তার অপরাধ কী? সায়েকা জিজ্ঞেস করে।
বিশ্বাসঘাতকতা। সাইফুদ্দীন জবাব দেন।
তিনি কি আপনার বিরুদ্ধে খৃস্টানদের পক্ষে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন? সায়েকা জিজ্ঞেস করে।
রাষ্ট্রের শত্রু খৃস্টান হোক কিংবা মুসলমান- সাইফুদ্দীন জবাব দেন- তাকে সঙ্গে রেখে রাষ্ট্রের ক্ষতি করা অন্যায়। তোমার পিতা কি সালাহুদ্দীন আইউবীর সমর্থক ছিলেন না?
আমার জানা নেই- সায়েকা জবাব দেয় তবে আমার বিশ্বাস, সালাহুদ্দীন আইউবীকে সমর্থন করা অন্যায় নয়।
এ বিষয়টা তোমার পিতাও বুঝতে পারেননি- সাইফুদ্দীন বললেন- আমি ভেবে অবাক হই, বহু মানুষ সালাহুদ্দীন আইউবীকে ফেরেশতা মনে করে থাকে। অথচ তিনি নারীর ক্ষেত্রে হায়েনা। তিনি দামেস্ক এবং কায়রোয় তার হেরেমকে তোমার ন্যায় শত শত রূপসী মেয়ে দ্বারা পরিপূর্ণ করে রেখেছেন। তিনি তার হেরেমের মেয়েদেরকে তিন-চার মাস পর তার সালারদের হাতে তুলে দেন। তার বাহিনী যেখানেই হামলা করে, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে অসদাচরণ করে। তারা যে কোন বাড়ি-ঘর লুট করে এবং যে কোন মেয়েকে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তোমার ন্যায় সুন্দরী মেয়েরা তার থেকে কখনো রক্ষা পায় না। তোমার ইজ্জতের হেফাজত করা আমার কর্তব্য- তোমাকে আমার ঘরে রেখে হলেও। .
আমাকে আল্লাহই রক্ষা করবেন- সায়েকা বলল- আপনার নিকট আমার আবেদন এটুকু যে, কিছুক্ষণের জন্য হলেও আমাকে আব্বাজানের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দিন।
বিচারক তার শাস্তি ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত অনুমতি দেয়া যাবে না।
শাস্তি কী হবে?
মৃত্যুদণ্ড।
সায়েকার দুচোখ থেকে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। সাইফুদ্দীন মেয়েটাকে আরো আতংকিত করার জন্য বললেন- তবে এই মৃত্যুদণ্ড অত সহজ হবে না যে, তরবারী দ্বারা তার মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। তাকে ধীরে ধীরে কষ্ট দিয়ে মারা হবে। প্রথমে তার চোখ দুটো তুলে ফেলা হবে। তারপর সাড়াশি দ্বারা টেনে টেনে একটা একটা করে দাঁত তুলে ফেলা হবে। তারপর তার হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলো এক এক করে কাটা হবে। তারপরও যদি তিনি না মরেন, তাহলে গায়ের চামড়া তুলে ফেলা হবে।
মেয়েটির গা কাঁপতে শুরু করে। সে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে। চেহারার রং পিতবর্ণ ধারণ করে। সায়েকা কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- আপনি কি তার প্রতি এতটুকু দয়া করতে পারেন না যে, তরবারী দ্বারা এক কোপে মাথাটা কেটে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করবেন? তাকে মৃত্যুদণ্ডই যদি দিতে হয়, স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ করে ফেললেই তো হয়।
তুমি যদি তোমার মূল্যবান যৌবনের প্রতি সদয় হতে পার, তাহলে আমি তোমার পিতার উপর রহম করতে পারি।
সায়েকা সাইফুদ্দীনের প্রতি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালে সাইফুদ্দীন বললেন- পিতার মৃত্যর পর তোমাকে একটা অসহায় ও নিরাশ্রয় মেয়ে হিসেবে জীবনযাপন করতে হবে। তার চেয়ে বরং ভাল, তুমি আমার স্ত্রী হয়ে যাও। তাতে তোমার পিতারও উপকার হবে, তুমিও মসুলের রাণীর মর্যাদা লাভ করবে।
আব্বাজান যদি আমাকে আত্মমর্যাদা শিক্ষা না দিতেন, তাহলে আপনার স্ত্রীত্ব বরণ করে মসুলের রাণী হওয়া একটা বিষয় ছিল। তখন আমি আপনার সঙ্গে একটি রাত অতিবাহিত করে গৌরববোধ করতাম- সায়েকা বলল কিন্তু আমার ইজ্জত রক্ষায় আব্বাজান নিজের জীবন দিতেও কুণ্ঠিত হওয়ার মতো লোক নন। এ সওদা আপনি আব্বাজানের সাথে করুন। আপনি তাকেই জিজ্ঞেস করুন, জল্লাদের হাতে সোপর্দ হওয়া এবং কন্যাকে আমার হাতে তুলে দেয়া এ দুটি বিষয়ের কোটি তোমার পছন্দ? আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, জবাবে আব্বাজান বলবেন, আমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দাও। আমি আপনার সমীপে শুধু এই আবেদন নিয়ে এসেছিলাম যে, অল্প সময়ের জন্য হলেও আমাকে আব্বাজানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দিন। এবার আমি আমার আবেদনের সঙ্গে নতুনভাবে এ কথাটা সংযোগ করছি যে, আপনার এ সওদা আমি প্রত্যাখ্যান করলাম।
তুমি আমার ঘরে আসবে না, এই কি তোমার সিদ্ধান্ত? সাইফুদ্দীন জিজ্ঞেস করেন।
এ আমার অটল সিদ্ধান্ত- সায়েকা জবাব দেয়- আপনি মসুলের অধিপতি। বল প্রযোগ করেই তো আপনি আমাকে আপনার হেরেমে ঢুকিয়ে ফেলতে পারেন।
এমন অন্যায় আমি কখনো করিনি। সাইফুদ্দীন জবাব দেন।
সায়েকা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ নয়- তার আসল উদ্দেশ্য ছিল, কয়েকখানায় তার পিতার সঙ্গে কিরূপ আচরণ হচ্ছে, তা জানা। আর তা সে জেল কর্মকর্তার নিকট থেকে জানতে পেরেছে। তার আশা ছিল, এই কর্মকর্তা তার পিতার পলায়নে সাহায্য করবে। সায়েকা সাইফুদ্দীনকে সালাম করে হাঁটা দেয়। সাইফুদ্দীন তাকে চলে যেতে দেখে বললেন- দাঁড়াও, আমি তোমাকে এ কথা বলতে দেব না যে, মসুলের শাসনকর্তা একটি মেয়ের মনোবসনা পূরণ করেননি। তুমি আজ রাতেই তোমার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবে। এক লোক তোমার ঘরে যাবে। সে তোমাকে সঙ্গে করে কয়েদখানায় নিয়ে যাবে। তুমি যত দীর্ঘ সময় ইচ্ছা পিতার সঙ্গে কথা বলতে পারবে।
সায়েকা সাইফুদ্দীনকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বিদায় নেয়। সাইফুদ্দীনের পেছনে একজন বডিগার্ড দাঁড়িয়ে ছিল। সায়েকা বেরিয়ে গেলে তিনি তাকে বললেন- এই সুদর্শনা পাখিটা পিঞ্জিরায় আসা উচিত। আমি তাকে সন্ত্রস্ত করার জন্য বলেছিলাম, তার পিতাকে কিরূপ নির্যাতন দিয়ে হত্যা করার হবে। কিন্তু মেয়েটা বড় শক্ত ধাতুর মানুষ। আমি তাকে বলেছি, এক ব্যক্তি তোমার ঘরে যাবে। সে তোমাকে কয়েদখানায় নিয়ে যাবে। তুমি কি বিষয়টা বুঝতে পেরেছ?
