নয়জনের একজনও গোমস্তগীনের বক্তব্যে অসন্তুষ্ট হলো না। তার বক্তব্য ও পরিকল্পনার সঙ্গে বরং একমত পোষণ করলো। দলনেতা বললো- আমি আপনার প্রতিটি কথার সঙ্গে একমত। সালাহুদ্দীন আইউবী যদি আমাদেরকে সুফী কিংবা ইমাম মনে করে সম্মানের সাথে তার তাঁবুতে বসতে দেন আর আমাদের আপ্যায়নের জন্য খাবারের আয়োজন করেন, তাহলে আমার এই বন্ধুরা খাদ্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। একজন ইমাম ও খতীব কিভাবে আহার করেন, আমরা একজনও তা জানি না। আপনি কী বুদ্ধি ঠিক করেছেন?
অত্যন্ত সহজ ও নিরাপদ-গোমস্তগীন বললেন- আমি তোমাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর স্বেচ্ছাসেবী রক্ষীসেনা দলে ঢুকিয়ে দেব। তবে তার জন্য খুব যাচাই-বাছাই করে রক্ষী নির্বাচন করা হয়ে থাকে। তাদের পরিবার পরিজনেরও খবরাখবর নেয় হয়। তাই যাওয়া মাত্রই তোমরা তার রক্ষী বাহিনীতে ঢুকে যেতে পারবে, এমনটা সম্ভব নয়। আমি যে পন্থাটা ভেবে রেখেছি, আশা করি তোমরা তাতে সফল হবে। তাহলো, গোয়েন্দারা জানিয়েছে, দামেস্কের লোকদের মাঝে আমাদের বিরুদ্ধে এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর পক্ষে এতো বেশী আবেগ ও উদ্দীপনা বিরাজ করছে যে, তারা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে রণাঙ্গনে ছুটে আসছে। আমি জানতে পেরেছি, আইউবী তাদেরকে নিয়মতান্ত্রিক সেনাবাহিনীতেও ভর্তি করে নিচ্ছেন এবং অন্য কাজেও ব্যবহার করছেন। এই পরিস্থিতি থেকে আমি ফায়দা হাসিল করতে চাই।
গোমস্তগীন আলাদাভাবে রাখা একটি কাঠের বাক্স টেনে হাতে নেন। তিনি বাক্সটা খুলেন। তার ভেতরে কতগুলো পোশাক। তিনি ঘাতকদের উদ্দেশ করে বললেন–
তোমরা প্রত্যেকে এই পোশাক পরিধান করে সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট যাবে। এটা তার রক্ষী সেনাদের ইউনিফর্ম। তোমাদের একজনের হাতে আইউবীর ঝাণ্ডা থাকবে। অবশিষ্ট আটজনের বর্শার আগায় আইউবীর সৈন্যদের পতাকা থাকবে। তোমরা সোজা আইউবীর নিকট চলে যাবে। এক স্থানে তোমাদেরকে থামিয়ে দেয়া হবে। তোমাদেরকে আইউবীর নিকট যেতে দেয়া হবে না। তোমরা আপুত কণ্ঠে বলবে, আমরা স্বেচ্ছাসেবী। আমরা দামেস্ক থেকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর হেফাজতের জন্য এসেছি। আরো বলবে, আমরা অত্যন্ত মমতার সঙ্গে রক্ষী বাহিনীর পোশাক প্রস্তুত করে এনেছি এবং অন্তরে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ভক্তি নিয়ে এসেছি। আমাদেরকে সুলতানের আশপাশে প্রহরার দায়িত্বে নিয়োজিত করুন কিংবা কোনো জানবাজ বাহিনীতে যুক্ত করে দিন। আমরা ফেরত যাবো না।
গোমস্তগীন বললেন- তোমাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট যেতে দেয়া হবে না। তোমরা জিদ ধরবে এবং বলবে, আমরা বহুদূর থেকে ভক্তি ও আবেগ নিয়ে এসেছি। সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে আমরা যাবো না। আমি তোমাদেরকে নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, আইউবী জযবার খুব মূল্যায়ন করে থাকেন। তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে সাক্ষাৎ দেবেন। বর্শাগুলো তোমাদের হাতে থাকবে। যদি তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন, তাহলে তোমরা ঘোড়া থেকে নামবে না। নিকটে গিয়েই ঘোড়া হাঁকাবে আর তার দেহটা বর্শার আঘাতে ঝাঁঝরা করে দিয়ে পালিয়ে আসার চেষ্টা করবে। তোমরা প্রত্যেকে জীবনের বাজি লাগানোর শপথ করেছে। তবে আমার আশা, তোমরা প্রত্যেকে নিরাপদে পালিয়ে আসতে সক্ষম হবে। আমার পূর্ণ বিশ্বাস, সুলতানকে আহত অবস্থায় দেখামাত্র রক্ষীদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে যাবে। ঘটনাটা কী ঘটলো বুঝবার আগেই তোমরা তাদের তীরের আওতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। আমি তোমাদেরকে আরবের এমন উন্নত জাতের ঘোড়া প্রদান করবো, বাতাসও যাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠে না।
পন্থাটা অত্যন্ত ভালো- ফেদায়ী ঘাতকচক্রের প্রধান বললো আমাদের সেই সহকর্মীরা আনাড়ি ও কাপুরুষ ছিলো, যারা আইউবীকে ঘুমন্ত অবস্থায়ও হত্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং উল্টো তার হাতে প্রাণ হারিয়েছে ও জীবন্ত গ্রেফতার হয়েছে। এবার আমরা যাচ্ছি। আমরা যদি আইউবীর মাথাটা কেটে নাও আসতে পারি, আপনি এ সংবাদ অবশ্যই শুনতে পাবেন যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নিহত হয়েছেন।
আর যদি আমরা তাকে হত্যা করে ফিরে আসতে পারি, তাহলে? এক ফেদায়ী হেরেমের মেয়েদের তাঁবুগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে এবং শয়তানী হাসি হাসে।
গোমস্তগীন শয়তানী হাসির সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচিত। তিনিও ঠোঁটে অনুরূপ হাসি টেনে বললেন- তোমাদের যারা জীবিত ফিরে আসবে এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করে আসবে, তাদেরকে আমি এক একটি তাঁবুতে প্রবেশ করিয়ে দেবো। খৃস্টানরা তোমাদেরকে যে পুরস্কার প্রদান করবে, তার চেয়ে আমি তোমাদেরকে এতো বেশী সোনা-দানা প্রদান করবো, যা তোমরা কখনো স্বপ্নেও দেখোনি। আর যে ব্যক্তি সালাহুদ্দীন আইউবীর মাথা কেটে নিয়ে আসবে, তাকে তার পছন্দ অনুসারে দুটি মেয়ে আজীবনের জন্য দিয়ে দেবো।
ফেদায়ীরা পশুর ন্যায় চিৎকার করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। গোমস্তগীন বড় কষ্টে তাদেরকে থামিয়ে বললেন- এসো, আমি তোমাদেরকে হামাতের দিকে যাওয়ার রাস্তাটা দেখিয়ে দিয়ে আসি। তবে সাবধান! পথে যদি কেউ তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করে, তোমরা কারা এবং কোথা থেকে এসেছে, তাহলে শুধু এটুকু বলবে যে, আমরা দাশে থেকে এসেছি এবং রণাঙ্গনে যাচ্ছি। পথে সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা ও গেরিলা সৈন্যদের সঙ্গে তোমাদের সাক্ষাৎ হবে। আজ রাতই তোমাদের রওনা হতে হবে।
