তোমরা যদি এতই পাকা মুসলমান হতে, তাহলে হিন্দুস্তানকে হিন্দুদের হাতে তুলে দিয়ে নুরুদ্দীন জঙ্গীর নিকট পালিয়ে আসতে না- গোমস্তগীন অবজ্ঞার সুরে বললেন- তোমরা গোলাম দেশ থেকে এসেছ।
হিন্দুস্তানকে হিন্দুদের হাতে আমরা তুলে দেইনি- শাদবখত বললেন ওখানেও তোমাদের মত কিছু মুসলমান ছিল, যারা হিন্দুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পেতেছিল এবং তোমাদের-ই ন্যায় রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল। রাজত্বের নেশা তাদেরকে পেয়ে বসেছিল। সে সুযোগে হিন্দুরা মুসলমানদের পরাজিত করে হিন্দুস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিয়েছিল। দেশের ভাগ্য যদি সেনা অধিনায়কদের হাতে থাকত, তাহলে আজ হিন্দুস্তান আরবের ভূখন্ডের সঙ্গে মিলিত থাকত। কিন্তু সেখানে সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রনায়করা নিজেদের গোলাম বানিয়ে নিয়েছিল।
ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আমি তোমাদেরকে আরো দুদিন সময় দিলাম- গোমস্তগীন বললেন- আমার প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব যদি পেয়ে যাই, তাহলে এই নরক থেকে বের করে আমি তোমাদেরকে তোমাদের ঘরে নজরবন্দী করে রাখব। তবে যদি আমাকে নিরাশ কর, তাহলে তোমাদেরকে আমি মৃত্যুদন্ড দেব। তোমরা এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পঁচে-গলে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তোমরা ভেবে দেখ।
***
গোমস্তগীন তার দুর্গে খৃষ্টান উপদেষ্টা নিয়োজিত রেখেছিলেন। তাদেরকে জানালেন, তাদের যে বন্ধু খুন হয়েছে, সে কারো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়নি। বরং সে হেরেমের একটি মেয়ের হাতে খুন হয়েছে। গোমস্তগীন তাকে অবহিত করেন, আমি কাজী ইবনুল খাশিবের খুন ও বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে আমার দুজন সালারকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করেছি। তিনি উপদেষ্টার নিকট থেকে পরামর্শ কামনা করেন, সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে এখনই অভিযান পরিচালনা করব কিনা।
আমি জানি না সালারদ্বয় কি কি তথ্য সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট সরবরাহ করেছে- গোমস্তগীন বললেন- প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক প্রস্তুতি নেয়ার আগেই আমাদের হামলা করা উচিত। এ পরিস্থিতিতে আমাকে আপনাদের সহযোগিতার প্রয়োজন হবে।
খৃষ্টান উপদেষ্টাগণ গোমস্তগীনকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে বলল, আজ রাত-ই আমরা খৃষ্টান ক্যাম্পে লোক পাঠাব।
সে রাতেই এক খৃষ্টান দূত রওনা হয়ে যায়।
মসুলে খতীব ইবনুল মাখদুম কয়েদখানার একটি প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ। তার যুবতী কন্যা- যার নাম সায়েকা- ঘরে একাকী পড়ে আছে। মহিলারা দিনভর তার নিকট আসা-যাওয়া করছে আর সে সবাইকে বলছে- এমনটা হওয়ার-ই কথা। কিন্তু কথাটার অর্থ কী, মহিলারা গভীরভাবে ভেবে দেখার প্রয়োজন অনুভব করেনি। তবে দুটি যুবতী মেয়ে বিষয়টা লক্ষ্য করে। তাদের মনে সন্দেহ জাগে।
রাতের বেলা। সায়েকার ঘরে আর কেউ নেই। মেয়ে দুটো ঘরে প্রবেশ করে। সায়েকা তাদেরকে ভালভাবে চিনে না।
আচ্ছা, সারাক্ষণ তুমি একথা কী বলছ যে, এমনটা হওয়ারই কথা? এক মেয়ে বলল।
আল্লাহর সিদ্ধান্ত এমনই ছিল- সায়েকা জবাব দেয়- আমি এ ছাড়া আর কী বলতে পারি?
কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করে। শেষে অপর মেয়ে বলল- তুমি কথাটার মর্ম বুঝিয়ে বল, দেখি, আমরা তোমার কোন উপকার করতে পারি কিনা।
আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ আমার সাহায্য করতে পারবে না- সায়েকা বলল- আব্বাজান কোন অন্যায় করেননি। তিনি সব সময় সত্য কথা বলে থাকেন। সম্ভবত তিনি মসুলের শাসনকর্তাকে কোন কড়া কথা শুনিয়েছেন। সেজন্যই আমি বলছি, এমনটা হওয়ারই কথা। কেননা, তিনি তোষামোদ করবার মত মানুষ নন।
তিনি আসলে কী বলেছেন বা কী করেছেন, আল্লাহ-ই ভাল জানেন- অপর মেয়ে বলল- আমার মনে হচ্ছে, তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর পক্ষে কথা বলেছেন। তবে তিনি আসলে কার সমর্থক, তুমি-ই ভাল জান।
তোমরা যাকে সত্য মনে কর, তিনি তার সমর্থক- সায়েকা মুচকি হেসে বলল এবং জিজ্ঞেস করল- তোমরা কাকে সমর্থন কর?
সালাহুদ্দীন আইউবীর! উভয় মেয়ে বলল।
আব্বাজানও আইউবীর সমর্থক- সায়েকা স্পষ্ট বলে দিল- বিষয়টা সম্ভবত সাইফুদ্দীন জেনে ফেলেছেন।
তিনি কি আইউবীকে শুধু মৌখিকভাবে সমর্থন করেছেন, নাকি কাজেও এক মেয়ে জিজ্ঞেস করে।
আচ্ছা, তোমরা কি গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছ?- সায়েকা হঠাৎ চমকে উঠে জিজ্ঞেস করে- মসুলের তরুণ প্রাণগুলোকে কি কাফেরদের পক্ষে চলে গেল?
হ্যাঁ- এক মেয়ে জবাব দেয়- আমরা দুজনে গুপ্তচরবৃত্তি করতে এবং তোমাকে এই নিশ্চয়তা দিতে এসেছি যে, মসুলের যুবকরা কাফেরদের সমর্থক নয়। তারা কাফেরদের পদতল থেকে আরবের মাটিকে উদ্ধার করার জন্য অস্থির। তারা তাদের মিশনে সফল হতে বদ্ধপরিকর। তুমি যে বলতে, এমনটা হওয়ারই কথা ছিল- একথার অর্থ আমরা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারেনি। এথেকেই তুমি আমাদেরকে আন্দাজ করে নিতে পার। আমরা তোমার কথা থেকেই বুঝে ফেলেছি, তোমার পিতা সালাহুদ্দীন আইউবীর সমর্থক ছিলেন এবং সাইফুদ্দীন বিষয়টা জেনে ফেলেছেন।
দীর্ঘ আলাপ ও মতবিনিময়ের পর সায়েকা নিশ্চিত হয়, মেয়ে দুটো তাকে ধোঁকা দিচ্ছে না। সে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে, আমি কী করতে পারি এবং তোমরা আমার কী সহযোগিতা করবে?
প্রথমে জানতে হবে, মোহতারাম খতীবকে কয়েদখানায় কষ্ট দেয়া হচ্ছে কিনা- এক মেয়ে বলল- যদি তিনি নির্যাতনের সম্মুখীন হয়ে থাকেন, তাহলে তাকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে।
