আজ রাতেই?- এক ফেদায়ী বললো- আগামীকাল দিনে গেলে হয় না?
অতো সময় নেই- গোমস্তগীন বললেন- তোমাদের পথ অনেক দীর্ঘ। গন্তব্যে পৌঁছতে দুদিন সময় লাগবে। ঘোড়াগুলোকে আরাম দিতে দিতে যাবে। দ্রুত চলার দরুন ঘোড়া পথেই ক্লান্ত হয়ে পড়লে পরে গন্তব্যে পৌঁছা কঠিন হবে।
গোমস্তগীন বাক্স থেকে পোশাকগুলো বের করে তাদের হাতে দিয়ে বললেন- এগুলো এখানেই পরে নাও। তিনি দারোয়ানকে বললেন, সেই নয়টি ঘোড়া নিয়ে আসো, যেগুলো আমি আলাদা করে রেখেছিলাম।
মধ্যরাতের পর। নয়জন অশ্বারোহী গোমস্তগীনের তাঁবু ত্যাগ করে হামাতের দিকে রওনা হয়ে যায়। সর্বসম্মুখের অশ্বারোহীর হাতে সুলতান আইউবীর ঝাণ্ডা। অপর আটজনের বর্শার আগায় বাঁধা ছোট ছোট পতাকা।
***
সেদিনের যে সময়টিতে গোমস্তগীন তার সালার ও কমান্ডারদেরকে জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে উৎসাহিত-উদ্দীপ্ত করছিলেন, সেদিন একই সময়ে সাইফুদ্দীন এবং হালবের সৈন্যরাও অনুরূপ উত্তেজনাকর ভাষণ শুনছিলো। হালবের এক সালার নিজ ঘোড়ার পিঠে চড়া অবস্থায় তার সৈনিকদেরকে বলছিলো
ইনি সেই সালাহুদ্দীন, যিনি হাল অবরোধ করেছিলেন। তোমরা সালাহুদ্দীনকেই এবং তার এই ফৌজকেই হাল্ব থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে। আমি কাবার প্রভুর শপথ করে বলছি, সালাহুদ্দীন কোনো দুর্গ বা শহর অবরোধ করলে তাকে জয় না করে ক্ষান্ত হন না, এ কথাটা সর্বৈব মিথ্যা। তিনি হালবের অবরোধে কেন সফল হননি? তিনি কেন অবরোধ তুলে নিয়েছিলেন? শুধু এ কারণে যে, তোমরা হলে সিংহ। তোমরা জানবাজ মুজাহিদ। তোমরা শহর থেকে বের হয়ে তার উপর যে আক্রমণ পরিচালনা করেছিলে, তিনি তা সামাল দিতে পারেননি। জয় তারই ভাগ্যে জুটে, যার উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন। মহান আল্লাহ তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট। সালাহউদ্দীন আইউবীর উপর আল্লাহ কেনো খুশী হবেন? তিনি তো লুটেরা। তিনি দামেস্ক দখল করেছেন। পদানত করার পর সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে তিনি কিরূপ আচরণ করেছেন, সেখানে গিয়ে দেখে আসো। সেখানকার একজন নারীর ইজ্জতও অক্ষত নেই। আমরা দামেস্ক ত্যাগ করে হাল্ব চলে এসেছি। কিন্তু আমাদের দামেস্ক ফিরে যেতে হবে। সালাহুদ্দীন আইউবী থেকে আমাদেরকে প্রতিশোধ নিতে হবে। আল্লাহর সৈনিকগণ! তোমরা একথা চিন্তা করো না যে, মুসলমান হয়ে তোমরা মুসলমান সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে। সেই মুসলমান কাফিরের চেয়েও নিকৃষ্ট, যে মুসলমানদের শহর-নগর দখল করে বেড়ায়। এমন মুসলমানকে হত্যা করা তোমাদের উপর আল্লাহ ফব্রজ করে দিয়েছেন।
খেলাফতের মোহাফেজগণ! তোমাদের শত্রু খৃস্টানরা নয়- সালাহুদ্দীন আইউবী ও তার বাহিনী। তিনিই খৃস্টানদেরকে আমাদের শত্রুতে পরিণত করেছেন। নূরুদ্দীন জঙ্গী জাতির উপর সবচেয়ে বড় অবিচার এই করেছেন যে, তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর হাতে মিশরের শাসন ক্ষমতা তুলে দিয়েছেন। অন্যথায় লোকটা ক্ষুদ্র একটি সেনাদলের কমান্ড করারও যোগ্য ছিলেন না। আমি তো তাকে আমার বাহিনীতে সাধারণ সৈনিক হিসেবেও নিয়োগ দেবো না। এবার মৃত্যু তাকে এই পার্বত্য এলাকায় টেনে নিয়ে এসেছে। এখন তার সম্মুখে থাকবে তোমাদের তরবারী, বর্শা আর ঘোড়া। পেছনে থাকবে টিলা আর পাহাড়। তোমরা তাকে ও তার সৈনিকদেরকে পিষে মেরে ফেলতে পারবে। হালবের অপমান আর ধ্বংসের প্রতিশোধ তোমাদের নিতেই হবে। তোমরা যদি সালাহুদ্দীন আইউবীকে এখানে এই পার্বত্য অঞ্চলে খতম করতে না পারো, তাহলে তিনি সোজা হালব চলে আসবেন। তার দৃষ্টি হালবের উপর নিবিষ্ট। তিনি তোমাদেরকে তার গোলাম বানাতে চাচ্ছেন। তোমাদের বোন কন্যারা তার সালারদের হেরেমের সেভায় পরিণত হবে। আমি মিথ্যুক হতে পারি, নূরুদ্দীন জঙ্গীর পুত্র মিথ্যুক নন। গোমস্তগীন তত মিথ্যা বলছেন না। এতোগুলো আমীর যদি মিথ্যুক না হয়ে থাকেন, তাহলে এক সালাহুদ্দীন অবশ্যই মিথ্যুক। আর এ কারণেই ইসলামের তিনটি বাহিনী তাকে পিষে মারতে এসেছে। তোমরা সকলে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, তোমরা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মুসলমান। আজ প্রমাণ করতে হবে, ইসলাম ও আত্মমর্যাদার খাতিরে তোমরা আপন ভাইয়েরও রক্ত ঝরাতে পারো।
বাহিনী বাহ্যত নীরবে সালারের বক্তব্য শুনছিলো। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা চরমভাবে উত্তেজিত ও ক্ষিপ্ত। সালার সূত্য ও বাস্তবকে মাটিচাপা দিয়ে ফৌজের চেতনাকে উত্তেজিত করে তুলেছে। সৈন্যরা ধ্বনি দিতে শুরু করে- আমরা কারো গোলামী বরণ করে নেবো না, আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীকে বেঁচে থাকতে দেবো না। তারা স্লোগানে স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে।
সাইফুদ্দীনের ক্যাম্পের অবস্থাও উত্তেজনাকর। তিনিও তার বাহিনীকে ক্ষেপিয়ে তুলছিলেন। তিনি তার সৈনিকদের জন্য একটি সুযোগ এই করে দেন যে, তিনি দুজন আলিম থেকে ফতোয়া নিয়ে এসেছেন, যুদ্ধের ময়দানে রোযা রাখা ফরজ নয়। এ ঘোষণায় তার সৈন্যরা সবাই খুশী। সাইফুদ্দীন বললেন, আমরা তখন আক্রমণ করবো, যখন আইউবীর রোযাদার সৈনিকদের দম নাকের আগায় এসে যাবে। তারপর আমাদের গন্তব্য হবে দামেস্ক। দামেস্কের অঢেল সম্পদ হবে তোমাদের।
***
সুলতান আইউবী তার সৈনিকদের উদ্দেশে ভাষণ দেননি। তাঁর দৃতি সেই ভূখণ্ডটির উপর নিবদ্ধ, যেখানে তাঁকে লড়াই করতে হবে। এই যুদ্ধে কিভাবে অধিকতর সামরিক স্বার্থ উদ্ধার করা যায়, তা-ই তার ভাবনা। তিনি কথাবার্তা যা বলেছেন, বলেছেন সিনিয়র ও জুনিয়র কমান্ডারদের সঙ্গে। তাও বাস্তবভিত্তিক কোনো উত্তেজনাকর বক্তৃতা নয়। একটা বিষয় মনে পড়লেই কেবল মাঝে-মধ্যে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতেন যে, মুসলমান বন্ধুরাই তার ফিলিস্তিনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে আর মুসলমানরা মুসলমানের হাতে খুন হচ্ছে। তার কাছে এর কোনো প্রতিকারও ছিলো না। সন্ধি ও শান্তির জন্য প্রতিপক্ষের নিকট দূত প্রেরণ করে তিনি নিজেকেই। অপমানিত করেছেন। এখন সংঘাত-সংঘর্ষে তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি মিশর থেকে আসা বাহিনীকে পরিকল্পনা মোতাবেক বিভক্ত করে দিয়ে এখন দুশমনের অপেক্ষায় অস্থিরচিত্তে সময় অতিবাহিত করছেন। তিনি তার উপদেষ্টাদের নিকট অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, সম্ভবত শক্র বাহিনী চাচ্ছে, আমরা পাহাড়ি এলাকা থেকে বের হয়ে তাদের উপর আক্রমণ করি। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত, তিনি এ স্থান ত্যাগ করবেন না। তিনি দুশমনকে বিভ্রান্ত করার ফন্দি এঁটে বসে আছেন। তিনি ইচ্ছা করলে কমান্ডো সেনাদের দ্বারা দুশমনের ক্যাম্পে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা-ও করলেন না। তিনি দুশমনের চাল-কৌশল পর্যবেক্ষণ করছেন।
