তুমি কি পেছনে কারো পায়ের শব্দ শুননি? বডিগার্ড জিজ্ঞেস করে।
না- সায়েকা জবাব দেয়- আমিই তো তোমার পেছনে পেছনে হাঁটছি। সম্ভবত তুমি আমার আওয়াজই শুনতে পাচ্ছ।
না, আমি অন্য একটি শব্দ শুনেছি। বডিগার্ড ফিস ফিস করে বলল এবং সামনের দিকে হাঁটা দিল।
এত ভয় পাচ্ছ কেন?- সায়েকা বলল- পেছনে পেছনে কেউ যদি এসেই থাকে, আসুক না।
বডিগার্ড কোন উত্তর দেয় না। এই গলি শেষ হয়ে গেছে। সম্মুখে কোন জনবসতি নেই। মাটি উঁচু-নীচু। খানা-খন্দকও আছে। জেলখানাটা ওদিকেই, বসতির পেছনে কিছু দূরে। দুজনই পা টিপে টিপে সাবধানতার সাথে অগ্রসর হচ্ছে। এখন চারদিকে ঝোঁপ-ঝাড় ও গাছপালা। বডিগার্ড আবারো থমকে দাঁড়িয়ে চকিত নয়নে পেছন দিকে তাকায়। সে কারো হাঁটার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। তরবারীটা বের করে হাতে নেয় সে। পেছনের দিকে চলে যায়। দুতিনটি ঝোঁপের চারপাশে ঘুরে-ফিরে দেখে। কিন্তু কিছুই নেই।
এবারও নিশ্চয়ই পেছনে কারো পায়ের শব্দ শুনেছ?- বডিগার্ড সায়েকাকে বলল- এবারের শব্দটা আমি স্পষ্ট শুনেছি।
সায়েকা শব্দটা শুনেছে। কিন্তু সে মিথ্যা বলে- ওটা আসলে তোমার মনের ভয়। আর যদি কোন শব্দ শুনেই থাক, তাহলে তা খরগোশ কিংবা অন্য কোন জন্তু-জানোয়ার হবে। তুমি ওসব শব্দকে ভয় করছ কেন?
আমার ভয় করার কারণ হল- সাইফুদ্দীনের বডিগার্ড বলল- তুমি অতিশয় রূপসী ও যুবতী মেয়ে। তোমার মূল্য সম্ভবত তুমি জান না। কেউ যদি তোমাকে অপহরণ করে কোন আমীর বা শাসনকর্তার নিকট বিক্রি করে, তাহলে সে লাল হয়ে যাবে। এখন তুমি আমার দায়িত্বে। আমার হাত থেকে যদি কেউ তোমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে মহারাজা আমার মাথাটা দেহ থেকে আলাদা করে ফেলবেন। তুমি আমার পাশাপাশি হাঁট।
সায়েকা বডিগার্ডের পাশে চলে আসে। দুজন হাঁটতে শুরু করে। একটু সামনে থেকে সরু গলিপথের শুরু। তারা সে পর্যন্ত চলে যায় এবং সরু পথে হাঁটতে শুরু করে। একটু সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পর গলির মাথা থেকে অন্য একটি পথ বেরিয়ে আরেক দিকে চলে গেছে। বডিগার্ড সায়েকাকে নিয়ে সে পথে এগুতে শুরু করে। কয়েক পা অগ্রসর হওয়ামাত্র তারা কারো ধাবমান পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়, যা পরক্ষণেই হঠাৎ করে থেমে যায়। পেছন দিক থেকে কে যেন ছুটে আসে এবং ডানদিকে চলে যায়। বডিগার্ড একটি গাছের পেছনে একটি ছায়া অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখে ফেলে। সে তরবারী উঁচু করে গাছটার দিকে ছুটে যায়। অমনি পেছন থেকে সায়েকার ক্ষীণ একটা চীৎকার কানে আসে তার। কে যেন সায়েকার গায়ের উপর একটা বস্তা ছুঁড়ে মেরে ঝাঁপটে ধরে। তার মুখে কাপড় গুঁজে দেয় আগেই। বডিগার্ড অন্ধকারের মধ্যে শুধু এটুকু দেখতে পায়, যে জায়গাটায় সায়েকা একাকী ছিল, এখন সেখানে দুটি ছায়া ধস্তাধস্তি করছে।
বডিগার্ড সেদিকে ছুটে যেতে উদ্যত হয়। এমন সময় পেছন দিক থেকে কে একজন তাকে ঝাঁপটে ধরে। তার মুখেও কাপড় গুঁজে দেয়া হয় এবং চাটাইয়ের ন্যায় মোটা একটা কাপড় দ্বারা তাকে পেঁচিয়ে ফেলা হয়। বডিগার্ড স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী যোদ্ধা। কিন্তু তারা সংখ্যায় অধিক এবং একেকজন শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ।
সায়েকাকে বস্তায় ভরে বস্তার মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়। এদিকে বডিগার্ডও বস্তাবন্দী। লোকগুলো তাদেরকে তুলে নিয়ে রওনা হয়ে পড়ে।
কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর বস্তা দুটি পিঠে তুলে নেয়া হল। অন্ধকারের মধ্যে পাশ দিয়ে অতিক্রমকারীদেরও বুঝবার উপায় নেই যে, দুজন মানুষকে অপহরণ করে বস্তায় ভরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারা একটি অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়ে এবং কিছুদূর অগ্রসর হয়ে একটি অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করে।
ঘরে ঢুকে তারা সায়েকাকে এক কক্ষে এবং বডিগার্ডকে আরেক কক্ষে নিয়ে যায়। আলাদা আলাদা কক্ষে বস্তার মুখ খুলে দেয়া হয়। সায়েকা বস্তা থেকে বেরিয়ে এলে তার মুখের কাপড় বের করে ফেলা হয়। কক্ষে প্রদীপ জ্বলছিল। সায়েকা সামনে দুব্যক্তিকে দেখে চমকে উঠে কম্পিত কণ্ঠে বলল- তোমরা এ পন্থাটা কেন অবলম্বন করেছ?
নিরাপদ পন্থা এটাই ছিল- একজন জবাব দেয়- অন্যথায় কেউ পথে তোমাকে আমাদের সঙ্গে চলতে দেখে ফেলত। তাই তোমাকে লুকিয়ে নিয়ে আসার প্রয়োজন ছিল।
তাহলে আগে আমাকে বিষয়টা বললে না কেন?- সায়েকা জিজ্ঞেস করে আমি তো মনে করেছিলাম, লোকগুলো তোমরা নও, দস্যু এবং আমাকে সত্যি সত্যিই বুঝি অপহরণ করা হচ্ছে।
আমাদের কাজের পন্থা-পদ্ধতি অনেকটা এরূপই হয়ে থাকে। অপর ব্যক্তি বলল।
তোমরা কি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলে যে, লোকটা আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছে? সায়েকা জিজ্ঞেস করে।
তুমি যখন তার সঙ্গে ঘর থেকে বের হও, তখনই আমরা নিশ্চিত হই যে, সাইফুদ্দীনের লোক তোমাকে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছে- একজন বলল- তোমাকে কয়েদখানায় নিয়ে যাওয়াই যদি তার উদ্দেশ্য হত, তাহলে তার জন্য সোজা ও সংক্ষিপ্ত পথ ছিল।
লোকটা কয়েকবার তোমাদের পায়ের শব্দ শুনেছিল- সায়েকা বলল এমন অসাবধান হওয়া ঠিক নয়।
ব্যাপার তা নয়। আসলে অন্ধকারে আমরা তোমাদের দূরত্বের ব্যবধান আন্দাজ করতে পারিনি। তাছাড়া দূর থেকে তোমাদেরকে দেখা যাচ্ছিল না। ফলে অনুসরণ করার জন্য কাছাকাছি থাকতে হয়েছে। তারা বলল।
