আমি আনতানুনকে বিয়ে করতে চাই- সাদিয়া বলল।
তা-ই হবে- সুলতান আইউবী বললেন- কিন্তু বিয়েটা হবে দামেস্কে। যুদ্ধের ময়দান শহীদ হওয়ার স্থান- বিয়ের জায়গা নয়।
মহামান্য সুলতান!- আনতানুন বলল- আমি আপনাকে অসন্তুষ্ট করেছি। তার শাস্তিস্বরূপ যতক্ষণ না আমি আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারি, ততক্ষণ বিয়ে করব না। সে সাদিয়াকে উদ্দেশ করে বলল- তুমি সুলতানের আদেশ মোতাবেক দামেস্ক চলে যাও। সেখানে তোমার বসবাসের ভাল ব্যবস্থা হবে। আমার সঙ্গেই তোমার বিয়ে হবে। সে আবার সুলতান আইউবীকে বলল- আমি কোন একটা কমান্ডো বাহিনীতে অংশগ্রহণ করে কাজ করতে চাই; আপনি আমার এই আবেদনটুকু মঞ্জুর করুন। আমি গেরিলা হামলার প্রশিক্ষণ নিয়েছি।
আনতানুনকে একটি কমান্ডো দলে পাঠিয়ে দেয়া হল। বৈঠক থেকে বিদায় নেয়ার সময় সাদিয়ার প্রতি এক নজর তাকালও না সে।
পরদিন যখন সাদিয়ার দামেস্ক রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখন সেই মেয়েগুলো এসে পৌঁছে, যাদেরকে আল-মালিকুস সালিহ গোমস্তগীনের নিকট উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে রয়েছে সালার শামসুদ্দীন ও শাদবখতের প্রেরিত দুব্যক্তি। হাররানে কী সব ঘটনা ঘটছে, তারা সুলতান আইউবীকে তার কাহিনী শোনায়।
ফিলিস্তিনের মুসলমানরা যে আপনার পথ পানে তাকিয়ে আছে, তা কি আপনি জানেন? এক মেয়ে বলল- সেখানকার মেয়েরা আপনার নামে গান গায়। মসজিদে মসজিদে আপনার বিজয়ের জন্য দুআ হয়।
অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে খৃস্টানরা কিভাবে মুসলমানদের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়েছে এবং পৃথিবীটাকে তাদের জন্য জাহান্নামে পরিণত করেছে, মেয়েটা তার বিবরণ প্রদান করে।
সেখানে শুধু আমাদের মেয়েদের নয়; জাতীয় মর্যাদারও শ্লীলতাহানি চলছে- অপর এক মেয়ে বলল- আমি বরং বলব, জাতির শ্লীলতাহানি আমাদের শাসকরাই করছে। আমাদেরকে গোমস্তগীনের নিকট উপহারস্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছিল। আমরা তাদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলেছি, আমরা আপনাদেরই কন্যা। কিন্তু তারা আমাদের কোনই আবেদন-আর্তি শোনেননি, তারা আমাদেরকে একজন অপরজনের নিকট উপহার হিসেবে দান করা শুরু করেছেন।
ফিলিস্তীনের পথের প্রতিবন্ধকও তারাই- সুলতান আইউবী বললেন আমি ফিলিস্তীনের উদ্দেশ্যেই ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। কিন্তু আমার ভাইয়েরা আমার পথ আগলে দাঁড়িয়ে গেছে। যা হোক, এখন তোমরা নিরাপদ। তোমাদের আগে আরো একটি মেয়ে এখানে এসেছিল। তাকে দামেস্ক পাঠানো হচ্ছে। তোমরাও তার সঙ্গে চলে যাও।
আমরা প্রতিশোধ নিতে চাই- এক মেয়ে বলল- আমাদেরকে এখানেই রেখে দিন এবং কাজ দিন। আমরা এখন আর কোন হেরেম কিংবা কোন গৃহে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চাই না।
আমি এখনো জীবিত আছি- সুলতান আইউবী বললেন- তোমরা দামেস্কে চলে যাও। সেখানে তোমাদেরকে কেউ আবদ্ধ করে রাখবে না। সেখানে আরো কয়েকটি মেয়ে বিভিন্ন উপায়ে আমাদের সাহায্য করছে। সেখানে তোমাদেরকেও কোন একটা দায়িত্ব দেয়া হবে।
মেয়েগুলোকে বিদায় দিয়ে সুলতান আইউবী অস্থির মনে এদিক-ওদিক পায়চারি করতে শুরু করেন। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তার সঙ্গে আছেন। তিনি বললেন- মিশর থেকে রিজার্ভ ফোর্স এখনো এসে পৌঁছেনি। তিনটি বাহিনী যদি আমাদের উপর আক্রমণ করতে এসে পড়ে, তাহলে আমরা সমস্যায় পড়ে যাব। মনে হচ্ছে, আমাদের সৈন্য যে কম এবং আমি সাহায্যের অপেক্ষায় আছি, তা দুশমন জানে না। তাদের স্থলে যদি আমি হতাম, তাহলে এক্ষুণি আক্রমণ করে বসতাম এবং রসদের পথ বন্ধ করে দিতাম।
মিশর থেকে সাহায্য আসবে, তাতে সন্দেহ নেই- হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন- মোহতারাম আল-আদেল এমন লোক তো নন যে, তিনি সময় নষ্ট করবেন। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, দুশমন আমাদের সরবরাহ পথ বন্ধ করেনি।
সকল ঐতিহাসিক লিখেছেন, সে সময়টা ছিল সুলতান আইউবীর জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বিপদসংকুল। তিনি মিশর থেকে বিশেষ সাহায্যের অপেক্ষা করছিলেন। সে মুহূর্তে যদি আল-মালিকুস সালিহ, সাইফুদ্দীন ও গোমস্তগীনের সম্মিলিত বাহিনী সুলতান আইউবীর উপর হামলা করে বসত, তাহলে তাকে সহজেই পরাজিত করতে পারত। কারণ, তার সৈন্য ছিল খুবই কম। তিনি পাহাড়ী অঞ্চলে মরু এলাকার কৌশল প্রয়োগ করতে পারতেন না। কিন্তু তার শত্রুপক্ষ কী ভাবছিল, তা কে জানে। খৃস্টানরা তার উপর আক্রমণ করার পরিবর্তে মুসলিম আমীরদেরকে তার বিরুদ্ধে লড়াতে চাচ্ছিল। তারাও দেখল না যে, সুলতান আইউবী এক অসহায় অবস্থায় বসে বসে আল্লাহর নিকট দুআ করছেন- ইয়া আল্লাহ! এই অসহায় পরিস্থিতিতে দুশমন যেন আমার উপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে; তুমি আমাকে রক্ষা কর।
যুদ্ধ বেঁধে গেলে ফৌজের ঘোড় ও উটগুলাকে যে নদী থেকে পানি পান করাতে হবে, সেটির দখল বজায় রাখার শক্তিও তার ছিল না। খৃস্টান কিংবা তার মুসলিম শত্রুপক্ষ যদি বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করত, তাহলে গেরিলাদের দ্বারা তারা আইউবীর রিজার্ভ বাহিনীর আগমন ও রসদের পথটা বন্ধ কিংবা নতুন বাহিনীর আগমনের গতি শ্লথ করে দিতে পারত। সুলতান আইউবী টহল কমান্ডোদের দ্বারা সে পথটা নিরাপদ করে রেখেছিলেন।
কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ- যিনি সে সময়কার প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনার বিশ্লেষক- তার রোজনামচায় সুলতান ইউসুফ (সালাহুদ্দীন আইউবী)-এর উপর কি বিভীষিকা নেমে এসেছিল শিরোনামে লিখেছেন–
