দামেস্কে নূরুদ্দীন জঙ্গী মরহুমের বিধবা স্ত্রী অপর এক রণাঙ্গন চালু করে রেখেছেন। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যখন দামেস্ক ত্যাগ করে চলে যান, তখন থেকেই এই মহিয়সী নারী মেয়েদের একটি স্বেচ্ছাসেবক ফৌজ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। মেয়েদেরকে যুদ্ধাহত সৈনিকদেরকে রণাঙ্গন থেকে সরিয়ে আনা, ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ প্রদান করার নিয়ম প্রচলিত ছিলো। কিন্তু নূরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী তার বাহিনীর মেয়েদেরকে তরবারী চালনা, বোমাবাজি এবং তীরন্দাজীর প্রশিক্ষণও প্রদান করছেন। এ কাজের জন্য তিনি কয়েকজন অভিজ্ঞ পুরুষকেও দলে রেখেছেন। তিনি জানতেন, সুলতান আইউবী যুদ্ধক্ষেত্রে মেয়েদের উপস্থিতি পছন্দ করেন না। এমতাবস্থায় তিনি মেয়েদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করবেন, সে কথা তো ভাবাই যায় না। তথাপি তিনি মেয়েদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন। তাছাড়া তখনকার পরিস্থিতিটাই এমন ছিলো যে, মানুষ নিজ নিজ মেয়েদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরণ করাকে গর্বের বিষয় মনে করতো। দশ বার বছরের কিশোরীরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কাঠের তরবারী তৈরি করে তরবারী চালনার অনুশীলন করতো।
সম্প্রতি জঙ্গীর স্ত্রীর বাহিনীর সদস্য সংখ্যা চারজন বৃদ্ধি পেয়েছে। তন্মধ্যে একজন হলো ফাতেমা, যাকে সুলতান আইউবীর এক গুপ্তচর গোমস্তগীনের হেরেম থেকে বের করে এনেছে। একজন মসুলের খতীব ইবনুল মাখদূমের কন্যা মানসূরা। অপর দুজন সেই দুই মেয়ে, যাদেরকে হাল থেকে গোমস্তগীনের নিকট উপহারস্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং সালার শামসুদ্দীন ও শাদবখত হাররানের কাজীকে হত্যা করে সেখান থেকে উদ্ধার করে এনেছিলো। তারা হলো হুমায়রা এবং সাহার। এরা সুলতান আইউবীর নিকট রণাঙ্গনে গিয়েছিলো। সেখান থেকে সুলতান তাদেরকে দামেস্ক পাঠিয়ে দেন। এ ধরনের অসহায় মেয়েদেরকে নূরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রীর হাতে সোপর্দ করা হতো। এই চারজন মেয়েও তার নিকট পৌঁছার পর তিনি তাদেরকে সামরিক . প্রশিক্ষণে ভর্তি করে দেন। তাদের স্বপ্নও এটিই ছিলো, যা পূরণ হয়েছে।
তারা জঙ্গীর স্ত্রীকে নিজ নিজ কাহিনী শোনায়। তিনি তাদেরকে তার সংগঠনের মেয়েদের নিকট নিয়ে যান এবং বলেন, তোমরা এদেরকে পুখানুপুঙ্খরূপে তোমাদের কাহিনী শোনাও, চার মেয়ে নিজ নিজ কাহিনী শোনায়। খতীব কন্যা মানসূরা অত্যন্ত জ্ঞানী ও সচেতন। সে মেয়েদের উদ্দেশ করে বললো-
নারী হলো জাতির ইজ্জত। দুশমন যখন কোনো জনবসতি দখল করে, তখন তাদের সৈন্যরা সর্বপ্রথম নারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তোমরা এই মেয়ে দুটোর মুখ থেকে শুনেছ যে, খৃস্টান কবলিত এলাকাগুলোতে খৃস্টানরা মুসলমানদের সঙ্গে কত ভয়ংকর ও নির্মম আচরণ করে চলেছে। সেখানে একটি মুসলিম মেয়েরও ইজ্জত অক্ষত নেই। আল্লাহ না করুন, দামেস্কও যদি তাদের দখলে চলে যায়, তাহলে তোমাদেরকেও একই পরিণতি বরণ করতে হবে। আমরা যদি রক্তের কুরবানী দিতে অসম্মত হই, তাহলে খৃস্টানরা আমাদের প্রভুতে পরিণত হবে। তারা আমাদের বহু আমীরকে ক্রয় করে নিয়েছে। এখন খৃস্টানরাও আমাদের শত্রু, মুসলিম আমীরগণও আমাদের শত্রু। আমরা যদি বিজয় অর্জন করতে চাই, তাহলে প্রতিশোধের স্পৃহা জীবিত ও শাণিত রাখতে হবে। আমার আব্বাজান বলে থাকেন, যে জাতি কাফিরদের বর্বরতার শিকার ভাইদের কথা ভুলে যায়, সে জাতি বেশিদিন টিকে থাকে না।
আমার বোনেরা! আমি মোহতারাম সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ভক্ত। আমি আইউবীর নামে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতেও প্রস্তুত আছি। কিন্তু তাঁর একটা নীতি আমি পছন্দ করি না, তিনি নারীকে রণাঙ্গনে যেতে দেন না। তিনি যা চিন্তা করেছেন, হয়ত ঠিকই করেছেন। যুবতী ও সুন্দরী মেয়েদেরকে হেরেমের অভ্যন্তরে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। আমাদেরকে পুরুষের বিনোদনের উপকরণ বানানো হয়েছে। এভাবে জাতির অর্ধেক শক্তি বেকারই রয়ে গেছে। দুশমন সৈন্য নিয়ে আসে। তার মোকাবেলায় আমাদের সৈন্যসংখ্যা তাদের অর্ধেকও হয় না। তাই আমরা নারীদের পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধ করে সৈন্যের অভাব পূরণ করবো। আমি মসুলে গোয়েন্দা দলে ছিলাম। এই ময়দানে আমি লড়াই করে এসেছি। আমার পিতার ভুলটা ছিলো, তিনি আবেগতাড়িত হয়ে তাঁর মনের কথা বলে ফেলেছেন। ধরা না খেলে সেখানে আমাদের পরিকল্পনা অন্যকিছু ছিলো। আমরা সেখানে ধ্বংসলীলা চালাতে পারিনি এবং সেখান থেকে আমাদের পালিয়ে আসতে হলো।
চার মেয়ের জ্বালাময়ী বক্তব্য নূরুদ্দীন জঙ্গীর বাহিনীর মেয়েদের স্পৃহাকে আরো শাণিত করে তুলেছে। এখন তারা পূর্বের তুলনায় অনেক উজ্জীবিত। তাদের চারশত মেয়ে ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে প্রস্তুত হয়ে আছে। জঙ্গীর স্ত্রী তাদেরকে রণাঙ্গনে প্রেরণ করার সব আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলেছেন। তারা রওনা হবে বলে। নবাগত চার মেয়েও কয়েকদিনের মধ্যে কিছু প্রশিক্ষণ অর্জন করে ফেলেছে। কিন্তু এখনও পূর্ণ দক্ষ হয়ে ওঠেনি বলে তাদেরকে অনুমতি দেয়া হলো না। কিন্তু তাদের হৃদয়ে প্রতিশোধস্পৃহা এতোই বেশি যে, তারা এই বাহিনীর সঙ্গে ময়দানে যেতে জিদ ধরে। ফাতেমা, হুমায়রা তো রীতিমতো কেঁদে ফেলে। অগত্যা জঙ্গীর স্ত্রী তাদেরকেও বাহিনীতে যুক্ত করে নেন। একশত পুরুষ যোদ্ধাও তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হলো। তাদের কমান্ডার হলেন হাজ্জাজ আবু ওয়াক্কাস।।
