আমার ইউনিটগুলোর সালার ও কমান্ডারদেরকে আমি যেসব নির্দেশনা প্রদান করেছি, তা তোমরাও একবার শুনে নাও- সুলতান আইউবী বললেন হতে পারে, আমি তোমাদের আগে মৃত্যুবরণ করবো এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ামাত্রই মারা যাবো। আমার পরে রণাঙ্গনের দায়িত্ব তোমাদেরকেই পালন করতে হবে। আমি তাদেরকে বলেছি, তাঁবুগুলো খাটানো অবস্থায় থাকতে দাও। ঘোড়াগুলোকে জিন ছাড়া বেঁধে রাখো। ভাবনাহীন ভাব প্রদর্শন করে ঘোরাফেরা করো এবং এদিক-ওদিক বসে ও শুয়ে থাকে। তবে তাঁবুতে তাঁবুতে অস্ত্র ও জিন প্রস্তুত রাখো। দুশমনের গোয়েন্দারা তোমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদেরকে এই ধারণী দাও যে, দুশমন সম্পর্কে তোমাদের কোনই খবর নেই। দুশমনের বাহিনী এসে পড়লে নিজেদেরকে ভীত বলে প্রকাশ করবে এবং অস্ত্র হাতে তুলে নেবে। কিন্তু তারপরও তাঁবুগুলোকে দাঁড়িয়ে থাকবে দেবে। সম্মুখে অগ্রসর হয়ে মোকাবেলা করবে না। দুশমন উপরে উঠে এলে লড়াই করতে করতে এতোটুকু দ্রুত পেছনে সরে যাবে, যেনো দুশমনের আক্রমণকারী বাহিনী তোমাদেরই সঙ্গে এই পার্বত্য এলাকায় তোমাদের বেষ্টনীতে এসে পড়ে। দুশমনকে বুঝাবে, তোমরা পিছপা হয়ে যাচ্ছ।
সুলতান আইউবী দুই টিলার মধ্যবর্তী গলিটির প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন—
আমি এই বাহিনীগুলোকে বলে দিয়েছি, তোমরা এই গলির মধ্যে ঢুকে পড়ে পিছন দিক দিয়ে বের হয়ে যাবে। তারপর তাদেরকে কোথায় গিয়ে একত্রিত হতে হবে, তাও তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে।
সুলতান তাঁর বন্ধুদেরকে জায়গাটার কথা উল্লেখ করে বললেন –
এই বাহিনীগুলোকে দুমশনের পেছনে চলে যেতে হবে। এই পার্বত্য অঞ্চলটিতে আমি দুশমনকে স্বাগত জানোনোর যে ব্যবস্থা করে রেখেছি, তা তোমাদের জানা আছে। স্মরণ রেখো আমার বন্ধুগণ! আমরা এখানে কোনো অঞ্চল বা কোনো দুর্গ জয় করবো না। আমাদের কাজ হলো দুশমনকে অসহায় ও নিষ্ক্রিয় করে তোলা, যাতে তারা আমাদের পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। আমার মুসলমান ভাইদেরকে দুশমন বলতে আমার লজ্জা হয় কিন্তু কী করবো, পরিস্থিতি আমাকে তা বলতে বাধ্য করছে। আমি তাদেরকে ধ্বংস করতে চাই না। আমি নির্দেশ জারি করে দিয়েছি, যতো বেশী সম্ভব শত্রুসেনাদের জীবিত গ্রেফতার করো আর যুদ্ধবন্দী বানাও। আমি তাদেরকে তরবারী দ্বারা পদানত করে চরিত্র দ্বারা বুঝাবো যে, তোমরা মুসলিম সৈনিক এবং তোমাদের রাজা তোমাদের ধর্মের শত্রুদের হাতে খেলছে।
কোনো জাতিকে যদি হত্যা করতে হয়, তাহলে তাদের মাঝে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে দাও- সালার শামসুদ্দীন বললেন- খৃস্টানরা সাফল্যের সঙ্গে এই অস্ত্রটা ব্যবহার করেছে।
মুসলিম জাতির দৃষ্টান্ত বারুদের ন্যায়- সুলতান আইউবী বললেন বারুদের এই স্কুপের উপর যদি কোনো দিক থেকে জ্বলন্ত অঙ্গার এসে পতিত হয়, তাহলে সেটি বিস্ফোরণে ফেটে যায়। জাতির এই দুর্বলতা যদি শিকড় গেড়ে বসে, তাহলে আল্লাহ ছাড়া কেউ তাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না। দুশমন তাদেরকে দলে দলে বিভক্ত করে পরস্পরে যুদ্ধ করায় এবং জাতির কর্ণধারণ ক্ষমতার লোভে পরস্পর লড়াই করতে থাকে। এই যে তিনটি গোষ্ঠী স্বজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে, তাদের নেতারা ঐক্যবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও একে অপরের শত্রু। তারা প্রত্যেকে একে অপরকে ধোঁকা দিয়ে সালতানাতে ইসলামিয়ার রাজা হতে চায়। আমি তাঁদের দেমাগ থেকে রাজত্বের পোকা বের করে জাতিকে সঠিক পথে তুলে আনার চেষ্টা করছি। আমার লক্ষ্য ইসলামের সুরক্ষা ও প্রসার।
***
হামাত থেকে সামান্য দূরে হাররানের দুর্গপতি গোমস্তগীন- যিনি স্বায়ত্তশাসনের ঘোষণা দিয়েছিলেন- নিজ সালার ও ছোট-বড় কমান্ডারদেরকে একত্রিত করে বলছিলেন–
সালাহুদ্দীন আইউবী খৃস্টানদেরকে পরাজিত করতে পারে। কিন্তু যখন সে তোমাদের সামনে আসবে, সব কৌশল ভুলে যাবে। সে আমাদের গোষ্ঠীভুক্ত নয়- সে কুর্দি। তোমরা পাক্কা মুসলমান, দ্বীনদার ও পরহেজগার। আর সে শুধু নামের মুসলমান। সালাহুদ্দীন প্রতারক ও বদকার মানুষ। এখানে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে সে তার রাজা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। আমি তোমাদেরকে তার সামরিক অবস্থাও জানিয়ে দিচ্ছি। তার সৈন্যসংখ্যা অনেক কম এবং সে পাহাড়বেষ্টিত হয়ে পার্বত্য অঞ্চলে বসে আছে। এই একটু আগে গোয়েন্দারা আমাকে সংবাদ দিয়ে গেলো যে, সালাহুদ্দীনের ফৌজ তাঁবুর অভ্যন্তরে আরামে সময় কাটাচ্ছে এবং তার ঘোড়াও অলস দাঁড়িয়ে আছে। তার কারণ দুটি হতে পারে। প্রথমত, সে নিশ্চিত, আমরা তাকে পরাজিত করতে পারবো না। দ্বিতীয়ত, সে এই আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত থাকবে পারে যে, আমরা তার উপর হামলা করবো না। এমনও হতে পারে, সে সন্ধির জন্য আমাদের নিকট দূত পাঠাবে। কিন্তু এখন আর আমরা তার সঙ্গে কোনো সন্ধি বা সমঝোতা করবো না। সে এখন আমাদের কয়েদী। যদি সে জীবিত অবস্থায় আমাদের হাতে ধরা না দেয়, তাহলে আমি তোমাদেরকে তার লাশ দেখাবো। তোমরা তোমাদের সৈনিকদেরকে বলে দাও, সালাহুদ্দীন আইউবী মাহদী বা নবী-রাসূল নয় এবং তার সৈন্যদের মাঝেও কোনো জিন-ভূত নেই। আমরা তার বাহিনীকে তাদের অজ্ঞাতেই ঝাঁপটে ধরবো।
শ্রোতাদেরকে উত্তেজিত করে এবং তাদের সাহস বৃদ্ধি করে গোমস্তগীন তাদেরকে বিদায় করে দিয়ে নিজে তাঁবুতে চলে যান। তাঁবু তো নয় যেন জঙ্গলের মঙ্গল। বিশাল এক তাঁবু, যার ভেতরে জাজিম ও মূল্যবান পালঙ্ক সাজানো। আছে মদের সোরাহী ও কারুকার্য খচিত মদের পেয়ালা। ভেতর থেকে তাবুটাকে প্রাসাদের সুসজ্জিত কক্ষ বলে মনে হয়। তার আশপাশে আরো কতগুলো তাঁবু খাটানো, যেগুলো সামরিক তাঁবুগুলো থেকে ভিন্ন ধরনের ও আকর্ষণীয়। এ তাঁবুগুলোতে বাস করছে হেরেমের মেয়েরা এবং গায়িকা নর্তকীরা। তাঁবুগুলো থেকে দূরে দূরে পাহারাদাররা দাঁড়িয়ে আছে। গোমস্তগীনের তাঁবুর বাইরে এক ব্যক্তি তার অপেক্ষায় দণ্ডায়মান। তাদের দেখেই গোমস্তগীন দ্রুত হাঁটা দেন এবং নিকটে গিয়ে তাদেরকে ভেতরে ঢুকতে বলেন। তারা ভেতরে প্রবেশ করামাত্র একদল মেয়ে তশতরি হাতে তাবুতে ঢুকে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যে খাবার এসে হাজির হয়। এসে পড়ে মদের সোরাহীও। গোমস্তগীন এই নয় ব্যক্তির সঙ্গে আহারে যোগ দেন।
