আল্লাহ যদি তাদেরকে (শত্রুপক্ষকে) বিজয় দান করতে ইচ্ছা করতেন, তাহলে তারা তখনই সুলতান আইউবীর উপর হামলা করে বসত। কিন্তু আল্লাহ যাকে লাঞ্ছিত করতে চান, সে লাঞ্ছিতই থাকে। তারা সুলতান আইউবীকে এতটুকু সময় ও সুযোগ দিয়ে দেয় যে, মিশর থেকে নতুন ফোর্স এসে পৌঁছে যায়। সুলতান তাদেরকে তার বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করে নতুন বিন্যাস তৈরি করে নেন। তিনি হামলার আগে সবকটি ঘোড়াকে পানি পান করিয়ে নেন এবং প্রচুর পানি রিজার্ভ করে রাখেন।
সুলতান আইউবীর ব্যাকুলতার অবস্থা এই ছিল যে, তিনি রাতে ঘুমাতেন না। তিনি যেখানে যেখানে সেনা স্থাপন করেছেন, সব কটি পয়েন্টে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন, ভাবতেন এবং এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারা দুশমনের হামলা প্রতিহত করার পরিকল্পনাটা ঝালাই করে নিতেন। হামাত শিংয়ে যে স্থানে একটি পাহাড় শিং-এর ন্যায় দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে, তিনি সেটিকে দুশমনের জন্য ফাঁদ হিসেবে প্রস্তুত করে রাখেন। কিন্তু সমস্যা ছিল এই যে, এত স্বল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারা তিনি কেবল প্রতিরোধ যুদ্ধই লড়তে পারতেন। যুদ্ধের পটভূমি পাল্টে দেয়ার জন্য যে জবাবী আক্রমণের প্রয়োজন, তার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল না। তার গোয়েন্দারা তাকে তথ্য প্রদান করেছিল যে, খৃস্টানরা মুসলিম আমীরদেরকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে এমনভাবে লড়াবার চেষ্টা করবে, যাতে যুদ্ধ প্রলম্বিত হয়, যেন সুলতান আইউবী পাহাড়ী এলাকা থেকে বের হতে না পারেন এবং অবরুদ্ধ থেকে প্রতিরোধ লড়াই করতে করতে শেষ হয়ে যান।
কিন্তু সুলতান আইউবীর গোয়েন্দারা তাকে এ তথ্য জানাতে পারেনি যে, নয় সদস্যের একটি ঘাতক দল তাকে হত্যা করতে আসছে। অপরদিকে সুলতানের দৃষ্টিও নিজের জীবনের প্রতি নয়, রণাঙ্গনের উপর নিবদ্ধ। তিনি পর্যবেক্ষণের জন্য দূর-দূরান্ত পর্যন্ত সৈন্য ছড়িয়ে রেখেছেন।
এর পরদিনই হাররান থেকে সুলতান আইউবীর এক দূত এসে পৌঁছে। সে সংবাদ নিয়ে আসে, সালার শামসুদ্দীন ও শাদবখত কারাগারে আটক রয়েছেন। তারা কাজী ইবনুল খাশিবকে খুন করেছেন। গোয়েন্দা এই হত্যাকাণ্ডের কারণ জানতে পারেনি। সংবাদটা শোনামাত্র সুলতান আইউবীর চেহারার রং বদলে যায়। এই দুসহোদরের সঙ্গে তিনি অনেক আশা-ভরসা যুক্ত করে রেখেছিলেন। তাদের জানা ছিল, গোমস্তগীনের ফৌজের কমান্ড এই দুভাইয়ের হাতে থাকবে এবং তাদের বাহিনী লড়াই না করে স্বেচ্ছায় তার হাতে আত্মসমর্পণ করবে। গোয়েন্দা এ তথ্যও প্রদান করে যে, এখন গোমস্তগীন নিজে ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে ফৌজের কমান্ড করবেন। গোয়েন্দা আরো জানায়, গোমস্তগীন তার বাহিনীকে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করে লড়াই করবেন।
হাসান ইবনে আবদুল্লাহ!- সুলতান আইউবী বললেন- শামসুদ্দিন ও শাদবখতকে যেন বেশিদিন গোমস্তগীনের কারাগারে থাকতে না হয়। এর নিকট থেকে জেনে নাও, হাররানে আমাদের কতজন লোক আছে এবং তারা তাদেরকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে আনতে পারবে কিনা। আমার আশংকা হচ্ছে, গোমস্তগীন তাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। এরা যে আমার গোয়েন্দা, গোমস্তগীন তা জেনে ফেলেছে। আমি হাররান গিয়ে অবরোধ করে দুর্গ জয় করে তাদেরকে মুক্ত করব, এতটুকু সময় অপেক্ষা করতে পারব না। গোমস্তগীন কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই তুমি তাদেরকে কয়েকখানা থেকে মুক্ত করে আন। আমি আমার এই দুই সালারের জন্য দুইশ কমান্ডোর জীবন খোয়াতেও প্রস্তুত আছি। হাররানে পর্যাপ্ত লোক না থাকলে এখান থেকে কমান্ডো পাঠাও।
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন; আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন।
***
হাল্ব এখন সুলতান আইউবীর বিরোধী পক্ষের কেন্দ্র। সাহায্য হিসেবে খৃস্টানদের প্রেরিত তীর-ধনুক ও দাহ্য পদার্থের মটকা ও ঘোড়াগুলো হাল্ব পৌঁছে গেছে। খৃস্টানরা হাবের লোকদের মধ্যে একটি গুণ এই প্রত্যক্ষ করেছিল যে, তারা অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার সাথে সুলতান আইউবীর অবরোধের মোকাবেলা করেছিল। সালতানাতের রাজধানীও এখন হাল্ব। খৃস্টান উপদেষ্টাগণ মসুলে সাইফুদ্দীনকে এবং হাররানে গোমস্তগীনকে সংবাদ পাঠায় যে, আপনাদের সম্মিলিত বাহিনীর জন্য সাহায্য এসে গেছে, আপনারা বিলম্ব না করে চলে আসুন। ঐতিহাসিকদের বিবরণ মোতাবেক হাল্ব নগরীর বাইরে একস্থানে এই তিন মুসলিম শাসকের সাক্ষাৎ ঘটে এবং সেখানে বসে তাদের মাঝে একটি অলিখিত চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি কি ধরনের হবে, তা ঠিক করে খৃস্টান উপদেষ্টাগণ।
সেই রাতের ঘটনা। মসুলের কারাগারে বসে খতীব ইবনুল মাখদুম প্রদীপের আলোতে কুরআন পাঠ করছিলেন। তার কন্যা সায়েকা সেই ভবনটির একটি কক্ষে অবস্থান করছে, বস্তাবন্দী হয়ে যে ভবনে এসে সে পৌঁছেছিল, তার সঙ্গে যে রক্ষী সেনাকে ধরে আনা হয়েছে, সে অন্য কক্ষে। ভবনটিতে তারা ব্যতীত আরো দুজন লোক আছে, যারা তাদেরকে তুলে এনেছিল। তাদের অবশিষ্ট সঙ্গীরা কয়েদখানার বাইরে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেয়ালের উপরিভাগ দুর্গের দেয়ালের মত, যার উপর মোর্চার মত তৈরি করা আছে। উপরে কয়েকজন সান্ত্রী ঘোরাফেরা করছে। তাদের সংখ্যা বেশি নয়। যে জেল কর্মকর্তা খতীবকে পালাবার সুযোগ করে দেয়ার ওয়াদা দিয়েছিলেন, তিনি সান্ত্রীদের প্রতি দৃষ্টি রেখে ঘোরাফেরা করছেন। যে দেয়ালের নীচে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে, তিনি তার উপরের সান্ত্রীকে ডেকে সঙ্গে করে নিয়ে যান।
