এখানে আপনাকে অনেক কষ্ট ভোগ করতে হবে- কর্মকর্তা বললেন তবে আমি আপনার যতটুকু সম্ভব সেবা ও সহযোগিতা করব।
এই জাগতিক ও দৈহিক নির্যাতন আমাকে কোন কষ্ট দিতে পারবে না খতীব বললেন- তুমি আমার কণ্ঠে যে জ্বলন ও প্রতিক্রিয়া অনুভব করেছ, তা ছিল আমার আত্মার কণ্ঠ। দুনিয়ার জাহান্নামে আমি নিশ্চিন্ত। আমার আওয়াজ আল্লাহর আওয়াজ। আমার কোন কষ্ট নেই। তবে আমার একটি চিন্তা আছে, যা আমাকে পেরেশান করছে। আমার একটা যুবতী মেয়ে আছে। মেয়েটা আমার একমাত্র সন্তান। স্ত্রী মারা গেছে বহু বছর আগে। এই মেয়েটির স্বার্থে আমি আর বিয়ে করিনি। আমরা একজন অপরজনের জন্য বেঁচে আছি। মেয়েটা ঘরে একা।
আমি তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করব। কর্মকর্তা বললেন।
প্রত্যেকেরই হেফাজতকারী আল্লাহ– খতীব বললেন- আমি তোমাকে আমার ঘরের ঠিকানা দিচ্ছি। কন্যা সায়েকাকে বলবে, যেন সে অটল থাকে এবং আমার ব্যাপারে কোন চিন্তা না করে। এখানে যদি কুরআন পাঠ করার অনুমতি থাকে, তাহলে তার নিকট থেকে আমার কুরআনটা নিয়ে আসবে।
জেল কর্মকর্তা ভোরেই খতীবের বাড়ি চলে যান এবং তার কন্যাকে সান্ত্বনা দেন যে, পিতার ব্যাপারে কোন চিন্তা করবে না, তিনি ভাল আছেন। কর্মকর্তা সায়েকাকে জানায়, আমি আপনার পিতার দ্বারা অনেক প্রভাবিত হয়েছি। যতটুকু সম্ভব আমি তাকে সাহায্য করব। তবে আমি উপরের আদেশের পরিপন্থী কিছু করতে পারব না। আমি কয়েদখানার একজন নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা। সে সায়েকাকে বলল, মোহতারাম খতীব আপনাকে তাঁর কুরআন শরীফখানা দিতে বলেছেন। সায়েকা কুরআন দেয়ার আগে তার সঙ্গে নানা কথা বলে নিশ্চিত হয় যে, লোকটা আসলেই অন্তর থেকে তার পিতার সহেযাগিতা করতে চাচ্ছে। সায়েকার নিকট লোকটাকে আবেগপ্রবণ বলে মনে হল। কর্মকর্তা যখন বলল, আমি আপনার ও আপনার পিতার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুতি আছি, তখন সায়েকা তাকে বলল, আপনি কি জানেন, আব্বাজানকে কি অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে? আমার মনে হচ্ছে, তথ্য বের করার জন্য সাইফুদ্দীন তার উপর নির্যাতন চালাবে। আপনি কী সহযোগিতা দিয়ে তাকে কয়েকখানা থেকে পালাবার সুযোগ করে দিতে পারেন না? আমরা দুজন মসুল ছেড়ে চলে যাব।– কর্মকর্তা মুচকি হেসে বললেন, আল্লাহর যা ইচ্ছা। আমি আপনার পিতার কণ্ঠে আল্লাহর কণ্ঠ শুনেছি এবং তার চোখে ঈমানের নূর দেখেছি। আল্লাহর আওয়াজ ও ঈমানের নূরকে কোন মানুষ কয়েদখানায় আবদ্ধ করে রাখতে পারে না। সম্ভবত এই আওয়াজ ও নূরকে মুক্ত করার শুভ কর্মটি আল্লাহ পাক আমার জন্য লিখে রেখেছেন এবং তার বিনিময়ে আমার মনের আগুন নির্বাপিত হবে। আমি আপনাকে বলতে পারব না যে, আমি কী করব। বিষয়টা অত্যন্ত গোপনীয়।
আপনি বসুন, আমি আব্বাজানের জন্য কুরআন নিয়ে আসছি- বলেই সায়েকা ভেতরে চলে যায় এবং দীর্ঘ সময় পর ফিরে আসে। তার হাতে এক কপি কুরআন। কুরআন শরীফখানা কর্মকর্তার হাতে দিয়ে সায়েকা বলল আব্বাজানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি নেয়ার জন্য আমি মসুলের শাসনকর্তার নিকট যাচ্ছি।
আচ্ছা যান, আমিও যাচ্ছি। বলে জেল কর্মকর্তা খতীবের ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
***
সায়েকা প্রস্তুত হয়ে সাইফুদ্দীনের দরবারে চলে যায়। তাকে ফটকের বাইরে থামিয়ে দেয়া হল। সাইফুদ্দীন সালাহুদ্দীন আইউবী নন যে, তার সঙ্গে যে কারো সাক্ষাৎ করার অনুমতি থাকবে। সাইফুদ্দীন রাজা। তার রীতি-নীতিও রাজকীয়। তাকে মদপান করতে হয়। হেরেমের জন্য সময় বের করতে হয়, বাইজি নাচের আসর বসাতে হয় এবং এসব করে যেটুকু সময় বাঁচে তা সুলতান আইউবী থেকে রাজত্বকে বাঁচানোর পরিকল্পনা প্রস্তুতির কাজে ব্যয় করেন। জনসাধারণের কোন খোঁজ-খবর তিনি রাখেন না। ক্ষমতালোভীরা জনগণকে ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে শুধু। জনগণের ভাল-মন্দ ও সুখ-দুঃখে তাদের কিছু যায় আসে না। যতটুকু খাবার খেয়ে প্রজারা বেঁচে থেকে তাদের সামনে সেজদাবনত হয়ে থাকবে, ততটুকুর বেশি সুযোগ-সুবিধা তাদের দেয়া হয় না।
সায়েকা সেই প্রজাদেরই একটি মেয়ে। দারোয়ান তাকে জিজ্ঞেস করল- আপনি কে? সায়েকা বলল- আমি মসুলের খতীব ইনবুল মাখদুম কাকবুরীর কন্যা।
অন্যদের ন্যায় দারোয়ানও শুনেছে, খতীব ইবনুল মাখদুম হঠাৎ পাগল হয়ে গেছেন এবং তাকে জেলখানায় আটক করে রাখা হয়েছে। মসুলের সব মানুষই খতীবকে শ্রদ্ধা করে থাকে। তার পাগল হয়ে যাওয়ার কারণে সকলেই মর্মাহত ও অনুতপ্ত। দারোয়ান দরবারের এক কর্মকর্তাকে বলে সায়েকাকে সাইফুদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি নিয়ে দেয়।
সায়েকা সাইফুদ্দীনের নিকট গিয়ে উপস্থিত হয়। মেয়েটির রূপ-যৌবন দেখে সাইফুদ্দীন চমকে ওঠেন। সাইফুদ্দীন নারী-শিকার পুরুষ। তিনি সায়েকাকে স্বস্নেহে নিজের পার্শ্বে বসতে দেন। তিনি বুঝে ফেলেন, মেয়েটা তার পিতার মুক্তির আবেদন নিয়ে এসেছে।
শোন মেয়ে- সাইফুদ্দীন সায়েকার বক্তব্য না শুনেই বললেন- আমি জানি, তুমি কেন এসেছ। কিন্তু আমি বেজায় বাধ্য হয়েই তোমার পিতাকে বন্দী করেছি। দু-একদিন পর ছেড়ে দেয়ার মতো অবস্থা হলে আমি তাকে গ্রেফতারই করতাম না। আমি তাকে মুক্তি দিতে পারব না।
