সায়েকার চেহারায় প্রশান্তির আভা। মেয়েটা সাইফুদ্দীনের বডিগার্ডের হাতে অপহরণ ও লাঞ্ছিত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে গেছে।
অপর কক্ষে বডিগার্ডকে বস্তা থেকে বের করে তার মুখ থেকে কাপড় বের করা হয়। তার সামনে তিনজন মুখোশধারী দাঁড়িয়ে আছে। তার তরবারীটা মুখোশধারীদের হাতে।
তোমরা কারা?- মুখে প্রভাব ও গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বডিগার্ড মুখোশধারীদের জিজ্ঞেস করে- আমি মসুলের শাসনকর্তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করব।
মসুলের শাসনকর্তার হেফাজত এখন আল্লাহ করলে করতে পারেন- এক মুখোশধারী বলল- তুমি তোমার নিজের জীবন বাঁচানোর চিন্তা কর। মেয়েটাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলে?
কয়েদখানায় তার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করানোর জন্য বডিগার্ড জবাব দেয়- মনে রেখ, তোমরা যে মেয়েটাকে অপহরণ করেছ, তাকে তোমরা গিলতে পারবে না। এ খতীব ইবনুল মাখদুমের কন্যা এবং মসুলের শাসনকর্তা তার হেফাজতের জন্য নিজের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীকে প্রেরণ করেছেন। এ থেকেই অনুমান করতে পার যে, তোমরা কোথায় হাত দিয়েছ। মসুলের শাসনকর্তা মেয়েটার সন্ধানে শহরের প্রতিটি ঘর অনুসন্ধান করবেন। তোমরা শহর থেকে বের হতে পারবে না। সাইফুদ্দীন এক্ষুণি সংবাদ পেয়ে যাবেন যে, তার এক দেহরক্ষী এবং খতীবের মেয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে শহর সীল করে দেয়া হবে। আচ্ছা, মেয়েটিকে তোমরা কোথায় রেখেছ?
শোন বন্ধু!- এক মুখোশধারী বলল- মেয়েটা এখানেই আছে। তাকে অপহরণ করা হয়নি, বরং তাকে অপহরণের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে। আমরা জানি, মসুলের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীনের জন্য এই মেয়েটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর সন্ধানে তিনি তার গোটা বাহিনীকে মাঠে নামাবেন। তার কারণ, মেয়েটা অতিশয় রূপসী ও যুবতী এবং তার পিতা কয়েকখানায় বন্দী। মেয়েটা সাইফুদ্দীনের পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি তাকে পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি প্রদান করেছেন। আমরা জানি, সাক্ষাতের এই অনুমতিদান একটি প্রতারণা। সাক্ষাতের নামে দূরভিসন্ধি বাস্তবায়নের জন্যই তিনি সময়টা রাতে নির্ধারণ করেছেন। আচ্ছা, তুমি বল তো, খতীবের সঙ্গে তার মেয়ের সাক্ষাৎ দিনে করানো হয়নি কেন? ঘর থেকে বের করেই তুমি তাকে ভুল পথে নিয়ে এসেছ। তখনই আমরা তোমাদের পিছু নিয়েছি। তোমরা দু-তিনবার থেমে পেছন দিকে তাকিয়েছিলে। তোমরা যাদের উপস্থিতি আন্দাজ করেছিলে, তারা আমরাই। যাদেরকে তুমি ঝোঁপের মধ্যে সন্ধান করতে গিয়েছিলে, তারাও আমরা। কিন্তু তুমি আমাদেরকে দেখনি। দেখবে কিভাবে? আমাদেরকে দিনের আলোতেও কেউ দেখতে পায় না।
তোমরা এই মেয়েটার উপর জুলুম করেছ- বডিগার্ড বলল- আমি তাকে তার পিতার নিকট নিয়ে যাচ্ছিলাম।
তুমি মেয়েটাকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছিলে- এক মুখোশধারী তরবারীর আগাটা তার ধমনির উপর রেখে চাপা কণ্ঠে বলল- তুমি তাকে সাইফুদ্দীনের জন্য নিয়ে যাচ্ছিলে। তোমাদের শাসনকর্তা কত দয়ালু মানুষ, তা আমাদের জানা আছে যে, তিনি খতীব ইনবুল মাখদুমের ন্যায় শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে জেলে পুরতে কুণ্ঠাবোধ করলেন না। আর এখন তার কন্যাকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি প্রদান করলেন! তুমি শুধু এতটুকুই জান, খতীব অপরাধী। কিন্তু তোমার একথা জানা নেই যে, এই মহামান্য আলেমে দ্বীন মসুলে নিঃসঙ্গ নন এবং তিনি যখন কয়েকখানায় আবদ্ধ, তখন তার কন্যাও ঘরে একাকী নয়। আমরা সাইফুদ্দীনের সিংহাসন উল্টে দেব। দিন তার শেষ হয়ে এসেছে। আমরা তাকে যে কোন সময় খুন করতে পারি। কিন্তু হাসান ইবনে সাব্বাহর ঘাতকদের ন্যায় কাউকে খুন করতে সুলতান আইউবী আমাদের নিষেধ করে দিয়েছেন। আমরা ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে যুদ্ধ করে শত্রুকে নিধন করি।
তোমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর লোক? বডিগার্ড জিজ্ঞেস করে।
হ্যাঁ- এক মুখোশধারী জবাব দেয়- আমরা আইউবীর কমান্ডো বাহিনীর সদস্য।
মুখোশধারী বডিগার্ডের ধ্বমনিতে স্থাপন করা তরবারীটায় একটু চাপ দেয়। বডিগার্ডের পিঠ দেয়ারের সঙ্গে গিয়ে ঠেকে। মুখোশধারী বলল- তুমি সাইফুদ্দীনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী এবং সবসময় তার সঙ্গে থাক। তার সব গোপন তথ্য তোমার জানা আছে। তুমি তাকে মেয়ে অপহরণ করে নিয়ে দাও। বল, একদম খোলাখুলিভাবে বল, সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে তার পরিকল্পনা কী? যদি বলতে অস্বীকার কর কিংবা যদি বল আমি কিছু জানি না, তাহলে তোমারও সেই দশাই হবে, যা সাইফুদ্দীন বন্দীশালায় তার প্রতিপক্ষের ব্যাপারে ঘটিয়ে থাকে।
তোমরা যদি সৈনিকই হয়ে থাক, তাহলে ভালভাবেই জান যে, শাসক ও রাজা-বাদশার সামনে একজন দেহরক্ষীর কোন মূল্য থাকে না বডিগার্ড জবাব দেয়- মসুলের শাসনকর্তার পরিকল্পনা কী, তা আমি কিভাবে বলব বলল।
এক মুখোশধারী তার মাথাটা উদোম করে চুলগুলো মুঠি করে ধরে একটা মোচড় দেয় এবং ঝটকা টান দিয়ে একদিকে নত করে ফেলে। অন্য একজন পা ধরে টান দিয়ে তাকে মাটিতে উপুড় করে ফেলে দেয়। একজন তার পিঠের উপর দাঁড়িয়ে যায়। দাঁড়ানো অবস্থায় কয়েকবার চাপ দিলে বডিগার্ডের প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তারপর তাকে বিভিন্ন রকম নির্যাতনের একটু একটু স্বাদ উপভোগ করানো হয় এবং তাকে বলা হয়, এখান থেকে তুমি জীবন নিয়ে ফিরতে পারবে না।
