সান্ত্রী সেখান থেকেই চিৎকার শুরু করে দেয়- সাবধান! সাবধান! আসামী পালিয়ে গেছে। সে দৌড়ে উপরে উঠে আসে। তার ডাক-চিৎকারের সূত্রে নাকাড়া বাজতে শুরু করে। ততক্ষণে পলায়নরত দলটি প্রধান ফটকে পৌঁছে গেছে। সান্ত্রীরা ছুটে বেড়াচ্ছে। প্রধান ফটকের চাবিগুলো কমান্ডারের নিকট। তারা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় এবং ভেতরের তালায় চাবি ঢুকায়। সান্ত্রী দূর থেকে চিৎকার করে বলল- ওদেরকে ধরে ফেল? ওরা আমাদের জেলারকে খুন করে পালাচ্ছে।
নাকাড়ার আওয়াজে কয়েদখানার সকল সান্ত্রী যার যার ডিউটিতে পৌঁছে গেছে। বাইরের রক্ষীরাও ছুটে এসেছে। ফটক খুলে গেছে। যে নাকাড়া বাজানো হয়েছে, তা হচ্ছে বিপদ সংকেত। তাই বাইরে থেকে ছুটে আসা রক্ষীসেনারা তাদের প্রশিক্ষণ মোতাবেক দ্রুততার সাথে ফটকে ঢুকে পড়ে। তাদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় বিপদ এই হতে পারে যে, হয়ত কয়েদীরা বিদ্রোহ করে বসেছে কিংবা কারাগারের কোথাও আগুন লেগে গেছে। যে সান্ত্ৰী ডাক চিৎকার করে ফিরছিল, সে বাইরে থেকে আগত সান্ত্রীদের ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। এই হুলস্থূল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে পলায়নপর লোকগুলো ফটক অতিক্রম করে বেরিয়ে যায়। বাইরে ঘোড়া দণ্ডায়মান। তারা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে।
ঘোড়া ছুটতে শুরু করলে একজন পেছন দিকে থেকে চিৎকার দেয়- থাম, অন্যথায় মারা যাবে। তারা ক্ষিপ্রগতিতে ঘোড়া হাঁকায়। পেছন থেকে একসঙ্গে এক ঝাঁক তীর ধেয়ে আসে। দুটি তীর কমান্ডারের পিঠে গেঁথে যায় এবং একটি এক সালারের ঘোড়ার পেছন অংশে আঘাত হানে। কমান্ডার দেহে দুটি তীর নিয়েও আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। সালার শামসুদ্দীনের ঘোড়া তীর খেয়ে লাফিয়ে ওঠে। শামসুদ্দীন ঘোড়াটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন এবং তাকে কমান্ডারের ঘোড়ার পাশে নিয়ে গিয়ে লাফ দিয়ে তার ঘোড়ায় চড়ে বসেন। কমান্ডারের হাত শিথিল হয়ে আসে। শামসুদ্দীন তার হাত থেকে ঘোড়ার লাগামটা নিয়ে নেন। পেছন থেকে আরো তীর আসে। কিন্তু ঘোড়ার গতি দ্রুত থাকায় নিশানা ব্যর্থ হয়।
তারা পেছন দিকে তাকায়। সাইফুদ্দীনের কয়েদখানা এখন তাদের থেকে অনেক দূরে। কিন্তু দশ-বারজন অশ্বারোহী তাদেরকে ধাওয়া করছে। সামনে উন্মুক্ত মাঠ। পলায়নকারীরা তীব্রগতিতে ঘোড়া হাঁকিয়ে চলছে। তাদের অস্ত্রের অভাব। উভয় সালার নিরস্ত্র। কমান্ডার ধীরে ধীরে নিথর হয়ে আসছে। মোকাবেলা করার মত শক্তি তার নেই। সামনে টিলা ও পার্বত্য এলাকা। এক সালার বললেন- তোমরা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাও। একাকী হয়ে যাও।
ধাওয়াকারীরা এখনো অনেক দূরে। তারা দেখল, পলায়নকারীরা পরস্পর আলাদা হয়ে পাহাড়ের অভ্যন্তরে হারিয়ে গেছে। তাদের গতি শ্লথ হয়ে যায়। পলায়নকারীরা তাদের কবল থেকে রক্ষা পেয়ে যায়।
৫.১ পাপের প্রায়শ্চিত্ত
হালবের বাইরে অনুষ্ঠিত তিন মুসলিম আমীরের বৈঠক সমাপ্ত হয়েছে। তারা সুলতান আইউবীর উপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলেছেন। খৃস্টান উপদেষ্টাদের পরামর্শ বেশী গ্রহণ করা হয়েছে। বাহিনীত্রয়ের বিন্যাস কিরূপ হবে, তারা তা-ও ঠিক করে নিয়েছে। গোমস্তগীনের বাহিনী অগ্রে থাকবে। তার উভয় পার্শ্বের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব হালবের বাহিনীর। প্রথম হামলার পর দ্বিতীয় হামলার দায়িত্ব- যা সুলতান আইউবীর জবাবী হামলাকে প্রতিহত করার জন্য পরিচালিত হবে সাইফুদ্দীনের উপর ন্যাস্ত করা হয়েছে। সাইফুদ্দীন তার বাহিনীর একটি অংশকে তার ভাই ইজুদ্দীনের কমান্ডে রেখে এসেছেন। এটি সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে তার প্রতারণা। সম্মিলিত বাহিনীকে তিনি বুঝ দিয়েছেন যে, আমি তাদেরকে রিজার্ভ রেখে এসেছি এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে তাদেরকে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু তিনি ভাইকে বলে গেছেন, তুমি হাররানের বাহিনীর অবস্থা বুঝে সম্মুখে অগ্রসর হবে। যুদ্ধের পরিস্থিতি যদি আমাদের প্রতিকূল হয়ে যায়, তাহলে রিজার্ভ বাহিনীকে মসুলের প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করা হবে। আর যদি জবাবী আক্রমণে অংশগ্রহণ করতেই হয়, তাহলে এই অংশগ্রহণ এমনভাবে করতে হবে যে, আমরা মসুল ও নিজেদের স্বার্থের প্রতি বেশী লক্ষ্য রাখবো।
রমযান মাস শুরু হয়ে গেছে। তিন বাহিনীর মাঝে থোষণা করে দেয়া হয়েছে, যুদ্ধের সময় রোযা রাখা ফরজ নয়। তিন-চারদিন পর বাহিনীগুলো আপন আপন শহর ত্যাগ করে রওনা হয়ে যায়। কথা আছে, তারা হামাতের নিকট এসে একত্রিত হবে এবং আক্রমণের বিন্যাসে প্রস্তুত হয়ে যাবে।
এই তিন বাহিনীর রওনা হওয়ার দুদিন আগের ঘটনা। সুলতান আইউবী তার মোর্চা পর্যবেক্ষণ করছেন। ইত্যবসরে তিনি সংবাদ পান, হাররান থেকে দুজন সালার পালিয়ে চলে এসেছেন এবং তাদের সঙ্গে একটি লাশ আছে।
সুলতান আইউবী ঘোড়া হাঁকান। গন্তব্যে গিয়ে ঘোড়া থেকে লাফিয়ে অবরতণ করেন এবং সালারদ্বয়কে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তারপর সিপাহীদ্বয়ের সঙ্গেও আলিঙ্গনাবদ্ধ হন। এরা দুজন তার নামকরা গেরিলা গোয়েন্দা ছিলো। কমান্ডারও তার গুপ্তচর ছিলো, যিনি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত গোমস্তগীনের সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। সুলতান আইউব লাশটির গালে চুমো খান এবং লাশটি দামেস্ক পৌঁছে দেয়ার এবং শহীদদের কবরস্তানে দাফন করার নির্দেশ প্রদান করেন।
