আপনি এখানে বসে কী ভাবছেন? সালার শামসুদ্দীন নিজের কাহিনী শুনানোর আগেই যুদ্ধ বিষয়ে আলোচনা শুরু করে দেন।
আমি রিজার্ভ বাহিনীর এসে পৌঁছার অপেক্ষা করছি- সুলতান আইউবী বললেন- গত রাতে সংবাদ পেয়েছি, বাহিনী আজ রাতে পৌঁছে যাবে। তারা কায়রো থেকে আসবে। সে কারণেই এতোদিন লেগে গেছে।
সুলতান আইউবী তার সেনাসংখ্যা কত এবং তাদেরকে কিভাবে বিন্যস্ত করে রেখেছেন দুভাইকে তার বিবরণ দেন।
সুলতান তখনই তার সকল ইউনিটের কমান্ডারদের ডেকে পাঠান এবং শামসুদ্দীন ও শাদবখত-এর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ করিয়ে দেন। পুরাতন অফিসারগণ তাদেরকে চেনেন।
সুলতান আইউবী বললেন—
যে শত্রুবাহিনী আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসছে, তাদের সামরিক অভিজ্ঞতা কিরূপ এবং উৎসাহ-উদ্দীপনা কেমন আমার কমান্ডারদের তার বিবরণ দিন। তারা বললেন
সৈন্য সর্বাবস্থায় সৈন্যই হয়ে থাকে। দুশমনকে আনাড়ি ও দুর্বল মনে করা একটি সামরিক পদস্খলন হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, ওরা মুসলিম ফৌজ, যার সেনারা শত্রুকে পিঠ দেখাতে অভ্যস্ত নয়। সৈন্যদের মাঝে একটি সামরিক আত্মা বিরাজ করে থাকে। তারা পূর্ণ উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে লড়াই করবে। তাদের মস্তিষ্কে এই বুঝ দেয়া হয়েছে, আপনারা হিংস্র, জংলী ও নারীলোলুপ এবং সুলতান আইউবী এসেছেন তার সাম্রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধি করার জন্য। খৃস্টানরা তাদের অন্তরে আপনার বিরুদ্ধে ঘৃণা ভরে রেখেছে। তবে তাদের নেতৃত্ব প্রশংসাযোগ্য নয়। তাঁদের একজনও সুলতান আইউবী নয়। সাইফুদ্দীন ও গোমস্তগীন যার যার ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য যুদ্ধ করতে আসছেন। তার আপন আপন হেরেম ও মদের পিপ-পেয়ালা সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। আমাদের স্থলে গোমস্তগীন স্বয়ং তার বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন। তবে এই নেতৃত্ব বাহিনীকে সুশৃঙ্খলভাবে লড়াতে পারবে না। কিন্তু তারপরও আপনাকে সাবধানতার সঙ্গে লড়াই করতে হবে। তারা আপনাকে পর্বতমালার অভ্যন্তরে অবরুদ্ধ করে ফেলতে চাচ্ছে। বাহিনীত্রয়ের কমান্ড থাকবে যৌথ; কিন্তু মনের দিক থেকে তারা ঐক্যবদ্ধ নয়।
সুলতান আইউবী সালার শামসুদ্দীন, শাদবখত ও অন্যান্য সালার কমান্ডারদের সঙ্গে কথা বলছেন। এমন সময় খতীব ইবনুল মাখদূম, সায়েকা, কারা কর্মকর্তা ও এক গুপ্তচর এসে উপস্থিত। তারা পথ ভুলে গিয়েছিলেন, তাই বিলম্ব হয়ে গেছে। সুলতান আইউবীর জানা আছে, খতীব তার সমর্থক এবং মসুলে তার গোয়েন্দাদের নেতৃত্ব প্রদান ও তত্ত্বাবধান করতেন। সুলতান তাকেও বৈঠকে যুক্ত করে নেন এবং বললেন, আপনি মসুলের ফৌজ সম্পর্কে কিছু বলুন।
সেই নেতা কিভাবে যুদ্ধ করবে, যিনি মদ-নারীতে আসক্ত এবং কুরআন থেকে ফাল বের করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন?- খতীব বললেন- যার বক্ষে ঈমান নেই, সে যুদ্ধের ময়দানে বেশী সময় টিকতে পারে না। তিনি আমাকে বলেছিলেন, কুরআন থেকে ফাল বের করে বলুন, আইউবীবিরোধী যুদ্ধে আমি জিতলো না হারবো। আমি তাকে বললাম, যেহেতু তার এই পদক্ষেপ কুরআনী বিধানের পরিপন্থী, তাই এই যুদ্ধে তার পরাজয় হবে। তিনি আমাকে কারাগারে বন্দী করলেন। তিনি কুরআনকে জাদুর বই মনে করে থাকেন। আমি আপনাকে কুরআনের কারামতের কথা শোনাতে চাই। কুরআনের বদৌলতেই আমার পালিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। সাইফুদ্দীন আমার কন্যাকে অপহরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মেয়েটা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। আমি আপনাকে সুসংবাদ শোনাতে চাই যে, আপনি যদি কুরআনের অনুসারী হয়ে থাকেন এবং যুদ্ধটা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে করে থাকেন, তাহলে জয় আপনারই হবে। এই হলো যুদ্ধের ধর্মীয় দিক। আর কৌশলগত দিক সম্পর্কে আমি আপনাকে পরামর্শ দেবো, আপনি গেরিলা বাহিনীকে অধিকতর ব্যবহার করুন। এই মুসলমান ভাইদের বিরুদ্ধে এ পদ্ধতিটা বেশী প্রয়োগ করুন। রাতেও যেন তারা শান্তিতে থাকতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করুন।
যে জেল কর্মকর্তা খতীবকে পলায়নে সাহায্য করেছিলেন, তিনিও সঙ্গে আছেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে বাহিনীতে যুক্ত করে নেয়া হয়েছে। খতীবকে তার কন্যাসহ দামেস্কে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সালার শামসুদ্দীন ও শাদবখতকে নিজের সঙ্গে রাখেন সুলতান আইউবী।
***
হালব, হাররান ও মসুলের বাহিনী এগিয়ে আসছে। এদিকে মিশর থেকে সুলতান আইউবীর জন্য যে রিজার্ভ বাহিনী রওনা হয়েছিলো, তারাও নিকটে চলে এসেছে। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, সুলতান আইউবী পর্যন্ত দুমশনের ফৌজ আগে পৌঁছে, নাকি তাঁর রিজার্ভ বাহিনী। সুলতানের মনে অস্থিরতা। অবরোধকে ভয় পাচ্ছেন তিনি। রিজার্ভ বাহিনীর সাহায্য ব্যতীত অবরোধ ভাঙ্গাও সহজ নয়। যদি তিনি অবরোধের মধ্যে পড়েই যান, তাহলে এই সামান্য সৈন্য দ্বারা কিভাবে তিনি অবরোধ ভাঙ্গবেন? তার সবটুকু মেধা তিনি। এ সমস্যার সমাধানে ব্যয় করে ফেলেন। তিনি এতোই অস্থির হয়ে পড়েন যে, ঊর্ধ্বতন কমান্ডারদের নিকট পর্যন্ত তাঁর এই উদ্বেগের কথা ব্যক্ত করে ফেলেন। তিনি বললেন
কমান্ডো ইউনিটগুলোকে পরিপূর্ণরূপে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ও দৃষ্টিতে রাখবে। রিজার্ভ বাহিনীর এখনো কোনো পাত্তা নেই। অবরোধের আশংকা আছে। অবরোধ কেবল গেরিলারাই ভাঙ্গতে পারবে।
