এক ব্যক্তি আমাকে বলল, যদি খৃস্টানদের থেকে প্রতিশোধ নিতে হয়, তাহলে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে যাও। সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী ফিলিস্তীনকে মুক্ত করার লক্ষ্যে লড়াই করছেন। মুসলমান ও খৃস্টানদের মাঝে যে যুদ্ধ চলছে, তা আমার জানা ছিল। কোন্ যুদ্ধে কারা পরাজিত হচ্ছে, বাইতুল মোকাদ্দেসে বসেই আমি খবর পেতাম। বাইতুল মোকাদ্দাসে যখন খৃস্টানরা সেখানকার মুসলমানদের উপর অত্যাচারের মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দিত, তখনই আমরা বুঝে ফেলতাম, কোন এক ময়দানে খৃস্টানরা পরাজিত হয়েছে, যার প্রতিশোধ তারা এখানকার নিরস্ত্র-নিরীহ মুসলমানদের থেকে গ্রহণ করছে। ওখানে বসে আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর নাম শুনতাম। এ নামটা এতই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, সেখানকার খৃস্টান আদিবাসীরা এ নামে আতংকিত হয়ে উঠে এবং তাকে ঘৃণার সাথে স্মরণ করে। আমরা এও শুনেছি যে, সালাহুদ্দীন আইউবী বানের ন্যায় ধেয়ে আসছেন। কিন্তু তিনি আসলেন না। তার পরিবর্তে উল্টো আমিই বুকে গভীর একটা জখম নিয়ে এখানে চলে এসেছি। আমি সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে গেলাম। কিন্তু যুদ্ধের জন্য ময়দানে না পাঠিয়ে আমাকে এই জেলখানার দায়িত্ব দেয়া হয়। ইতোমধ্যে আমি প্রমোশনও পেয়েছি।
এখানে আমি মানুষের উপর জুলুম দেখেছি। জুলুম দেখে দেখে আমি কেঁপে উঠি। এখানে মানুষের হাড়গোড় ভেঙ্গে ফেলা হয়। বাইতুল মোকাদ্দাসে খৃস্টানরা মুসলমানদের উপর অত্যাচার করে থাকে। এখানে আমি মুসলমানদেরকে মুসলমানের উপর জুলুম করতে দেখেছি। আমি জানতে পেরেছি, এখানে নির্দোষ লোকদেরও আনা হয় এবং অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়। তাদের অপরাধও তা, যা আপনার অপরাধ। আপনাকে এখানে এনে কেন আটক রাখা হল, আমি বুঝে ফেলেছি। এ কাজটা আমাকেও করতে হয়েছে। আমি মানুষকে এমন এমন কষ্ট দিয়েছি, যার বিবরণ দিলে আপনি বেশ হয়ে যাবেন। আমার সঙ্গীরা পুরোপুরি হিংস্র হায়েনায় পরিণত হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে মানবতা শুধু এটুকু অবশিষ্ট আছে যে, তারা মানুষের ন্যায় চলাফেরা করে ও মানুষের মত কথা বলে। তাদের থেকে আমার পার্থক্য হল, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে কয়েদীদের সঙ্গে সমবেদনার দুচারটা কথা বলি, তাদের দুঃখ বুঝবার চেষ্টা করি। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করি, তোমাদের অপরাধ কী? কিন্তু সমবেদনার এই জযবা আমার হৃদয়ের বোঝা হাল্কা করার পরিবর্তে আরো ভারী করে তুলছে। আমি এক মুহূর্তের জন্যও মনে শান্তি পাই না। আমি আল্লাহকে দেখি না। আমার চোখের সামনে থেকে আমার বোনরা সরছে না। মনে হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি খৃস্টানদের থেকে প্রতিশোধ না নেব, ততক্ষণ এভাবে আমাকে অস্থিরতার মধ্যেই কাটাতে হবে।
আজ আমি আপনার কণ্ঠে কুরআনের ঘোষণা শুনেছি
পাপিষ্ঠদেরকে তাদের চেহারা দেখেই চিনে নেয়া হবে। তারপর পা ও মাথার খুঁটি ধরে তাদের পাকড়াও করা হবে। তোমরা তোমাদের রবের কোন্ কোন্ নেয়ামতকে অস্বীকার করবে? এটাই সেই জাহান্নাম, পাপিষ্ঠরা যাকে অবিশ্বাস করত। তারা জাহান্নামের অগ্নি ও টগবগে গরম পানির মাঝে ছুটাছুটি করবে।
আপনার কণ্ঠে জীবনে এই প্রথমবার কুরআনের অমোঘ ঘোষণা শুনে আমার মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। আমার মনে হতে লাগল, আমি যে সত্যের সন্ধানে ঘুরে ফিরছি, তা এই কটি শব্দের মধ্যেই লুকায়িত আছে।
জেল কর্মকর্তা জানালার ফাঁক দিয়ে একটা হাত ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে খতীব ইবনুল মাখদুমের পরনের চোগা ধরে ফেলে এবং অস্থির চিত্তে বলে ওঠে বলুন, এ আপনি আমাকে কী শোনালেন। বলুন, আমার মস্তিষ্কে কি খুন চেপেছে? তা-ই যদি হয়, বলুন, আমি কিভাবে প্রতিশোধ নেব? আমি পাগল হয়ে যাব না তো? আল্লাহ যদি সত্যিই থাকেন, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করে আমাকে বলুন, আমার প্রশ্নগুলোর জবাব কী?
তোমার মস্তিষ্কে খুন চেপেছে- খতীব বললেন- তুমি আল্লাহর আওয়াজ শুনে ফেলেছ। আমার কণ্ঠে আল্লাহই কথা বলছিলেন। তুমি প্রতিশোধ নিতে অস্থির হয়ে পড়েছ। কিন্তু এখানে তোমাকে এভাবে বেহাল ও বেচাইন হয়েই থাকতে হবে। তুমি যে ফৌজের কর্মকর্তা, তারা কখনো বাইতুল মোকাদ্দাস যাবে না।
কেন?
কারণ, এ ফৌজ প্রথমে সুলতান আইউবীকে পরাজিত করবে- খতীব জবাব দেন। তারপর তাকে হত্যা করবে। তারপর খৃষ্টানদের ক্রীড়নকে পরিণত হবে।
জেল কর্মকর্তার চোখ খুলতে শুরু করেছে। খতীব তাকে বললেন- মুসলিম শাসকরা কী করছে, তা কি তুমি জান?
কর্মকর্তা বললেন- আমি বেশ কদিন ধরেই এ জাতীয় কথাবার্তা শুনছি। কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। জাতির যে মেয়েগুলো খৃস্টানদের বর্বরতার শিকার হয়েছে, আমাদের শাসকরা তাদের কথা ভুলে যাবে, আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না।
তারা ভুলে গেছে- খতীব বললেন- তারা এ কথাও ভুলে গেছে, সেই অপহৃত মুসলিম মেয়েদেরকেই যে তাদেরকে উপহার দেয়া হয় এবং তাদেরকে নিজেদের হেরেমের শোভা বানায়। তারা এ কারণেই সালাহুদ্দীন আইউবীর দুশমনে পরিণত হয়েছে। কারণ, তিনি কুরআনের বিধান অনুসরণ করে চলেন এবং জাতির মর্যাদা রক্ষা করতে চান। তার কোন বাড়ি-ঘর আছে কিনা, তাও তিনি ভুলে গেছেন। জীবনটা কাটছে তার পাহাড়-জঙ্গল আর মরুভূমি ও উপত্যকায়- জিহাদের ময়দানে। আমার অপরাধও এটাই যে, আমি মসুলের শাসনকর্তাকে কুরআনের বিধান স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে বলেছিলাম, একজন মর্দে মুজাহিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে তুমি পরাজিত হবে। কুরআনের যে পবিত্র বাক্যগুলো একটু আগে তোমাকে জাদুর ন্যায় প্রভাবিত করেছে, সাইফুদ্দীনকে আমি তা-ই স্মরণ করিয়েছিলাম। আমি তাকে বলেছিলাম, তোমার ন্যায় পাপিষ্ঠদের চেহারা দেখে চিহ্নিত করা হবে এবং মাথার ঝুঁটি ও পায়ে ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তাকে আমি কুরআনের বিধানও শুনিয়েছি যে, তুমি যদি মস্তিষ্ক থেকে রাজত্বের নেশা দূর না কর, তাহলে তুমি জাহান্নামের অগ্নি ও টগবগে ফুটন্ত পানির মাঝে ছুটাছুটি করবে। কিন্তু সে আল্লাহর বিধান মান্য করতে অস্বীকার করে প্রবৃত্তির কথা মান্য করল এবং সত্য বলার অপরাধে আমাকে গ্রেফতার করে বন্দী করে রাখল।
