নয় ব্যক্তি খাবারের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তারা ভুনা গোশতের বড় বড় টুকরো হাতে নিয়ে রাক্ষসের মতো গিলতে শুরু করে। পাশাপাশি মদপান করছে পানির মতো। তাদের চোখগুলো রক্তজবার ন্যায় টকটকে লাল, যেনো তারা জংলী ও রক্তখোর হায়েনা। তিন-চারটি সুন্দরী মেয়ে তাদের পেয়ালায় মদ ভরে দিয়ে চলেছে আর তারা মেয়েগুলোর সঙ্গে অশ্লীল অচিরণ করছে। কখনো কোনো মেয়ের এলো চুলে বিলি কাটছে। কখনো বা বিবস্ত্র বাহু ধরে কাছে টেনে এনে সোহাগ করছে। এক কথায় গোমস্তগীনের তাঁবুতে একসঙ্গে ভুঁড়িভোজন, মদপান আর নারীভোগ করে চলেছে নয় অতিথি। গোমস্তগীন তাদের আচার-আচরণ ও খাওয়ার ধরন দেখে মুচকি হাসছেন। কিন্তু তার হাসিই প্রমাণ করছে, তিনি হাসছেন জোরপূর্বক। এই লোকগুলো তার বিলকুল অপছন্দ।
আহার শেষ হলে গোমস্তগীন মেয়েগুলোকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে মেহমানদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। দীর্ঘক্ষণ গল্প-গুজব করার পর গোমস্তগীন বললেন- তোমাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর উদ্দেশ্যে বিদায় করে দেয়ার সময় হয়ে গেছে। এবারকার আক্রমণ যেনো ব্যর্থ না হয়।
আপনি যদি আমাদেরকে থামিয়ে না রাখতেন, তাহলে এতোক্ষণে সুসংবাদ পেয়ে যেতেন যে, অজ্ঞাত ঘাতকের হাতে সালাহুদ্দীন আইউবী খুন হয়েছেন। এক ব্যক্তি বললো।
এরা হাসান ইবনে সাব্বাহর নয় ফেদায়ী, যাদেরকে শেখ সান্নান সুলতান আইউবীকে হত্যা করার জন্য ত্রিপোলী থেকে প্রেরণ করেছিলো। আকার গঠনে মানুষ হলেও এরা চরিত্রে হায়েনা। তারা নিজ নিজ ডান হাতে মধ্যমা আঙ্গুল থেকে দশ দশ ফোঁটা করে রক্ত বের করে পাত্রে রাখে। তার মধ্যে মদ ও হাশীশ মিশিয়ে শরবত তৈরি করে প্রত্যেকে এক এক চুমুক পান করে বিশেষ শব্দে শপথ নিয়েছিলো যে, আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করবোই। শেখ সান্নান তাদেরকে দুনিয়াত্যাগী সুফীর পোশক পরিয়ে হাতে তাসবীহ ও গলায় কুরআন ঝুলিয়ে এই নির্দেশনা দিয়ে প্রেরণ করেছিলো, তোমরা সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছে যাও এবং তার সম্মুখে আলোচনা উত্থাপন করো যে, মুসলমানকে মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াই না করা উচিত। তারপর বলবে, আমরা মধ্যস্থতা করে এই আত্মকলহ মিটিয়ে দিতে চাই। এ ব্যাপারে আমরা অন্যান্য মুসলিম আমীরদের সঙ্গে কথা বলেছি। এখন আপনার নিকট আসলাম। এভাবে সুযোগ মতো তোমরা সুলতান আইউবীকে হত্যা করে ফেলবে।
শেখ সান্নান কৌশলটা ঠিক করেছে ভালোই। সুলতান আইউবী আলিম উলামা ও ধর্মীয় নেতাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে কাছে বসাতেন এবং মনোযোগ সহকারে তাদের বক্তব্য শুনতেন। তার আরো একটি দুর্বলতা এই ছিলো যে, তিনি চাচ্ছিলেন, কেউ মাঝে পড়ে বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে তাকে একটা সমঝোতা করিয়ে দিতে, যাতে মুসলমানে-মুসলমানে খুনাখুনি বন্ধ হয়ে যায়। অন্যথায় খৃস্টানরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার এবং হামলা করে সাফল্য অর্জনের সুযোগ পেয়ে যাবে। তিনি হাব প্রভৃতি এলাকায় দূতও প্রেরণ করেছিলেন, যারা অপমানজনক উত্তর নিয়ে ফিরে এসেছে। এবার তাঁর সেই দুর্বলতাকে পুঁজি করে তাকে খুন করার পরিকল্পনা নিয়ে আসছে সূফীবেশী নয় সদস্যের একদল ঘাতক। তার সেই মনোবাঞ্ছা পূরণ করার নামে চোগার ভেতরে খঞ্জর আর তরবারী লুকিয়ে আছে তারা। এটা সুলতান আইউবীকে হত্যা করার এক সহজ পন্থা। তারা ত্রিপোলী থেকে রওনা হয়ে হাররান এসে পৌঁছেছিলো। খৃস্টান উপদেষ্টারা গোমস্তগীনকে বলেছিলো, এরা সুলতান আইউবীকে হত্যা করতে যাচ্ছে। তিনি তাদের নিকট হত্যা প্রক্রিয়ার কথা শুনে তা প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে রাজকীয় মেহমানের মর্যাদা দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেন এবং খৃস্টান উপদেষ্টাদের বলে দেন, আমি সুলতান আইউবীর উপর আক্রমণ করতে যাচ্ছি। আপনাদের এই নয় ঘাতককে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাবে এবং সুযোগ মতো অন্য কোনো পন্থায় সুলতান আইউবীকে খুন করাবো। সে মতে গোমস্তগীন তাদেরকে সঙ্গে করে ময়দানে নিয়ে এসেছেন।
রণাঙ্গনে গোমস্তগীন তাদের জন্য সুযোগও সৃষ্টি করে নিয়েছেন, এবং তাদের ছদ্মবেশও প্রস্তুত করে ফেলেছেন। আহার শেষে তিনি তাদেরকে বললেন এবার আমি তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার কী পন্থা আমি ঠিক করে রেখেছি। তোমরা যে সুফীবেশ ধারণ কব্লেছো, তা সন্দেহ জন্ম দিতে পারে। আইউবীর দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও গভীর। তার উপর ইতিপূর্বে চারবার সংহারী আক্রমণ হয়েছিলো। ফলে তিনি অধিক সতর্ক হয়ে গেছেন। তার উচ্চ পর্যায়ের অভিজ্ঞ দুজন গোয়েন্দাও আছে। একজন আলী বিন সুফিয়ান, অপরজন হাসান বিন আবদুল্লাহ। তারা এক দৃষ্টিতেই মানুষকে আন্দাজ করে ফেলতে পারে। আমাদের গোয়েন্দাদের সংবাদ মোতাবেক এ সময় হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর সঙ্গে আছে। আর আলী বিন সুফিয়ান আছে কায়রো। কোনো অপরিচিত লোক সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য গেলে দুতিনজন সালার এবং হাসান বিন আবদুল্লাহ তাকে গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করে নেয়। সন্দেহ হলে তল্লাশিও নিয়ে থাকে। আইউবী কিংবা হাসান ইবনে আবদুল্লাহ প্রশ্ন করতে পারেন যে, এই সংঘাত আত্মকলহ তো কয়েক মাস ধরেই চলে আসছে। তা তোমাদের সন্ধি সমঝোতার চিন্তাটা আজ আসলো কিভাবে? আইউবী এ-ও জিজ্ঞেস করতে পারেন, তোমরা কোথাকার ধর্মীয় নেতা? কিংবা তিনি এমন কোনো প্রশ্ন করতে পারেন, তোমরা যার উত্তর দিতে পারবে না অথবা এমন উত্তর দেবে, যার ফলে তোমাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে। তিনি নিজে আলিম। ধর্ম ও ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান রয়েছে। তাছাড়া তোমাদের চেহারায় দাড়ি ব্যতীত সুফীদের আর কোনো লক্ষণ চোখে পড়ছে না। তোমাদের চারজনের দাড়ি এখনো ছোট, যা প্রমাণ করছে, মাসখানেক ধরে তোমরা দাড়ি রেখেছো। তোমাদের চোখে হাশীশ ও মদের ক্রিয়া পরিস্ফুট। এই চেহারাগুলোতে পবিত্রতার লেশও চোখে পড়ছে না।
