জেল কর্মকর্তা কি যেন একটা ইঙ্গিত করেন। নীচে লুকিয়ে থাকা লোকগুলো উপর দিকে একটি রশি ছুঁড়ে দেয়। রশির এক মাথা একটি লাঠির মধ্যখানে বাঁধা। লাঠিটা কাপড় পেঁচানো, যাতে দেয়ালের উপরে নিক্ষিপ্ত হয়ে শব্দ না করে। লাঠিটা উপরে গিয়ে আটকে যায়। একে তো অন্ধকার, তদুপরি কর্মকর্তা সান্ত্রীকে নিয়ে দূরে চলে গেছেন। চারজন লোক রশি বেয়ে উপরে উঠে যায়। তারা এই রশিটাই টেনে তুলে নিয়ে দেয়ালের অপরদিকে ছেড়ে দেয়। চারজন খঞ্জর বের করে নিজ নিজ মুখে চেপে ধরে রশি বেয়ে নীচে নেমে যায়। জেল কর্মকর্তা তাদেরকে ভেতরের মানচিত্র বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। ভেতরে কিছুটা আলো আছে। স্থানে স্থানে প্রদীপ জ্বলছে। জেল কক্ষের সারিতে মাথায় এক স্থানে একটুখানি বারান্দা। এই সান্ত্রী ওখানে পায়চারি করছে। চার ব্যক্তি লুকিয়ে যায়। সান্ত্রী তাদের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করলে একজন বলল, এদিকে একটু আসুন তো ভাই। সান্ত্রী দ্রুতগতিতে তাদের নিকট গিয়ে পৌঁছে। অমনি দুব্যক্তি তাকে ঝাঁপটে ধরে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে তার বুকে খঞ্জর মেরে কাজ সমাধা করে দেয়।
চার ব্যক্তি চুপি চুপি সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। একজন একটু বেশি এগিয়ে যায়। অপর তিনজন বিক্ষিপ্তভাবে চুপিসারে তাকে অনুসরণ করে এগুতে থাকে। সামনের লোকটি কয়েদখানার গোলাকার একটা জায়গায় পৌঁছে যায়। খতীবের প্রকোষ্ঠটা এখানেই। লোকটা খতীবের কুঠুরী পর্যন্ত পৌঁছে যায়। খতীব দরজার দিকে তাকান। তিনি কুরআনখানি বন্ধ করে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে আসেন। লোকটার হাতে বড় একটা চাবি। জেল কর্মকর্তা এক কর্মকার দিয়ে চাবিটা তৈরি করে দিয়েছেন। কয়েকখানার চাবি সম্পর্কে সে পুরোপুরি ওয়াকিফহাল। লোকটি চাবিটা তালায় ঢুকায়। তালা খুলে যায়। খতীব এখন কক্ষের বাইরে। তালাটা খুলে দিয়েই কমান্ডো ফেরত রওনা হয়ে যায়।
পিছন দিকে কতটুকু সরে আসার পর কমান্ডো কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। সেই সঙ্গে কণ্ঠস্বর- কে? দাঁড়াও। এদিক থেকে জবাব দেয়া হয়- কাছে আস দোস্ত! লোকটি কমান্ডোর নিকটে এগিয়ে আসামাত্র একটি খঞ্জর তার হৃদপিণ্ডে গেঁথে যায়। লোকটা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লে পেছন দিক থেকে আরেকটি খঞ্জর তাকে আঘাত হানে। লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কমান্ডো খতীবকে নিয়ে রশির নিকট চলে যায়।
সর্বপ্রথম এক কমান্ডো দেয়ালের উপরে ওঠে। তারপর উঠেন খতীব। জেল কর্মকর্তা সান্ত্রীকে এখনো দূরে কোথাও আলাপে মাতিয়ে রেখেছেন। খতীবসহ একে একে সব কমান্ডো দেয়ালের উপর উঠে যায়। তারপর রশিটা টেনে তুলে বাইরের দিকে ছেড়ে দেয় এবং সকলে নীচে নেমে আসে। জেল কর্মকর্তা কয়েদখানার বাইরের দিক থেকে শিয়ালের হুক্কা হুয়া ডাকের ন্যায় শব্দ শুনতে পায়। সে সান্ত্রীকে আরেক দিকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে সেই জায়গায় চলে আসে, যেখানে রশি ঝুলানো হয়েছিল। সে দ্রুত রশিটা সরিয়ে ফেলে।
সায়েকা ও বডিগার্ড যে গৃহে অবস্থান করছে, এরা সকলে সেখানে চলে যায়। পিতাকে দেখে সায়েকা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
যখন ভোর হল, তখন মসুল থেকে কয়েক মাইল দূরে চারটি ঘোড়া ছুটে চলছিল। একটির আরোহী খতীব। একটিতে সায়েকা। একটিতে সাইফুদ্দীনের কারা কর্মকর্তা এবং চতুর্থটিতে অপর এক ব্যক্তি। এ লোকটি সুলতান আইউবীর গুপ্তচর। যে দলটি সাইফুদ্দীনের বডিগার্ডকে ধরে এনেছিল, লোকটি তাদের একজন। এ লোকটিই বডিগার্ড থেকে কড় মূল্যবান তথ্য বের করেছিল। তারা যখন মসুল থেকে বহু দূরে চলে গিয়েছিল, ততক্ষণে বডিগার্ড সমাধিস্থ হয়ে গেছে। রাতে এ দলটি মসুল ত্যাগ করার সময় বডিগার্ডকে খুন করে গিয়েছিল।
সাইফুদ্দীনের কয়েদখানার অবস্থা শোচনীয়। ভেতরে দুজন সান্ত্রীর লাশ পড়ে আছে। খতীব উধাও। কর্মকর্তার পাত্তা নেই। বডিগার্ড খতীব কন্যা সায়েকাকে নিয়ে যথাসময়ে না পৌঁছায় সাইফুদ্দীন ধরে নিয়েছিলেন, বডিগার্ড গাদ্দারী করেছে। তার ধারণা, মেয়েটার রূপ-সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে লোকটার মাথা বিগড়ে গেছে। তাই সে মেয়েটাকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। কিন্তু তার কল্পনায়ও আসেনি যে, তার দেহরক্ষী সায়েকাসহ আইউবীর কমান্ডোদের হাতে ধরা পড়েছে।
***
সালার শামসুদ্দীন ও শাদবখত গোমস্তগীনের কারাগারে বন্দী। সুলতান আইউবী নির্দেশ প্রদান করেছেন, তাদেরকে ওখান থেকে বের করে আনার ব্যবস্থা কর। কিন্তু তারা হাররানে যেসব লোক তৈরি করে রেখেছেন, তারা সে ব্যবস্থা আগেই করেছে। এই দুই সালার সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে এক একজন ও দু-দুজন করে নিজেদের লোক ঢুকিয়ে রেখেছেন। তবে তাদের পলায়নে বড় সমস্যা হল, তারা যেখানে বন্দী রয়েছেন, সেটা কয়েদখানার পাতাল কক্ষ। সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য বিশেষ কোন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করেছেন। সালার শামসুদ্দীন ও শাদবখতের মুক্তির পথ বেরিয়ে এসেছে। হাব থেকে গোমস্তগীনের তলব এসেছে। তিনি তার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, উপদেষ্টা ও রক্ষীদের নিয়ে হাবের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছেন। শামসুদ্দীন ও শাদবখতের বন্দী হওয়ার সংবাদ গোমস্তগীনের একান্ত ঘনিষ্ঠ লোকজন ব্যতীত কেউ জানত না। কাজী ইবনুল খাশিবের হত্যাকাণ্ডের খবরও গোপন রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনী পর্যন্ত এখনো জানে না, তাদের ঊর্ধ্বতন দুজন সালারকে কয়েকখানায় নিক্ষেপ করা হয়েছে।
