কি যে বলেন? আপনার ইশারা বুঝতে কি আমার এখনো বাকী আছে? বডিগার্ড ঠোঁটে শয়তানি হাসি টেনে বলল- সেই ব্যক্তিটি আমিই হব। আজ সন্ধ্যার পরই আমি কয়েকখানায় নিয়ে যাওয়ার নাম করে তাকে জায়গা মতো নিয়ে আসব।
জান তো, কোথায় নিতে হবে?- সাইফুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন- খবরদার! মেয়েটার মনে যেন সন্দেহ না জাগে যে, আমি তাকে অপহরণ করিয়েছি?
আমি সবই বুঝি- বডিগার্ড জবাব দেয়- এ কাজ আমি এই প্রথমবার তো আর করছি না। আমি তাকে আঁকা-বাঁকা পথ ঘুরিয়ে এমন অবস্থায় আপনার নিকট নিয়ে আসব যে, সে মনে করবে একমাত্র আপনিই তার হিতাকাঙ্খী ও আপনজন। তারপর এরূপ পক্ষীদের পিঞ্জিরায় কিভাবে আবদ্ধ করতে হয়, তা আপনিই ভাল জানেন।
সাইফুদ্দীন তার বডিগার্ডের কানে কানে কী যেন বললেন। বডিগার্ডের চোখের তারায় শয়তান পিট পিট হাসতে শুরু করে।
***
রাতের বেলা। কয়েদখানার যে কর্মকর্তা সায়েকার ঘরে গিয়েছিল এবং তাকে সান্ত্বনা দিয়ে খতীবের জন্য কুরআন নিয়ে ফিরে গিয়েছিল, সে ডিউটি করছে। লোকটা সন্ধ্যার পর কারাগারে প্রবেশ করে দিনের দায়িত্বশীলকে বিদায় করে দেয় এবং খতীব ইবনুল মাখদুমের কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এদিক-ওদিক দেখে সে কুরআনখানা খতীবের হাতে দিয়ে বলল- আপনি আপনার মেয়ের ব্যাপারে কোন চিন্তা করবেন না; সে সব দিক থেকেই ভাল এবং নিরাপদ আছে। সে আমার নিকট একটা আবদার রেখেছে; আপনি দুআ করুন, যেন আল্লাহ আমাকে মেয়েটার আবদার পূরণে তাওফীক দান করেন।
কী আবদার করেছে ও? খতীব কৌতূহলী মনে জিজ্ঞেস করেন।
কর্মকর্তা এদিক-ওদিক তাকিয়ে জানালার সঙ্গে মুখ লাগিয়ে বলল পলায়ন, আপনার কি সাহস হয়? আমি আপনাকে সাহায্য করব।
যে কাজের সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি জড়িত, তার জন্য আল্লাহ সাহসও দিয়ে দেন- খতীব বললেন- কিন্তু আমি তো তোমার সাহায্য নিয়ে পালাব না। তার পরিবর্তে আমি এখানে মৃত্যুবরণ করাকেই বরণ করব।
কেন?- জেল কর্মকর্তা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন- আপনি কি আমাকে পাপী মনে করে আমার সাহায্য নিতে অস্বীকার করছেন?
না- খতীব বললেন- বরং আমি তোমার সাহায্য এ কারণে নিতে চাচ্ছি না যে, তুমি নির্দোষ। আমি তো তোমার সহযোগিতায় এখান থেকে পালিয়ে যাব। কিন্তু তুমি পেছনে থেকে যাবে এবং ধরা পড়বে। আমার অপরাধের শাস্তি তোমাকে ভোগ করতে হবে, যা আমার পক্ষে মারাত্মক অন্যায় হবে।
আমিও আপনার সঙ্গে যাব- জেল কর্মকর্তা বললেন- আপনার গত রাতের বক্তব্যে এখান থেকে আমার মন উঠে গেছে। আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজে গিয়ে যোগ দেব। আর যেহেতু আমি কয়েদী নই, সেহেতু আমি সহজেই পালাতে পারব। কিন্তু আপনাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব। এই জগতে আমার কেউ নেই। হৃদয়টা জুড়ে আছে শুধু আগুন। এই আগুন আমাকে নেভাতেই হবে।
হ্যাঁ- খতীব বললেন- এভাবে হলে আমি তোমার সাহায্য নিতে পারি।
আপনার মেয়ে আমাকে বলেছিল, সে নাকি মসুলের শাসনকর্তার নিকট যাবে- কর্মকর্তা বললেন তার নিকট সে আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ লাভের আবেদন জানাবে।
না- খতীব শংকিত হয়ে বললেন- তার সাইফুদ্দীনের মতো শয়তান চরিত্রের লোকটির নিকট যাওয়া উচিত হবে না। তুমি আবার গিয়ে তাকে বলে আস, সে যেন সাইফুদ্দীনের নিকট না যায়।
আমি তো সকাল ছাড়া যেতে পারব না- কর্মকর্তা বললেন।
জেল কর্মকর্তা খতীবের নিকট থেকে চলে যান। খতীব কুরআন শরীফখানায় চুম্বন করেন। তারপর বুকের সঙ্গে লাগিয়ে মনে মনে বললেন এখন আর আমি কারা প্রকোষ্ঠে একা নই। তিনি গেলাফটা খুলে প্রদীপের আলোতে বসে কুরআন খুললেন। পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ এক টুকরো কাগজ বেরিয়ে আসে। সায়েকার লেখা একখানা চিরকুট- আল্লাহ সঙ্গে আছেন- জিনরা আছে- পয়গম্বর সত্য- তার বার্তা শুনুন- ঈমান তাজা আছে।
খতীবের বিমর্ষ মুখে মুচকি হাসির আভা ফুটে ওঠে। তিনি চিরকুটখানা প্রদীপের আগুনে পুড়ে ফেললেন। চিঠির মর্ম তিনি বুঝে ফেলেছেন। পয়গম্বর সত্য দ্বারা উদ্দেশ্য, লোকটা যা বলছে, সত্য বলে মনে হচ্ছে; আপনি তার পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করুন। জিনরা আছে দ্বারা উদ্দেশ্য সায়েকার নিরাপত্তা দানের জন্য লোক আছে। তারা তাকে পাহারা দিচ্ছে।
যে সময়ে খতীব সায়েকার পত্রখানা পুড়ে ফেলার জন্য আগুনে ধরেন, ঠিক সে সময় সায়েকার ঘরে করাঘাত পড়ে। সায়েকা দরজা খুলে দেয়। তার হাতে প্রদীপ। বাইরে দণ্ডায়মান লোকটাকে সে চিনে ফেলে- সাইফুদ্দীনের দেহরক্ষী। সে সাইফুদ্দীনের সঙ্গে সায়েকার সাক্ষাতের সময় সেখানে উপস্থিত ছিল। সে সায়েকাকে বলল- আমি আপনাকে আপনার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য কয়েদখানায় নিয়ে যেতে এসেছি। সাক্ষাতের পর আবার আপনাকে আপনার ঘরে ফিরিয়ে দিয়ে যাব।
সায়েকা প্রস্তুত ছিল। সে বিলম্ব না করে বের হয়ে আসে এবং হাঁটতে শুরু করে। দেহরক্ষী তাকে বলল- পিতার সঙ্গে শুধু কুশল বিনিময় আর ঘরের খোঁজ-খবর বলার অনুমতি থাকবে। আপনাকে কারা প্রকোষ্ঠের জানালা থেকে তিন পা দূরে রাখা হবে। এমন কোন কথা বলবেন না, যা মসুলের শাসনকর্তা গাজী সাইফুদ্দীনের মর্যাদায় আঘাত হানবে।
***
বডিগার্ড সামনে সামনে হাঁটছে। সায়েকা তার দু-তিন পা পেছনে। দুজনই চুপচাপ হাঁটছে। অন্ধকার রাত। অন্ধকারের মধ্য দিয়ে তারা গলির পর গলি অতিক্রম করছে। একটি গলিতে মোড় নিতেই বডিগার্ড হঠাৎ থেমে যায়। সে পেছন দিকে তাকায়। সায়েকা জিজ্ঞেস করে- কী ব্যাপার?
