হাররান থেকে এক খৃস্টান উপদেষ্টা- প্রকৃতপক্ষে সে একজন গোয়েন্দা রেমন্ড ও রেজিনাল্টের নিকট এসে পৌঁছে এবং হাররানের তাজা ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে। সে বলল- হাল্ব থেকে আল-মালিকুস সালিহ গোমস্তগীন ও সাইফুদ্দীনের নিকট উপহারসহ বার্তা প্রেরণ করেছেন, অরা যেন তাদের সেনাবাহিনীকে তার বাহিনীর সঙ্গে যৌথ কমান্ডে দিয়ে দেন। সেখানে একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে যে, গোমস্তগীনের দুজন সালার হাররানের কাজীকে হত্যা করে ফেলেছে এবং হাল্ব থেকে আল-মালিকুস সালিহ বার্তার সঙ্গে উপহার হিসেবে যে দুটি সুন্দরী মেয়ে প্রেরণ করেছিলেন, সালারদ্বয় তাদেরকে পালাবার সুযোগ করে দেয়। তারপর তারা স্বীকার করে, তারা সালাহুদ্দীন আইউবীর সমর্থক এবং তারই জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করছিল। এ দুসালার পরস্পর আপন ভাই। গোমস্তগীন তাদেরকে কয়েদখানায় আবদ্ধ করে রেখেছেন। তার মাত্র একদিন আগে আমাদের এক সঙ্গী উপদেষ্টা গোমস্তগীনের বাসভবনে নিমন্ত্রণে গিয়ে রহস্যজনকভাবে খুন হয়। পরদিন তথ্য পাওয়া গেল, গোমস্তগীনের হেরেমের এক মেয়ে ও একজন দেহরক্ষী নিখোঁজ রয়েছে।, খৃস্টানদের এই বৈঠকে অট্টহাসির ধুম পড়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকে এই হাসাহাসির ধারা। অবশেষে হাসি থামিয়ে রেমন্ড বললেন- এই মুসলিম জাতিটা এতই যৌনবিলাসী হয়ে উঠেছে যে, তার শাসক ও আমীর উজীরগণ যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও যৌনতায় প্রভাবিত অবস্থায় নিয়ে থাকে। একটু ভেবে দেখুন, গোমস্তগীনের ন্যায় একজন প্রতাপান্বিত ও যুদ্ধবাজ দুর্গপতির সেনাবাহিনীর কমান্ড যে দুজন সালারের হাতে ছিল, তারা তার শত্রু সালাহুদ্দীন আইউবীর সেনা অধিনায়ক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তারা উপহার হিসেবে আসা মেয়ে দুটোর খাতিরে কাজীকে খুন করেছে এবং মেয়েগুলোকে সালাহুদ্দীন আইউবীর জন্য পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরা ধরা পড়ে গেছে। গোমস্তগীনের হেরেমের যে মেয়েটি নিখোঁজ হয়, তাকে সেই রক্ষীসেনা-ই ভাগিয়ে নিয়ে গেছে। তবে আমাদের লোকটা কোন্ চক্করে পড়ে খুন হল, তা অবশ্য বলতে পারব না। মুসলমান আমীর, শাসক ও দুর্গপতিদের হেরেমের অবরুদ্ধ জগত অত্যন্ত রহস্যময়। আমি আপনাদেরকে নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, এই জাতি ভোগ-বিলাস ও নারীপূজার কারণেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
আমি দুটি কথা বলতে চাই- খৃস্টান সামরিক বাহিনীর ইন্টেলিজেন্স প্রধান অপর এক খৃস্টানকে বলল- প্রথম কথা হল, আপনি বলেছেন, উপহারস্বরূপ আসা মেয়ে দুটোকে হাররান থেকে ভাগিয়ে সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আপনার এ ধারণা সঠিক নয়। আমি গুপ্তচরবৃত্তিতে অভিজ্ঞ। দুশমনের সামরিক তথ্য সগ্রহ করা ছাড়া সামরিক নেতৃবর্গ-কর্মকর্তা ও অন্যান্য পদস্ত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত চরিত্র ও রণকৌশল সংক্রান্ত তথ্যাদি সংগ্রহ করাও আমার বিভাগের দায়িত্ব। আমি আপনাকে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে বলছি, নারী ও মদের ব্যাপারে সালাহুদ্দীন আইউবী শক্ত একটা পাথর। এই একটা কারণেই আপনি তাঁকে না পারবেন বিষ খাইয়ে খুন করতে, না পারবেন কোন রূপসী নারীর জালে আবদ্ধ করে ঘাতকদের দ্বারা হত্যা করাতে। প্রকৃতির অমোঘ বিধান হল, যে লোক মানসিক বিলাসিতায় অভ্যস্ত নয়, তার প্রত্যয় দৃঢ় ও শক্ত হয়ে থাকে। এমন মানুষ যখন যে পরিকল্পনা হাতে নেয়, তা বাস্তবায়ন করেই তবে নিঃশ্বাস ফেলে। আপনার শত্রু সালাহুদ্দীন আইউবীর মধ্যে এই গুণ বিদ্যমান। এ কারণেই তার মাথা পুরোপুরি কাজ করে থাকে এবং তিনি এমন এমন কৌশল প্রয়োগ করেন, যা আপনার কল্পনায়ও আসে না। যার ফলে আপনার পা উপড়ে যায়। আমি আইউবী সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছি, তাতে অনুমিত হচ্ছে, তিনি অনৈতিক চাহিদা ও বিলাসিতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। নিজ সেনাবাহিনীর মধ্যেও তিনি এই গুণ সৃষ্টি করে রেখেছেন। তা না হলে খোলা ময়দানের লড়াইয়ে অভ্যস্ত সৈন্যরা বরফাবৃত উপত্যকা ও পার্বত্য এলাকায় এই তীব্র শীতের মওসুমে যুদ্ধ করতে পারত না। আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের মধ্যে এই গুণ সৃষ্টি করতে না পারবেন, ততক্ষণ আপনি সালাহুদ্দীন আইউবী নামক আপনার এই শত্রুকে পরাজিত করতে পারবেন না।
আমার দ্বিতীয় কথা হল, অন্যান্য মুসলিম আমীর, উজীর ও শাসনকর্তাদের মধ্যে যে নারীপূজা শুরু হয়ে গেছে, তা আমার বিভাগেরই কৃতিত্ব। ইহুদী পণ্ডিতগণ এক শতকেরও বেশি সময় ধরে মুসলমানদের চরিত্র বিনষ্টের অভিযান পরিচালিত করে আসছেন। এটা মূলত তাদেরই সাফল্য যে, আমরা নারী, সোনা-দানা ও মনি-মাণিক্যের মাধ্যমে মুসলিম নেতৃবর্গের চরিত্র ধ্বংস করে দিয়েছি। আমরা চারিত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদেরকে ধ্বংস করার জন্য রূপসী ও বিচক্ষণ মেয়েদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদানপূর্বক উপহারের নামে তাদের নিকট প্রেরণ করে থাকি। এখন তারাও একজন আরেকজনকে নারী উপহার দেয়া শুরু করেছে। তাদের জাতীয় চরিত্র নিঃশেষ হয়ে গেছে। এটা আমাদের সাফল্য যে, আমরা তাদের মাঝে বিভেদ ও রাজত্বের মোহ সৃষ্টি করে দিয়েছি।
এই জাতিটাকে আমরা শেষ করে দেব- রেজিনাল্ট বললেন- চরিত্র বিনষ্ট করার মাধ্যমেই তাদের সর্বনাশ ঘটাতে হবে। সালাহুদ্দীন আইউবী এই ভেবে উফুল্ল হয়ে থাকবেন যে, তিনি ভাই রেমন্ডকে পিছু হটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি জানেন না, রেমন্ড যুদ্ধের ময়দান থেকে পিছপা হয়েছেন ঠিক; কিন্তু তার জাতির বুকের মধ্যে ঢুকে গিয়েছেন। ময়দানে অবতীর্ণ হয়েই লড়াই করব, এটা জরুরী নয়। আমরা অন্য অঙ্গনেও লড়তে পারি।
