গোমস্তগীনের রওনা হয়ে যাওয়ার একদিন পর জেলার দেখতে পান যে, তিনজন অশ্বারোহী কারাগারের দিকে ছুটে আসছে। ঘোড়াগুলো আরো নিকটে আসার পর দেখা গেল, তাদের সঙ্গে আরো দুটি শূন্য ঘোড়া রয়েছে। ঘোড়াগুলো কয়েদখানার গেটে এসে দাঁড়িয়ে যায়। এক আরোহী হাররানের সামরিক পতাকা উঁচিয়ে রেখেছে। এই পতাকাটা যুদ্ধের ময়দানে প্রধান সেনাপতির হাতে থাকে। অশ্বারোহীদের মধ্যে একজন কমান্ডার। অপর দুজন সাধারণ সৈনিক। সম্ভবত তারা রক্ষীবাহিনীর সদস্য। জেলার প্রধান ফটকের ফাঁক দিয়ে বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি কমান্ডারকে চিনেন। ফটক খুলে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন। কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করেন কেন এসেছ?
রাজা-বাদশাদের আদেশ-নিষেধের কোন তাল থাকে না- কমান্ডার বলল আমাদের শাসনকর্তা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় এমন দুজন সালারকে জেলে পুরে রেখেছেন, যাদের ছাড়া ফৌজ এক পা-ও চলতে পারে না। এখন আবার আদেশ করলেন, তাদেরকে জেল থেকে বের করে আন।
তার মানে আপনারা সালার শামসুদ্দীন ও শাদবখকে নিতে এসেছেন? জেলার জিজ্ঞেস করেন।
হা- কমান্ডার বলল- তাদেরকে জলদি নিয়ে যেতে হবে।
দুর্গপতি গোমস্তগীনের লিখিত কোন নির্দেশনামা নিয়ে এসেছেন?- জেলার জিজ্ঞেস করেন। তিনি তো বাইরে কোথায় যেন চলে গেছেন?
আমি তার নিকট থেকেই এসেছি- কমান্ডার বলল- আমি রাতেই এসে পড়েছি। তখন তার এতটুকু হুঁশ ছিল না যে, নির্দেশনামা লিখে দেবেন। আমাদের ফৌজ হাল্ব ও মসুলের ফৌজের সঙ্গে মিলে সুলতান আইউবীর উপর আক্রমণ করতে যাচ্ছে। সময় নষ্ট করলে আইউবীই উল্টো আমাদের উপর হামলা করে বসবেন। বিপদ বেড়ে গেছে। গোমস্তগীন এ ব্যাপারেই হাল্ব গেছেন। মাথার উপর বিপদ দেখার পর এখন তার হুশ ফিরে এসেছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন, এ দুসালার ব্যতীত তিনি লড়াই করতে পারবেন না। তাই আমাকে হাবের রাস্তা থেকেই পাঠিয়ে দিয়েছেন। পতাকাটা দিয়ে বলেছেন, তাদেরকে এই পতাকা উড়িয়ে পূর্ণ মর্যাদার সাথে নিয়ে আস। আপনি জলদি করুন।
জেলার কমান্ডারকে ভেতরে নিয়ে যান। সৈনিকদ্বয়ও তাদের সঙ্গে চলে যায়। তারা পাতাল কক্ষে ঢুকে পড়ে। শামসুদ্দীন ও শাদবখত আলাদা আলাদা দুটি কক্ষে আবদ্ধ। প্রথমে একজনকে বের করে আনা হল। কমান্ডার তাকে সামরিক কায়দায় সালাম করে বলল- হাররানের আমীর গোমস্তগীন আপনার মুক্তির নির্দেশ পাঠিয়েছেন। আপনার ঘোড়া ও ব্যক্তিগত দেহরক্ষী আমাদের সঙ্গে আছে। আপনার জন্য নির্দেশ হল, প্রস্তুতি নিয়ে এক্ষুণি হাল্ব পৌঁছে যাবেন।
মনে হয়, মদের নেশা কেটে গেছে। সালার বললেন।
আমি এমন কেউ নই যে, আপনার অভিমত সমর্থন কিংবা প্রত্যাখ্যান করতে পারি- কমান্ডার বলল- আমার কাজ নির্দেশ পৌঁছানো আর আপনার সঙ্গে যাওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
জেলার মনোযোগ সহকারে তাদের কথাবার্তা শ্রবণ করেন। তিনি নিশ্চিত হন যে, বিষয়টা সঠিক। কিন্তু অপর সালারকে বের করে আনতে গিয়েই জেলারের মনে সন্দেহ জাগে। এই সালার কমান্ডারকে দেখামাত্র আবেগজড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন- তোমরা এসে পড়েছ? সব ঠিক আছে তো? তিনি জেলারের উপস্থিতি অনুধাবন করে সে অনুপাতে কথা বলতে ব্যর্থ হন। জেলার আনাড়ী লোক নন। তার কর্মজীবনটা পুরোটাই কাটে কারাগারে। তিনি কক্ষের তালা খুলে দিয়েছিলেন। মনে সন্দেহ জাগ্রত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার তালাটা লাগিয়ে দেন এবং বললেন- লিখিত নির্দেশনামা ব্যতীত আমি এদেরকে মুক্তি দিতে পারব না।
কমান্ডার থাবা দিয়ে তার হাত থেকে চাবিটা ছিনিয়ে নেয়। সালারদের দেহরক্ষী হিসেবে আসা সৈনিকদ্বয় জেলারের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। তারা খঞ্জর বের করে খঞ্জরের আগা জেলারের পিঠের উপর ঠেকিয়ে রাখে। কমান্ডার তাকে কানে কানে বলল- এ মুহূর্তে তুমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কমান্ডোর কজায় আটক রয়েছ। তুমি তো জান, আইউবীর কমান্ডোরা কী করতে পারে। আর একটা শব্দও যেন মুখ থেকে বের না হয়।
কমান্ডার তালা খুলে কক্ষের দরজা খুলে ফেলে। জেলারকে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়, যাতে আশপাশ থেকে কেউ বুঝতে না পারে যে, এখানে কোন অপরাধ হচ্ছে। ভেতরে ঢুকিয়ে তাকে ছিদ্রওয়ালা দরজার নিকট থেকে সরিয়ে আড়ালে নিয়ে যায়। এক সৈনিক দ্রুত এক টুকরো রশি দ্বারা, যা বড়জোর পৌনে এক গজ লম্বা হবে- তার গলাটা পেঁচিয়ে ধরে রশিটাকে একটা মোড় দেয় এবং দু-তিনটি ঝটকা টান মারে। জেলারের চোখ দুটো কোটর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। লোকটি শীতল হয়ে যায়।
নিথর-নিস্তব্ধ জেলারকে পাথরের মেঝেতে ফেলে রাখা হল। লাশের উপর একখানা কম্বল ছড়িয়ে দেয়া হল। সালার আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে এই সমস্যাটা সৃষ্টি করে দিলেন।
শামসুদ্দীন ও শাদবখতকে নিয়ে বের হয়ে কমান্ডার দরজায় তালা লাগিয়ে দেয় এবং চাবিটা নিয়ে নেয়। বাইরের দরজাগুলোর চাবিও জেলারের নিকট ছিল। কমান্ডার সেগুলোও নিয়ে নেয়। এই দলটি সেখান থেকে রওনা হয়। তারা পাতাল কক্ষ থেকে উপরে উঠে আসলে পাতালের সান্ত্ৰী নীচে গিয়ে শূন্য প্রকোষ্ঠগুলো পর্যবেক্ষণ করে। সে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখছিল, জেলার দুজন কয়েদীকে মুক্তি দিচ্ছেন। কয়েদী দুসালারকে সে বেরিয়ে যেতেও দেখেছে। কিন্তু নীচে গিয়ে দেখতে পায়, এক প্রকোষ্টে কে একজন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। লোকটা কে, চিনতে পারল না সে। অপর কক্ষটি শূন্য। সে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা লোকটাকে ডাক দেয়। কিন্তু তার কোন সাড়া নেই। দরজা তালাবদ্ধ। সান্ত্রী দেয়ালের ছিদ্রপথে হাতের বর্শাটা ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। বর্শার আগা লোকটি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বর্শার আগা দ্বারা লোকটাকে খোঁচা মারে। তারপরও সে উঠল না। বর্শা দ্বারা গায়ের কম্বলটা সরিয়ে লোকটার মুখমণ্ডল উদাম করে। সহসা চমকে উঠে সান্ত্রী। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাটা দিয়ে উঠে তার। ইনি যে কারাগারের জেলার! চোখ ও মুখমণ্ডলে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, লোকটা মৃত।
