জেরুজালেম জয় করাকে যদি তুমি ঈমান মনে করে থাক, তাহলে শীঘ্রই তুমি সেখানে পৌঁছে যাবে- খতীব বললেন- প্রতিশোধ ব্যক্তিগত কাজ। ঈমান আল্লাহর নির্দেশ। আচ্ছা, তুমি কিসের প্রতিশোধ নেয়ার কথা বলছ? আর জেরুজালেম বলছ কেন?- বাইতুল মুকাদ্দাস বল।
আমি এর আগে কখনো কোন কয়েদীর সঙ্গে এরূপ কথা-বার্তা বলিনি জেল কর্মকর্তা বললেন- আপনি খতীব। আমি আমার হৃদয়টা খুলে আপনার সম্মুখে রাখতে চাই। আমার আত্মার প্রশান্তি প্রয়োজন। আমি বাইতুল মোকাদ্দাসের বাসিন্দা। ওখানে খৃষ্টানদের শাসন চলছে। ওখানে মুসলমানদের সঙ্গে বকরী-ভেড্রা ও পশুর ন্যায় আচরণ করা হয়। খৃষ্টানরা যে মুসলমানকে ইচ্ছা খুন করে, যাকে খুশি কারাগারে নিক্ষেপ করে। বেগার খাটানোর প্রচলন তো ব্যাপক। যে পরিবারে যুবতী মেয়ে আছে, সে পরিবারের মুখ সব সময় ও থাকে। ওখানকার মুসলমানরা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর পথপানে তাকিয়ে আছে। সাত বছর আগের ঘটনা। একদিন এক খৃষ্টান আমাকে ধরে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। কিছু মালপত্র মাথায় করে তার ঘরে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসতে বলে। কিন্তু আমি অস্বীকার করি। সে আমার মুখের উপর প্রচন্ড একটা চপেটাঘাত করে বলল, হারামজাদা! মুসলমান হয়ে আমার আদেশ অমান্য করার দুঃসাহস দেখাচ্ছিস! আমি রাগের মাথায় তার মুখে একটা ঘুষি মারি। লোকটা মাটিতে পড়ে যায়। আমি তার মাথার চুলগুলো মুঠি করে ধরে টেনে দাঁড় করাই এবং আরেকটি ঘুষি মেরে আবারো ফেলে দেই।
এমন সময়ে পিছন থেকে কে যেন আমাকে ঝাঁপটে ধরে। পরক্ষণেই চারদিকে খৃষ্টানরা এসে ভীড় জমায়। সংবাদ পেয়ে পুলিশও ধেয়ে আসে এবং আমাকে বেগার ক্যাম্পে নিয়ে যায়। আমি সেখানে তিনদিন অতিবাহিত করি। তৃতীয় রাতে আমি এক সান্ত্রীকে পিছন থেকে ঝাঁপটে ধরে খঞ্জরের আঘাতে তাকে কাবু করে পালিয়ে যাই। পরিকল্পনা ছিল, ঘরে পৌঁছে রাতেই পরিবারের সকলকে নিয়ে বাইতুল মোকাদ্দাস থেকে পালিয়ে যাব। অন্যথায় ধরা পড়ে যাওয়ার আশংকা প্রবল। কিন্তু ততক্ষণে আমার বাড়ীটা ধ্বংসস্তূপ। সব জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে আছে। আমি এক মুসলিম পরিবারের দরজায় করাঘাত করি। গৃহকর্তা ভয়ে ভয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমার পরিবারের লোকজন কোথায়? আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে তিনি আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে ফেললেন। তিনি বললেন- তোমার পরিবারের পুরুষদেরকে খৃষ্টানরা ধরে নিয়ে গেছে। তোমার দুকুমারী বোনকে খৃষ্টান সেনারা নিয়ে গেছে। শেষে তারা আগুন দিয়ে ঘরটাকে জ্বলিয়ে দিয়ে গেছে।
তখন আমার মানসিক অবস্থা কী দাঁড়িয়েছিল, আপনি তা আন্দাজ করতে পারবেন। আমি জানতাম, আমি আমার বোনদেরকে ফিরে পাব না এবং এখানে বেশী সময় অবস্থান করলে আমি ধরা পড়ে যাব এবং খৃষ্টানরা আমাকে মেরে ফেলবে বা কয়েদখানায় আটক করে রেখে আজীবন নির্যাতন চালাতে থাকবে। কোন মুসলিম পরিবারের ঘরে লুকাবার মত ভুলও আমি করতে পারছিলাম না। কেননা, তার পরিণতিতে সেই পরিবারটা ধ্বংস হয়ে যেত। তাই আমি রাতেই বাইতুল মোকাদ্দাস থেকে বেরিয়ে আসি। আমার জখম থেকে রক্ষক্ষরণ হচ্ছিল। কিন্তু আমি নিরুপায়। ভোর বেলা পথে এক অশ্বারোহী খৃষ্টানের সঙ্গে দেখা। লোকটা সাধারণ নাগরিক। আমি তার পথ আগলে দাঁড়াই এবং কথার ফাঁদে ফেলে তাকে ঘোড়র পিঠ থেকে নীচে নামাই। তার এক পা ঘোড়ার রেকাবে, অপর পা মাটিতে- এমন অবস্থায় আমি পেছন দিক থেকে তার ঘাড়টা দুবাহু দ্বারা ঝাঁপটে ধরি। তার কোমরে ছোট আকারের একটি তরবারী বাঁধা ছিল। সেটি কেড়ে নিয়ে আমি তাকে খুন করি এবং তার ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত অগ্রসর হতে শুরু করি।
এ নিয়ে আমি দুজন খৃষ্টানকে হত্যা করলাম। তার আগে কয়েদখানায় সান্ত্রীকে হত্যা করে এসেছি। কিন্তু আমার মন শান্ত হল না। আমি সকল খৃষ্টানকে হত্যা করার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। এ অবস্থায় আমি কত সময় পথ চললাম এবং কোথায় কোথায় ঘুরে ফিরলাম, তা আমার স্মরণ নেই। এত দীর্ঘ সময়ে না আমার পেটে ক্ষুধা লাগল, না পিপাসা। একটু পরপর আমার বোনদের কথা মনে পড়ত আর আমি তারবারীটা হাতে নিয়ে বাইতুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে তাকিয়ে থাকতাম। আমার গা কাঁপতে শুরু করত। আমি বেশ কবার আল্লাহকে ডেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া আল্লাহ! তুমি আমাকে কোন্ পাপের শাস্তি দিচ্ছ? যদি আমি গুনাহগার হয়ে থাকি, তাহলে শাস্তি তো শুধু আমার পাওয়া দরকার। বোন এবং অবুঝ ভাইটির তো কোন পাপ ছিল না। কিন্তু আল্লাহ আমাকে কোন উত্তর দিলেন না। আমি সেজদাবনত হয়ে আল্লাহকে ডেকেছি এবং নিরাশ হয়েছি। আমি আল্লাহর সমীপে এ ফরিয়াদও করেছি যে, তুমি আমাকে শান্ত করে দাও এবং আমার অন্তরের প্রতিশোধের আগুন নিভিয়ে দাও। আমার অনুভূতি মরে যাক।
আমি মসুলের এমন একটি জায়গায় এসে পৌঁছে গেলাম, যেখানে আর খৃষ্টানদের হাতে ধরা পড়ার আশংকা রইল না। কিন্তু একটি নির্দয় হাত আমার হৃদয়টাকে এমনভাবে চেপে ধরে রাখল যে, আমি প্রতি মুহূর্ত অস্থিরতার মধ্যদিয়ে অতিবাহিত করতে বাধ্য হই। আমি মসজিদে চলে গেলাম। ইমাম সাহেবকে বললাম, খোদা কোথায় আমাকে দেখিয়ে দিন। বলুন, আমার অন্তর কোথায় শান্তি পাবে। কিন্তু তিনি আমার কোন সাহায্য করলেন না। সেখান থেকে আমি অন্য এক গ্রামে চলে গেলাম। তারপর সেখান থেকেও চলে গেলাম। তারপর এক এক করে ইমামদের নিকট আমার প্রশান্তি ভিক্ষা করতে থাকি। কিন্তু কেউই আমাকে সাহায্য করল না। কেউ আমাকে আল্লাহর সন্ধান দিল না। কেউ এমন কোন বুদ্ধি আমাকে বলল না, যার বলে আমি আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারি এবং তার নিকট শান্তি প্রার্থনা করতে পারি। আমি অধিকাংশ রাতে বোনদেরকে স্বপ্নে দেখতাম। দেখতাম, তারা কাঁদছে। জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত আমি তাদের ফোঁপানি ও হিচকি শুনতে পেতাম। আমার মনে অনুভূতি জাগে যে, বোনরা আমাকে অভিশম্পাত করছে।
