এই অভিযানকে আরো তীব্রতর করে তোলা প্রয়োজন- হাররান থেকে আগত উপদেষ্টা বলল- আমি আপনাদেরদেরকে গোমস্তগীনের ঘরের ঘটনাবলী শুনিয়েছি। তাতে প্রমাণিত হচ্ছে, ওখানে সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচর ও নাশকতা কর্মী শুধু অবস্থানই করছে না; গোমস্তগীনের বাসভবন এবং তার সেনাবাহিনীর উচ্চতর পদেও পুরোপুরি তৎপর। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
আমাদের কী ঠেকাটা পড়েছে যে, আমরা সাইফুদ্দীন, আল-মালিকুস সালিহ ও তাদের যৌথ বাহিনীর অপরাপর আমীর প্রমুখকে সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতা থেকে রক্ষা করব?- এক খৃস্টান কমান্ডার বলল আমরা তো তাদের ধ্বংসের গতিকে আরো তীব্রতর ও ত্বরান্বিত করব। হোক তা আমাদের হাতে কিংবা তাদেরই জাতি ভাইয়ের হাতে। এই যেসব মুসলমান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, আপনি কি সত্য মনে তাদেরকে আমাদের বন্ধু মনে করে বসেছেন? তা-ই যদি হয়, তাহলে তার অর্থ হবে, আপনি খাঁটি খৃস্টান নন। আপনি বুঝতে পারেননি যে, আমাদের শত্রুতা না ছিল নূরুদ্দীন জঙ্গীর সঙ্গে, না আছে সালাহুদ্দীন আউইবীর সঙ্গে। সালাহুদ্দীন আইউবী যদি কখনো আমার সম্মুখে এসে পড়েন, তাহলে আমি তাকে শ্রদ্ধা করব। তিনি একজন যোদ্ধা, রণাঙ্গনের রাজা। আমাদের শত্রুতা হচ্ছে সেই ধর্মের সঙ্গে, যার নাম ইসলাম। যারা এই ধর্মের সুরক্ষা ও এর প্রচার-প্রসারে কাজ করবে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব। আমাদের এবং সালাহুদ্দীন আইউবীর মৃত্যুর পরও এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। সে লক্ষ্যে আমরা মুসলমানদের মধ্যে এমন কু-চরিত্র সৃষ্টি করছি, যা তাদের ভবিষ্যৎ বংশধরের মধ্যেও বিস্তার লাভ করতে থাকবে। আমরা এমন পন্থা ও কৌশল অবলম্বন করছি যে, মুসলমান তাদের নিজস্ব রীতি-নীতি ও সভ্যতা-সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে আমাদের সৃষ্টি করা ও শেখানো চরিত্র-সভ্যতা লালন করবে।
আমাদেরকে তাদের আসল ধর্ম ও কালচার বিকৃত করতে হবে- রেমন্ড বললেন- আমাদের এই অভিযান যখন পূর্ণতা লাভ করবে, সে সময়ে আমরা বেঁচে থাকব না। এই অভিযানের ফল আমরা দেখতে পাব না। আমি পূর্ণ নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারি যে, আমরা যদি এই অভিযান অব্যাহত রাখি, তাহলে এমন একটা সময় আসবে, যখন ইসলাম যদিও বেঁচে থাকে, তা হবে ইসলামের বিকৃত রূপ, যা পালনে মানুষ শুধুই বিভ্রান্ত হবে। মুসলমান হবে নামের মুসলমান। তাদের স্বাধীন-স্বতন্ত্র কোন রাজ্য থাকেও যদি, সেটি হবে পাপের আড্ডাখানা। ইহুদী ও খৃস্টান পন্ডিতগণ এই জাতিটার মধ্যে পাপের মহব্বত সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
সে যাই হোক, তারা এখন আমাদের সাহায্যের অপেক্ষায় বসে আছেন খৃস্টান উপদেষ্টা বলল- গোমস্তগীন আমাকে সে উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছেন।
দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এ বিষয়ে মতবিনিময় চলে। শেষে সিদ্ধান্ত হয়, সৈন্য পাঠিয়ে তার কোন সাহায্য করা হবে না। দেই দিচ্ছি বলে কালক্ষেপণ করতে হবে। তাকে এই বলে আশ্বস্ত করতে হবে যে, তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর হামলা করে তাকে আলরিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ করতে বাধ্য কর। আমরা তারই কোন একটা স্পর্শকাতর স্থানে সেনা অভিযান চালিয়ে তাকে এমন বেকায়দায় ফেলে দেব যে, তিনি আলরিস্তান ত্যাগ করে পেছনে সরে যেতে বাধ্য হন। আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হল, হাল্ব, হাররান ও মসুলের সৈন্যদের জন্য এই উপদেষ্টার সঙ্গে তীর-ধনুক ও দাহ্য পদার্থ পাঠিয়ে দেয়া হবে। তাছাড়া পাঁচশত ঘোড়াও প্রেরণ করা হবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, অধিকাংশ ঘোড়াই যেন এমন হয়, যেগুলো আমাদের সৈন্যদের কাজে আসে না, কিন্তু বাহ্যিকভাবে সুস্থ ও সবল।
আর ভবিষ্যতে সেই আমীর প্রমুখকে অল্প অল্প করে অস্ত্র সরবরাহ করা হবে- রেজিনাল্ট বললেন- সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে তাদেরকে বিলাসিতার দিকে টেনে আনতে হবে। তাদেরকে বুঝ দিয়ে রাখতে হবে যে, যখনই তাদের অস্ত্র কিংবা ঘোড়ার প্রয়োজন পড়বে, তা সরবরাহ করা হবে। এভাবে তারা নিজেরা নিজেদের ব্যবস্থা গ্রহণে উদাসীন হয়ে পড়বে এবং আমাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে। এসব সাহায্য-সহযোগিতা এবং আমাদের উপদেষ্টাদের মধ্যস্থতায় আমরা তাদের মন-মস্তিষ্কের উপর জয়লাভ করে ফেলব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা কিন্তু বলা হয়নি- এক কমান্ডার বলল- শেখ সান্নানের পাঠানো নয় সদস্যের ঘাতক দল রওনা হয়ে গেছে। আশা করছি, এবার তারা সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা না করে ফিরবে না। তারা যে শপথ নিয়ে গেছে, তাতে তারা এ কথাও বলেছে যে, জীবন বাজি রেখে তারা আইউবীকে হত্যা করবে। অন্যথায় তারা জীবিত ফিরে আসবে না।
সেদিনই পাঁচশত ঘোড়া, কয়েক হাজার ধনুক, লক্ষাধিক তীর ও দাহ্য পদার্থ ভর্তি কয়েকটি মটকা হাবের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সঙ্গে একখানা বার্তাও দেয়া হয়, যাতে লেখা ছিল- এই সাহায্যের ধারা চলতে থাকবে। আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর এক্ষুণি আক্রমণ করুন।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তার হেডকোয়ার্টারে বসে আছেন। তাঁর নিকট সর্বপ্রথম আনতানুন ও সাদিয়া গিয়ে পৌঁছে। সাদিয়া গোমস্তগীনের হেরেমের সেই মেয়ে, যে একজন খৃস্টান উপদেষ্টাকে খুন করে আনতানুন নামক রক্ষী সেনার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। আনতানুন সুলতান আইউবীর এমন এক গোয়েন্দা, যে আবেগের বশবর্তী হয়ে সীমালংঘন করে ফেলেছিল। যার ফলে সে, গ্রেফতার হয়েছিল। সালার শামসুদ্দীন ও শাদবখত কৌশল করে তাকে পালাবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সুলতান আইউবীর ইন্টেলিজেন্স প্রধান হাসান ইবনে আবদুল্লাহ আনতানুন ও সাদিয়াকে সুলতানের নিকট নিয়ে যান। আনতানুন সুলতানকে তার ইতিবৃত্ত অবিকৃতরূপে শোনায়। আনতানুনের এই কর্মনীতি সুলতানের পছন্দ না হলেও তিনি তাকে এই বলে ক্ষমা করে দেন যে, যেরূপ সাফল্যের সঙ্গে তুমি গোমস্তগীনের রক্ষী বাহিনীতে ঢুকে পড়েছিলে, তা তোমার বিরাট কৃতিত্ব। সাদিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে হেরেম পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়াও তার আরেক কৃতিত্ব। সুলতান আইউবী আনতানুনের ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করেন, একে সেনাবাহিনীতে পাঠিয়ে দাও। কারণ, গুপ্তচরবৃত্তির নাজুক কাজের জন্য এর আবেগ নিয়ন্ত্রিত নয়। আর সাদিয়াকে দামেস্ক পাঠিয়ে দেয়ার আদেশ দেন।
