কয়েদখানায় তার সঙ্গে কিরূপ আচরণ করা হচ্ছে, তা জানব কী করে? সায়েকা জিজ্ঞেস করে।
আমরা চেষ্টা করব- অপর মেয়ে বলল- তুমি মসুলের শাসনকর্তার নিকট গিয়ে পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আবেদন জানাও। তিনি যদি অনুমতি না দেন, তাহলে অন্য ব্যবস্থা নেব।
আমি কাল সকালেই যাব- সায়েকা বলল- আমি তাকে একথাও জিজ্ঞেস করব, আমার পিতার অপরাধ কী?
মেয়েরা চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। হঠাৎ তাদের মনে পড়ে যায়, সায়েকা ঘরে একা। তারা সায়েকাকে বলল, রাতে তুমি আমাদের সঙ্গে থাক। কিন্তু সায়েকার মনে কোন ভয় নেই। তবু মেয়েরা নিজ নিজ পরিবারের নিকট বলে সায়েকার ঘরে ঘুমাতে আসে।
শীতকাল। তিনজন এক কক্ষে শুয়ে পড়ে। মধ্যরাতের পর এক মেয়ে বাথরুমে যাওয়ার জন্য বাইরে বের হয়। সে দেখতে পায়, ঘরের বাইরে কালোমত একটি ছায়া নড়াচড়া করতে করতে কোন দিকে যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। মেয়েটির গা ছমছম করে ওঠে। সে দ্রুত ঘরে ফিরে গিয়ে বান্ধবীকে জাগিয়ে তোলে এবং ঘটনাটা জানায়। তাদের দুজনেরই কাছে খঞ্জর ছিল। তারা কক্ষ থেকে বের হয়ে বারান্দায় এসে এদিক-ওদিক তাকায়। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না।
তারা সায়েকাকে জাগায়নি। কিন্তু সায়েকার চোখ খুলে গেছে। বিছানা থেকে উঠে বান্ধবীদেরকে কক্ষে না পেয়ে বারান্দায়, গিয়ে ডাক দেয়। তারা এগিয়ে এসে বলে, এই, বাইরে কালোমত একটি ছায়া নড়াচড়া করছে! মানুষ টানুষ কিনা কে জানে।
ধুত্তুরি, আস তো শুয়ে থাকি- সায়েকা বলল- ওসব কিছু না। তুমি যখনই বের হবে, এরকম কিছু নড়াচড়া করতে দেখবে। দৌড়ে গিয়ে ছায়াকে খঞ্জর দ্বারা আঘাত কর না আবার।
ছায়া বলছ কেন?- এক মেয়ে বলল- ওটা তো মানুষ। আমি দেখেছি।
যা হয় হোক, ওসব আমি ভয় করিনা- সায়েকা বলল- তোমরাও ভয় করনা।
সায়েকার এসব কথায় মেয়ে দুটোর গা ছমছম করে ওঠে। গায়ের নোম দাঁড়িয়ে যায়। তারা মানুষকে ভয় করে না। সায়েকার কথা অনুযায়ী যদি ওটা মানুষ না হয়, তাহলে জিন-ভূত তো নিশ্চয়। সায়েকা বলল- এটা আমার আব্বাজানের ছায়া। তোমরা তাদেরকে জিন-ই মনে কর। আমি কখনো তাদের কাছে যাইনি। আমার বিশ্বাস, তারা আমার নিরাপত্তার জন্য ঘরের চারপাশে ঘোরা-ফেরা করছে।
খতীব সাহেব বড় বুজুর্গ মানুষ- এক মেয়ে বলল- জিনদের মধ্যেও তার ভক্ত আছে।
ব্যাপারটা এমনই- সায়েকা বলল- ওদেরকে ভয়ও করনা, ওদের কাছেও যেও না।
***
সেই রাত। খতীব ইবনুল মাখদুম সাইফুদ্দীনের বন্দীশালায় আবদ্ধ। তিনি এখনো জানে না, তাঁর সঙ্গে কিরূপ আচরণ করা হবে। এক সান্ত্রী তাঁর কক্ষের সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করে। খতীব তাকে থামিয়ে বললেন- আমার এক কপি কুরআন প্রয়োজন। জেলখানায় কুরআন শরীফ আছে নিশ্চয়।
এখানে? …কুরআন?- সান্ত্রী বিস্ময় ও অবজ্ঞার সুরে বলল- কুরআন পাঠকারীরা এখানে আসে না। এটা জাহান্নাম। এখানে আসে পাপিষ্ঠরা। আপনি ঘুমিয়ে থাকুন।
সান্ত্রী হেঁটে সামনের দিকে চলে যায়।
খতীব কুরআনের হাফেজ ছিলেন না। তবে অনেক সূরা ও আয়াত মুখস্ত ছিল। তিনি উচ্চস্বরে সূরা আর-রাহমান তেলাওয়াত শুরু করলেন। খতীবের সুললিত কণ্ঠ গোটা কয়েদখানাকে মাতিয়ে তোলে। তেলাওয়াত শেষ করার পর তিনি দেখলেন, উর্দি পরিহিত এক জেল কর্মকর্তা বিমুগ্ধ মুখে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে।
তুমি কে?- কর্মকর্তা খতীবকে জিজ্ঞেস করলেন- আমি ছয় বছর যাবত এই জেলখানায় চাকরি করছি। কিন্তু কুরআন তেলাওয়াত এবং এই সুর এই প্রথমবার শুনলাম, যা আমার হৃদয়ে গেঁধে গেছে। আমি কুরআন পড়া জানি না। অথচ, এটি আমার মাতৃভাষায় লেখা গ্রন্থ।
আমি মসুলের খতীব। খতীব জবাব দেন।
আপনার অপরাধ? কর্মকর্তা বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করেন।
আমার অপরাধ হল, আমি কুরআনের ভাষায় কথা বলি- খতীব জবাব দেন- আমার অপরাধ, আমি আমার রাজার আদেশ অমান্য করেছি এবং কুরআনের বিধানকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।
আবার পড়ুন- কর্মকর্তা অনুরোধের সুরে বললেন- আমার ভিতরে কিছু বিষ আছে, কুরআনের ভাষা ও আপনার সুর যাকে বের করতে শুরু করেছে।
খতীব পূর্বের চেয়ে অধিক হৃদয়কাড়া সুরে আবারো সূরা আর-রাহমান তেলাওয়াত শুরু করেন। কর্মকর্তা কক্ষের জানালার পার্শ্বে দাঁড়িয়ে আছেন। তার দুচোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তেলাওয়াত শেষে খতীব থামলে কর্মমর্তা চক্ষু বন্ধ করে ভাঙ্গা গলায় ক্ষীণ কণ্ঠে সূরা আর-রহমানের দুএকটি আয়াত আবৃত্তি করতে শুরু করেন।
আপনার কণ্ঠে যখন এত যাদু, তো আপনার ভক্তদের মধ্যে জিনও আছে নিশ্চয়- কর্মকর্তা বললেন- আমি আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। আমি শুনেছি, কুরআন থেকে নাকি ফাল বের করা যায়। বিশেষ পন্থা অবলম্বন করে প্রশ্ন করলে নাকি জিনরা কুরআনের ভাষায় জবাব দেয়?
কিন্তু প্রশ্ন হল, তোমার প্রশ্নটা কী?- খতীব বললেন- কুরআন শুধু ঈমানদারদেরকে সুসংবাদ শুনিয়ে থাকে।
আর যার ঈমান পাকা নয়? কর্মকর্তা প্রশ্ন করেন।
তার বক্ষে ঈমানের প্রদীপকে আলোকিত করে- খতীব বললেন- তোমার প্রশ্নটা বল।
আমার একটি আকাংখা আছে- কর্মকর্তা বললেন আমার বুকে আগুন জ্বলছে। জানি না, এটা ঈমানের দীপশিখা, নাকি প্রতিশোধের আগুন। যে ফৌজ জেরুজালেম উদ্ধার করতে মাঠে নেমেছে, আমি সে ফৌজে যোগ দিতে চাই। আমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে।
