরোহন করে বহু দূর পর্যন্ত তাদের সঙ্গে গিয়ে বিদায় জানায়।
***
রমযান মাস। পথে এক রাত অবস্থান করতে হবে। ইফতারের খানিক আগে কাফেলা এক স্থানে যাত্রাবিরতি দেয়। মেয়েরা খাবার প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাতে শীত পড়ছে। কাফেলায় ঘোড়ার পাশাপাশি উটও আছে। উটগুলোর পিঠে তাঁবু বোঝাই করা। তাঁবুগুলোর ভেতরে লুকিয়ে রাখা আছে বর্শা, তরবারী ও তীর-ধনুক। সূর্যাস্তের আগ মুহূর্তে কোথা থেকে যেন আটজন অশ্বারোহী এসে হাজির হয়। এরা সুলতান আইউবীর গেরিলা সৈনিক দামেস্ক থেকে রণাঙ্গনগামী পথের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। তারা কাফেলা দেখে খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য এসেছে।
অশ্বারোহীদেরকে কাফেলার দিকে আসতে দেখে কমান্ডার হাজ্জাজ আবু ওয়াক্কাস এগিয়ে যান। গেরিলাদের কমান্ডার হলেন আনতান। তিনি আবু ওয়াক্কাসকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কারা এবং কোথায় যাচ্ছেন? আবু ওয়াক্কাস তাকে ঘটনাটা বিস্তারিত অবহিত করেন। আনতানুন নিশ্চিত হয়ে যান।
গেরিলাদের দেখে অনেকগুলো মেয়ে ছুটে এসে তাদের চারপাশে জড়ো হয়। সকলের একই প্রশ্ন, ময়দানের খবর কী? আনতন্ন তাকে জানান, যুদ্ধ এখনো শুরু হয়নি এবং কখন শুরু হবে তাও বলা যায় না।
আনতানূন বলতে বলতে থেমে যান। তার দৃষ্টি একটি মেয়ের উপর নিবদ্ধ হয়ে আছে। এক সময় বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ফাতেমা! তুমি কিভাবে এসেছো?
ফাতেমা অস্থিরচিত্তে এগিয়ে এসে আনতানূনের ডান হাতটা ধরে ফেলে। আনতানূন ফাতেমাকে গোমস্তগীনের হেরেম থেকে বের করে এনেছিলো। আবু ওয়াক্কাস আনতানূনকে বললেন, আপনি আমার সঙ্গে ইফতার করবেন এবং খানা খাবেন।
সবাই যার যার কাজে চলে যায়। ফাতেমা আনতানূনকে জয় করে ফেলে। আনতান্ন তাকে রাতে একত্র হওয়ার জন্য একটা জায়গা ঠিক করে দেয়।
দামেস্ক থেকে দূরবর্তী এই বিজন অঞ্চলে মাগরিবের আযানের সুললিত সুর ভেসে ওঠে। সবাই ইফতার করে নামায আদায় করে। পরে আহারপর্ব সমাপ্ত করে। সারাদিনের ক্লান্ত সবাই। অনেকে শুয়ে পড়ে। আনতানূন ডিউটি করার নাম বলে সঙ্গীদের থেকে আলাদা হয়ে একদিকে চলে যায়।
মেয়েদের ভেতর থেকে ফাতেমা চুপি চুপি বের হয়ে আসে। তাঁবু এলাকা থেকে দূরে এক স্থানে দাঁড়িয়ে আনতানূনের অপেক্ষা করছে সে। আনতানূন এসে গেছেন। ফাতেমার সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল হাররানে। সে সময় আনতানূন সুলতান আইউবীর গুপ্তচর ছিলেন। হাররানের শাসনকর্তা ও সুলতান আইউবীর দুশমন গোমস্তগীনের হেরেমের মেয়ে বলে তাকে হাত করেছিলো আনতানূন। তাকে গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ব্যবহার করতে চাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ঘটনাক্রমে ফাতেমা এক খৃস্টান উপদেষ্টাকে খুন করে ফেলে এবং আনতান্ন গ্রেফতার হয়ে পরে ফাতেমাকে নিয়ে পালিয়ে আসেন। সুলতান আইউবী ফাতেমাকে দামে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং আনতানূন তার আবেদন মোতাবেক গেরিলা বাহিনীতে ভর্তি করে নেন। দীর্ঘদিন পর আজ অনাকাঙ্খিতভাবে ফাতেমার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়ে গেলে তার মনে তীব্র অনুভূতি জাগে যে, ফাতেমাকে ছাড়া তার জীবন অচল এবং মেয়েটা তার হৃদয়ে গেঁথে গেছে। অপরদিকে ফাতেমার অবস্থাও অনুরূপ।
ফাতেমা ও আনতানূন দুজনই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। কেউই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। কিন্তু এক সময় নিজেকে সামলে নিয়ে আনতামূন ললো- ফাতেমা! আমাদের কর্তব্য এখনো পালিত হয়নি। আমি হাররানে আমার দায়িত্ব শেষ করে আসতে পারিনি। তোমাকে সেখান থেকে বের করে আনা আমার কোনো কৃতিত্ব ছিলো না। এটা আমার কর্তব্যও ছিলো না। আমি সুলতান আইউবীর সম্মুখে লজ্জিত। জাতির কাছেও আমার মুখ দেখানোর সুযোগ নেই। দায়িত্ব পালন করতে না পারার কাফফারা স্বরূপ আমি গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিয়েছি। সুলতান আইউবী এই সাতজন কমান্ডোর নেতৃত্ব আমার উপর সোপর্দ করেছেন। তোমাকে আমি অনুরোধ করি, তুমি এরপর পুনরায় আমার গতিরোধ করো না। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি আমাকে কর্তব্য পালনের সুযোগ দাও।
