আমাকে উঠতে দাও। কোঁকাতে কোকাতে বডিগার্ড বলল।
তাকে তুলে বসানো হল। সে বলল- সাইফুদ্দীন সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে চান।
এটা কোন তথ্য নয়- এক মুখোশধারী বলল- বল, তিনি কখন এবং কিভাবে যুদ্ধ করতে চান? তিনি কি তার বাহিনীকে হাব ও হাররানের বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করে লড়তে চান, নাকি আলাদা লড়বেন?
তার বাহিনী অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে- বডিগার্ড জবাব দেয় কিন্তু তিনি এমন কৌশল অবলম্বন করবেন যে, তার বিজয় সম্পূর্ণ আলাদা দেখা যাবে। হাব ও হাররানের লোকদেরকে তিনি বিশ্বাস করেন না।
সালারদের প্রতি তার নির্দেশনা কী?- মুখোশধারী জিজ্ঞেস করে।
তার পরিকল্পনা হল, সালাহুদ্দীন আইউবীকে পাহাড়ী এলাকায় ঘিরে ফেলা হবে। বডিগার্ড জবাব দেয়।
বাহিনী কোন্ পথে যাবে?
হামাত শিং-এর পথে।
খৃস্টানরা কী পরিমাণ সাহায্য করছে?
খৃস্টানরা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে- বডিগার্ড জবাব দেয়। কিন্তু সাইফুদ্দীন তাদেরকেও ধোকা দেবেন। খৃস্টান বাহিনীর কয়েকজন কমান্ডার মসুলের বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
এই দুমুখোশধারী এবং অপর কক্ষে সায়েকার কক্ষে উপবিষ্ট দুব্যক্তি সুলতান আইউবীর কমান্ডো গুপ্তচর। খতীব ইবনুল মাখদুমের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছিল। বরং বলা যায়, খতীব তাদের পৃষ্ঠপোষক ও নেতা ছিলেন। এই দলটি সুলতান আইউবীর জন্য চোখ ও কানের কাজ দিত। মসুলে থেকে যখনই যে তথ্য সংগ্রহ করতে পারত, তা সুলতান আইউবীর হেডকোয়ার্টারে পৌঁছিয়ে দিত। তারা মসুলে চাকুরি-ব্যবসা ইত্যাদি কাজ নিয়ে অবস্থান করত। খতীব ইবনুল মাখদুম গ্রেফতার হওয়ার পর তারা রাতে পালাক্রমে তার বাসভবন পাহারা দিত। সায়েকার সঙ্গ দেয়ার জন্য দুটো মেয়ে রাতে ঘুমাতে এসে যে ছায়া দেখে ভয়ে পেয়েছিল, এরাই সেই ছায়া। সায়েকা তাদেরকে বলেনি যে, ছায়াগুলো মানুষ। বরং সে ধারণা দিয়েছিল, এগুলো জিন। লোকগুলোর জানা ছিল, সায়েকা সাইফুদ্দীনের নিকট পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি আনতে গেছে। ফিরে এসে মেয়েটা এদের একজনকে অবহিত করেছিল যে, রাতে এক লোক এসে তাকে কয়েদখানায় নিয়ে যাবে। সে এও বলেছিল যে, সাইফুদ্দীন তার সঙ্গে আপত্তিকর কথা বলেছেন এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। লোকটি তার দলের সকলকে বিষয়টি অবহিত করে। তারা সবাই বিচক্ষণ ও দূরদর্শী। তাদের মনে সন্দেহ জাগে, কয়েকখানায় নিয়ে যাওয়ার নাম করে সায়েকাকে অন্য কোন স্থানে উধাও করে ফেলা হতে পারে। তাই সূর্য ডোবার পর পাঁচজন লোক সায়েকার ঘরে ঢুকে লুকিয়ে থাকে। সায়েকা বডিগার্ডের সঙ্গে বেরিয়ে গেলে তারাও তাদের পিছু নেয়। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর তাদের সন্দেহ সঠিক প্রমাণিত হয়। তারা সাফল্যজনকভাবে সায়েকাকে রক্ষা করে এবং সাইফুদ্দীনের দেহরক্ষীকে ধরে ফেলে। তারা তার মুখ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য বের করে। তন্মধ্যে এ তথ্য, সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, সাইফুদ্দীনের ভাই ইজুদ্দীন বাহিনীকে দুভাগে বিভক্ত করে এক অংশকে নিজের কমান্ডে রেখে দিয়েছেন। এই অংশটা রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে। অর্থাৎ তাদেরকে পরে প্রয়োজন অনুপাতে প্রেরণ করা হবে। প্রথম হামলার নেতৃত্ব দেবেন সাইফুদ্দীন নিজেই। দ্বিতীয়ত, যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি পাওয়া গেছে, তাহল, হাব থেকে গোমস্তগীন ও সাইফুদ্দীনের নিকট দূত এসেছে। বার্তা হল, তিনটি বাহিনীকে যৌথ কমান্ডে রাখা হবে এবং খৃস্টানদের সাহায্যের উপর বেশি ভরসা রাখা যাবে না। প্রাপ্ত অন্যান্য তথ্যও ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
এসব তথ্য প্রদান করে বডিগার্ড দাবি জানায়, এবার আমাকে মুক্তি দাও।
মুখোশধারীরা দেব দেব করে কাল ক্ষেপণ করে। সায়েকাকে সে কক্ষেই থাকতে দেয়া হল। তাকে নিজ ঘরে নিয়ে রাখা নিরাপদ নয়। বডিগার্ডকে ভবনটির একটি অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হল।
***
হাররান ও হাল্ব থেকে প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূরে খৃস্টান সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টার। এখানকার অধিকাংশ তৎপরতা গোয়েন্দা বিষয়ক। এখানে যে কজন খৃস্টান সম্রাট ও কমান্ডার অবস্থান করছেন, তারা সরাসরি নিজেরা সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে মুখোমুখি যুদ্ধ করার পরিবর্তে তার মুসলিম বিরুদ্ধবাদীদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আগেই বলে এসেছি যে, খৃস্টানরা বড় বড় মুসলিম আমীরদেরকে খৃস্টান সামরিক উপদেষ্টা দিয়ে রেখেছিল। তারা তাদেরকে সামরিক পরামর্শ প্রদান ছাড়াও সৈন্যদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করত। নিজেদের আসল উদ্দেশ্য গোপন রাখার জন্য তারা মুসলিম আমীরদেরকে বিলাসিতার উপকরণ সরবরাহ করত। তাদের গুপ্তচররাও এই আমীরদের দরবারে অবস্থান করত এবং তাদের হেডকোয়ার্টারে খবরাখবর প্রেরণ করত।
হাররান থেকে গোমস্তগীনের এক খৃস্টান উপদেষ্টা তাদের এই হেডকোয়ার্টারে এসে পৌঁছে। তখন খৃস্টানদের দুজন বিখ্যাত যুদ্ধবাজ সম্রাট রেমন্ড ও রেজিনাল্ট হেডকোয়ার্টারে উপস্থিত ছিলেন। রেমন্ড সেই সম্রাট, যাকে সুলতান আইউবী এই অল্প কদিন আগে যথাযথ কৌশল প্রয়োগ করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর রেজিনাল্ট হলেন সেই বিখ্যাত খৃস্টান রাজা, যাকে সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী এক যুদ্ধে বন্দী করেছিলেন। তাকে এবং অন্যান্য খৃস্টান কয়েদীদের হাররানে গোমস্তগীনের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। সে সময় গোমস্তগীন বাগদাদের খেলাফতের একজন দুর্গপতি ছিলেন। জঙ্গীর ওফাতের পর গোমস্তগীন কেন্দ্রীয় খেলাফতের সঙ্গে বিদ্রোহ করে স্বাধীন শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন এবং খৃস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রগাঢ় করার লক্ষ্যে রেজিনাল্টের ন্যায় মূল্যবান বন্দীকে অন্য সকল খৃস্টান কয়েদীর সঙ্গে মুক্ত করে দেন। নূরুদ্দীন জঙ্গী ঘোষণা দিয়েছিলেন, রেজিনাল্টের বিনিময়ে তিনি খৃস্টানদের থেকে দাবি-দাওয়া আদায় করে নেবেন। কিন্তু জঙ্গী মৃত্যুবরণ করার পর আমীরগণ বিলাসিতা ও ক্ষমতার নেশায় পড়ে তার সকল পরিকল্পনা উলট পালট করে দেয় এবং খৃস্টানরা সালতানাতে ইসলামিয়ার রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুপ্রবেশ করতে শুরু করে।
