আল্লাহ যা ইচ্ছা করবেন, তা বাস্তবায়িত হবেই- এক সালার বললেন এটা দুর্গ নয় যে, অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে আমরা লড়াই করতে পারবো না। এই পার্বত্য এলাকায় আমরা ঘুরেফিরে লড়াই করবো।
এ রাতেও সুলতান আইউবী ভালোভাবে ঘুমাতে পারেননি। তাঁর তাঁবুতে সারারাত প্রদীপ জ্বালানো থাকে। তিনি যুদ্ধক্ষেত্র এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার যে নকশা প্রস্তুত করে রেখেছিলেন, সেটি নিরীক্ষণ করতে থাকেন এবং তার উপর দাগ দিতে থাকেন। সেই সময়ে কোন বেসামরিক লোক দেখলে সে নির্ঘাত মনে করতো, সুলতান শতরঞ্জ খেলার অনুশীলন করছেন।
সাহরীর সময় যখন নাকাড়া বেজে উঠে এবং সৈনিকরা সজাগ হয়ে যায়, তখন সুলতান আইউবীরও চোখ খুলে যায়। জাগ্রত হয়েই সুলতান একসঙ্গে দুটি সংবাদ পান। এক. রিজার্ভ বাহিনী পৌঁছে গেছে। দুই. শক্র বাহিনী আট থেকে দশ মাইল দূরত্বের মধ্যে এসে পড়েছে এবং সম্ভবত আগামীকালের মধ্যে আমাদের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। সংবাদদাতা কোন এক তত্ত্বাবধায়ক গ্রুপের কমান্ডার। তিনি জানান, দুশমনের অগ্রযাত্রা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এক অংশ সম্মুখে, অপর অংশ পেছনে, তৃতীয় অংশ তারও পেছনে।
সুলতান আইউবীর যেসব তথ্য নেয়া আবশ্যক ছিলো, নিয়ে নিয়েছেন। সংবাদদাতা কমান্ডারকে বিদায় করে দিয়ে তিনি দারোয়ানকে বললেন, তুমি এক্ষুণি গেরিলা ও রিজার্ভ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কমান্ডারদের ডেকে আনন। তাদেরকে বলো, তারা যেনো সাহরী আমার সঙ্গে খায়। সুলতান চট জলদি ওজু করে নেন। রিজার্ভ বাহিনী এসে পৌঁছায় কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বল নামায আদায় করেন এবং আল্লাহর সমীপে বিজয়ের জন্য দুআ করেন।
অল্পক্ষণের মধ্যেই গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার এসে উপস্থিত হন এবং পরক্ষণই রিজার্ভ বাহিনীরও চারজন কমান্ডার এসে হাজির হন। সাহরীর খাবারও এসে পড়ে। রিজার্ভ সৈন্য সুলতান আইউবীর আশার তুলনায় কম। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে এ-ই যথেষ্ট। আল-আদেল যে পরিমাণ অস্ত্র প্রেরণ করেছেন, তাতে সুলতান আইউবী নিশ্চিন্ত। অস্ত্রগুলোর মধ্যে ছোট-বড় মিনজানিক বেশী। দাহ্য পদার্থও প্রচুর। সেনা সংখ্যার দিক থেকে সাহায্যটা সামান্য হলেও বাহিনীটা যেহেতু অভিজ্ঞ, তাই হতাশার কিছু নেই। তবে সমস্যা হলো, এই ফৌজ আর অশ্বপাল পাহাড়ী যুদ্ধে অভিজ্ঞ নয়।
ইতিমধ্যে ইন্টেলিজেন্স প্রধান হাসান ইবনে আবদুল্লাহও এসে পড়েন। তিনি জানান, হাব থেকে আমার এক গোয়েন্দা সংবাদ নিয়ে এসেছে যে, খৃস্টানরা এই যৌথ বাহিনীকে বিপুল পরিমাণ তীর-ধনুক, মটকা ভর্তি দাহ্য পদার্থ এবং পাঁচশত ঘোড়া প্রেরণ করেছে। গোয়েন্দা আরো জানায়, সে তাদের রওনা হওয়ার পর এসেছে। এই কাফেলাটি বাহিনীর সঙ্গে মিশে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের সঙ্গে মিনজানিকও রয়েছে। তাতে বুঝা যাচ্ছে যে, দুশমন মিনজানীকের সাহায্যে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করবে এবং সলিতাওয়ালা তীর ছুঁড়বে।
সুলতান আইউবী গেরিলা বাহিনীর প্রধানকে বললেন, তোমাকে সবকিছুই অবগত করা হয়েছে। তোমার দায়িত্ব কী, তা তোমার জানা। এবার পরিকল্পনায় এটাও যোগ করে নাও যে, দুশমন আক্রমণ না করা পর্যন্ত কোথাও তাদের উপর গেরিলা হামলা করা হবে না। প্রাপ্ত সংবাদ মোতাবেক শক্র বাহিনী সোজা হামাত-এর দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের উপর গেরিলা। ক্রিমণ চালানো হলে তাদের অগ্রযাত্রার গতি শ্লথ হয়ে যাবে। আর তোমার তো জানা আছে, তাদের আক্রমণের পর আমি জবাবী আক্রমণ করবো না। দুশমন আমার আক্রমণের আশংকা করে থাকবে, যা আমি সম্মুখ থেকে নয়, পেছন দিক থেকে পরিচালনা করবো। তোমার কাজ তখন থেকে শুরু হবে, নি পেছনের আক্রমণে ভীত হয়ে দুশমন এদিক-ওদিক পালাবার চেষ্টা শুরু করবে। এই পার্বত্য এলাকা থেকে একজন শত্রুসেনাও যেনো বেরিয়ে যেতে না পারে। যতো সম্ভব বেশী বেশী শক্র বন্দী করো। তারা মুসলমান সৈনিক। সমাদের হাতে বন্দী হলে পরে তাদের সত্য-মিথ্যার বুঝ এসে যাবে। লক্ষ্যও এই। তবে আমাদের মোকাবেলায় এসে আমাদের তীর-তরবারীর আঘাতে যারা মৃত্যুবরণ করে, আমি তাদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারি না।
আমাদের নিকট তথ্য আছে, দুশমন মটকায় ভরে দাহ্য পদার্থ নিয়ে আসছে। এগুলে আমাদের হস্তগত হলে ভালো হতো। কিন্তু তা সম্ভব হবে না বলেই ধরে নেয়া যায়। তার চেয়ে বরং তুমি একটা কাজ করো, তোমার কোনো একটি ইউনিটের দশ-বারজন গেরিলাকে দায়িত্ব দাও, তারা আক্রমণের সময় অতর্কিত গেরিলা হামলা চালিয়ে মটকাগুলো ভেঙ্গে ফেলুক এবং দাহ্য পদার্থগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিক। দিনের বেলা দেখে নিতে হবে, মটকা বহনকারী কাফেলার অবস্থান কোথায়। সবচেয়ে জরুরী কথা হলো, দুশমন এখনো নদী পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তোমরা ঘোড়াগুলোকে পানি পান করাও এবং মশকে পানি ভরে নাও। মওসুম ঠাণ্ডা। এটা মরুভূমি নয়। পিপাসায় কেউ মরবে না। তারপরও এটা যুদ্ধ। পিপাসা তোমাদেরকে অস্থির তো করবেই।
গেরিলা বাহিনীর কমান্ডারকে বিদায় দিয়ে সুলতান আইউবী রিজার্ভ বাহিনীর কমান্ডারদের বললেন
একটা বিষয় তোমরা সবসময় মাথায় রাখবে যে, এটা মিশরের মরু এলাকা নয়। এটা পাহাড়ী এলাকা এবং শীতল। খরতাপের মধ্যে ছুটাছুটি করলে শীত দূর হয়ে যাবে। এখানে আঘাত করো আর একদিকে পালিয়ে যাও- এর সুযোগ অবশ্যই পাবে। তোমাদেরকে এর প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। কিন্তু তোমাদের স্মরণ রাখতে হবে, এখানকার মাটি তোমাদের জন্য বিস্তৃত নয়। ভোলা ময়দানে তো কয়েক ক্রোশ পথ ঘুরে আবার দুশমনের উপর চড়াও হতে পারো এবং যুদ্ধের কৌশল প্রয়োগ করার জন্য অসীম ভূমি খুঁজে পাও। কিন্তু এখানে আমি দুশমনকে যে স্থানটিতে টেনে আনার বন্দোবস্ত করেছি, সেটি ময়দান বটে, তবে সীমিত। তোমাদেরকে টিলা-পর্বতের সঙ্গে পরিচিত করানোর মতো সময় হাতে নেই। তাই জ্ঞান খরচ করে কাজ করতে হবে। তীরন্দাজদেরকে পর্বতের উপর রাখবে। ঘোড়া:নিয়ে পাথুরে এলাকায় ঢুকবে না। তবে ঘোড়া অল্পতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। আমাদের ঘোড়াগুলো তো কিছুটা হলেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
