মিশর থেকে আসা সাহায্যকারী বাহিনীকে সুলতান আইউবী রিজার্ভ রেখে দেন এবং কমান্ডারদেরকে তাদের উধর্বতন সালারদের হাতে তুলে দেন। সালারদেরকে যুদ্ধের পরিকল্পনা পূর্বেই দিয়ে রাখা হয়েছে।
***
ফজরের আযান হয়ে গেছে। সুলতান আইউবী গোসল করেন। খাপ থেকে বের করে তরবারীটা হাতে নেন। তরবারীর ঝলক ও ধার পরখ করেন। তারপর অকস্মাৎ তার আবেগ উথলে ওঠে। তিনি তরবারীটা উভয় হাতের উপর রেখে কেবলার দিকে মুখ করে হস্তদ্বয় উপরে তুলে ধরেন। তারপর চক্ষু বন্ধু করে দুআ করতে শুরু করেন
মহান আল্লাহ! তোমার সন্তুষ্টি যদি এতে নিহিত থাকে যে, তুমি আমাকে পরাজিত করবে, তাহলে আমি এই লাঞ্ছনা মাথা পেতে বরণ করে নিতে প্রস্তুত আছি। আর যদি তুমি আমাকে বিজয় দান করো, তাহলে আমি তোমার কৃতজ্ঞতা আদায় করবো। আজ আমি তোমার রাসূলের নাম উচ্চরণকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। এটা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তুমি আমাকে ইঙ্গিত দাও, আমি নিজের তরবারীটা আমার পেটের ভেতর সেঁধিয়ে দেই। আমি সেই কিশোরীদের ডাকে সাড়া দিতে এসেছি, যাদের সম্ভ্রম শুধু এই জন্য লুণ্টিত হয়েছে যে, তারা তোমার রাসূলের উম্মত। আমি তোমার সেই অসহায় বান্দাদের আহ্বানে এসেছি, যারা একমাত্র মুসলমান হওয়ার কারণে কাফিরদের নির্মম অত্যাচারের শিকার। আমি তোমার মহান ধর্মের মর্যাদা সংরক্ষণ করার জন্য পাহাড়-পর্বত, জঙ্গল-মরু ভূমিতে ঘুরে ফিরছি। আমি তোমার রাসূলের প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাসকে দখলমুক্ত করার জন্য রওনা হয়েছিলাম। কিন্তু তোমার রাসূলের একদল উম্মত আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তুমি আমাকে ইশারা দাও, তাদের রক্ত ঝরানো আমার জন্য হালাল না হারাম। আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাইনি তো? আমাকে তুমি তোমার নূরের চমক দেখাও। আমি যদি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি, তাহলে তুমি আমাকে সাহস ও দৃঢ়তা দান করো।
সুলতান আইউবী মাথাটা অবনত করে ফেলেন। এই অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর হঠাৎ তরবারীটা কোষবদ্ধ করে বাইরে বেরিয়ে নামাযের স্থানে চলে যান।
জামাত দাঁড়িয়ে গেছে। সুলতান পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে যান। একদিকে বাবুর্চি, অপরদিকে তার এক কমান্ডারের আদালী দণ্ডায়মান।
***
নামায আদায় করে সুলতান আইউবী হামাতের দিকে রওনা হয়ে যান। পথে পরপর চারজন দূতের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। তারা তাঁকে মৌখিকভাবে রিপোর্ট প্রদান করে। এরা তথ্যানুসন্ধানকারী দলের দূত, যারা হাররান, হাব ও মসুলের সম্মিলিত বাহিনীর গতিবিধি ও তৎপরতার সংবাদ নিয়ে এসেছিলো।
এই ধারা দিন-রাত চলতে থাকে। সুলতান আইউবী দূতদেরকে বিদায় করে দেন। সালার শামসুদ্দীন তার সঙ্গে আছেন। শামসুদ্দীনের ভাই শাদবখতকে তিনি অন্য এক স্থানে মোতায়েন করে রেখেছেন।
শক্র সম্পর্কে যেসব খবরাখবর পাওয়া যাচ্ছে, সে ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?- শামসুদ্দীন জিজ্ঞেস করলেন- এই সামান্য ফৌজ দিয়ে আমরা এতো বিশাল বাহিনীর মোকাবেলা করতে পারবো কি?
দুশমন কতজন সৈন্য নিয়ে এসেছে আর আমার কজন সৈন্য আছে, আমার কাছে এটা কোনো বিষয় নয়- সুলতান আইউবী বললেন- আমি অস্থির এই জন্য যে, দুশমন আক্রমণ করছে না কেন? আমার সেই মুসলমান ভাইদের নিকট খৃষ্টান গোয়েন্দা আছে, তারা কি এতই আনাড়ি হয়ে গেলো যে, তারা জানতেই পারলো না, মিশর থেকে আমার সাহায্য আসছে এবং আমি সাহায্য ছাড়া লড়াই করতে পারবো না! দুশমন যদি তৎপর হতো, তাহলে আমার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো। দুশমনের এ পর্যন্ত এসে থেমে যাওয়া এবং আমাকে এতোটুকু সময় দেয়া যে, সাহায্য পেয়ে যাবো, তাদেরকে বিন্যস্ত করে ফেলবো, সকল সৈন্যের সবগুলো ঘোড়াকে পানি পান করাবো এবং পানি রিজার্ভ করে নেবো; আমার জন্য অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার আশংকা হচ্ছে, দুশমন এমন কোনো কৌশল প্রয়োগ করবে, যা কখনো আমার মাথায় আসেনি। তো তামাশা করতে আসেনি।
আমি তাদেরকে যতোটুকু জানি- শামসুদ্দীন বললেন- তাদের হাতে এমন কোনো কৌশল নেই। আল্লাহর উপর আমার ভরসা আছে। আল্লাহ তাদের বিবেকের উপর মোহর মেরে দিয়েছেন। কেননা, তারা বাতিলের পরিকল্পনা ও সাহায্য নিয়ে সত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছে। তাদের চোখের উপর পটি বেঁধে দেয়া হয়েছে। আমি গভীর কোনো কৌশল-ষড়যন্ত্রের আশংকা করছি না।
শামসুদ্দীন ভাই!- সুলতান, আইউবী বললেন- আমারও আল্লাহর উপর ভরসা আছে। তবে আমি আবেগ ও তত্ত্বের চেয়ে বাস্তবকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। বাতিল হকের উপর একাধিকবার জয়লাভ করেছে। তখন সত্যের অনুসারীরা আল্লাহ ভরসা বলে হাত গুটিয়ে বসেছিলো। সত্য খুন ও কুরবানীর দাবি করে। আমরা যদি সেই কুরবানী দিতে প্রস্তুত থাকি, তাহলেই সত্যের জয় হবে। বাতিলের মধ্যে যে শক্তি আছে, আমাদেরকে তার মোকাবেলা ময়দানে করতে হবে। আমাদেরকে বাস্তবতার উপর চোখ রাখতে হবে। নিজের পূর্ণ যোগ্যতা ও সর্বশক্তি কাজে লাগাতে হবে। তারপর ফলাফল আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে। আমাদের আত্ম প্রবঞ্চনায় লিপ্ত হওয়া চলবে না।
সুলতান আইউবী ঘোড়র পিঠ থেকে অবতরণ করেন। সালার শামসুদ্দীনের দুউপদেষ্টা এবং রক্ষীসেনারাও ঘোড়া থেকে নেমে যান। সুলতান আইউবী শামসুদ্দীন এবং উপদেষ্টাদ্বয়কে একটি উঁচু টিলার উপর নিয়ে যান। তাদের সম্মুখে পর্বতবেষ্টিত বিশাল এক মাঠ, যেটি শিং-এর ন্যায় টিলাগুলো অতিক্রম করে বিস্তৃত হয়ে সামনের দিকে চলে গেছে। সুলতান আইউবী যে দিকটায় দাঁড়িয়ে আছেন, সেদিকে দুটি টিলা একটির পেছনে অপরটি দণ্ডায়মান। সেই টিলা দুটোর মধ্যদিয়ে একটি গলি ময়দানের দিকে এগিয়ে গেছে। মাঠে পর্বতগুলোর কোল ঘেঁষে ছোট-বড় শত শত তবু দাঁড়িয়ে আছে। একধারে তাঁবুতে অবস্থানরত সৈনিকদের ঘোড়াগুলো ধী। সৈন্যরা এদিক-সেদিক ঘুরাফেরা করছে। কিছু সৈন্যকে রোদের মধ্যে হয়ে এবং ঘুমিয়ে থাকতেও দেখা গেলো। তাদের ভাব-গতি দেখে মনে হলো, বিশাল এক শত্রুবাহিনী আক্রমণ করার জন্য তাদের মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে, তা তারা জানেই না। তারা যদি যুদ্ধ করার জন্য প্রভুক্ত থাকতো, তাহলে তাদের তাঁবুগুলো পঁড়িয়ে থাকতো না এবং তাদের ঘোড়াগুলোর পিঠে জিন কষা থাকতো।
