সংবাদটা শহরময় ঘুরেফিরে খতীবের বাসগৃহের দরজায় গিয়ে আছড়ে পড়ে। ঘরে আছে খতীবের ষোড়শী এক কন্যা। ঘরে পিতা-কন্যা দুজনই বাস করতেন। মেয়েটা খতীবের একমাত্র সন্তান। তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। তিনি পরে আর বিয়ে করেননি। এভাবেই বাকী জীবন কাটিয়ে দেবেন বলে তিনি মনস্থির করেছিলেন।
আশ-পাশের বহু মহিলা খতীবের ঘরে এসে ভীড় জমায়। পরিবারটা সকলের শ্রদ্ধাভাজন। মহিলারা খতীবের কন্যার নিকট জানতে চায়, তোমার পিতার হঠাৎ করে কী হয়ে গেল? তিনি কি সত্যই পাগল হয়ে গেছেন?
এমন হওয়ারই কথা ছিল- মেয়ে বলল- এমনটা হওয়ারই কথা ছিল। তার কণ্ঠে গাম্ভীর্য। ভয়-ভীতির লেশ মাত্র নেই। যত মহিলা তার ঘরে এসেছে, প্রত্যেককে সে একই জবাব দিয়েছে- এমনটা হওয়ারই কথা ছিল।
***
মসুলে খতীবকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করা হয়েছে। হাররানে দুসেনা অধিনায়ক শামসুদ্দীন ও শাদবখতকে গোমস্তগীন বন্দী করে রেখেছেন। গোমস্তগীন এই প্রথমবার জানতে পারলেন যে, তার এই দুসালার মূলত সালাহুদ্দীন আইউবীর লোক এবং গোয়েন্দা। দুজন আটক হওয়ার পর গোমস্তগীন রাতে কয়েদখানায় যান এবং তাদেরকে ওখান থেকে বের করে সে কক্ষে নিয়ে যান, যেখানে আসামীদের মুখ থেকে তথ্য বের করার সব ধরনের ব্যবস্থা বিদ্যমান। ওখানে দুজন লোককে এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে যে, তাদের উভয় বাহু রশি দ্বারা ছাদের সঙ্গে বাঁধা, পা দুটো মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে এবং পায়ের গোড়ালীর সঙ্গে অন্তত দশ সের ওজনের লোহা ঝুলানো। প্রচন্ড শীতের মধ্যেও তাদের সমস্ত শরীর ঘামে জবজবে হয়ে আছে। তাদের বাহু ছিঁড়ে কাঁধ থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে যেন। জায়গাটায় রক্ত ও পঁচা-গলা লাশের দুর্গন্ধে এক অসহনীয় পরিবেশ বিরাজ করছে।
এদেরকে দেখে নাও- গোমস্তগীন দুভাইকে উদ্দেশ করে বললেন- এই বন্দীশালায় আসার পূর্ব পর্যন্ত তোমরা আমার সেনাবাহিনীর মালিক ছিলে। এখন কর্মদোষে এখানে এসে স্থান নিয়েছ। তোমরা গাদ্দার। তোমরা আমার আস্তিনের তলে সাপ হয়ে পালিত হয়েছিলে। তবে আমি তোমাদেরকে এখনো ক্ষমা করে দিতে প্রস্তুত আছি। তোমরা আমাকে শুধু বলে দাও, যে দুটো মেয়েকে পালাবার সুযোগ করে দিয়েছ এবং তাদের সঙ্গে আরো যে দুজন পুরুষ গিয়েছে, তারা কোথায় গেছে এবং এখান থেকে কি কি তথ্য নিয়ে গেছে। জবাবে শামসুদ্দীন ও শাদবখত মুচকি হাসি দিয়ে চুপ করে থাকেন। গোমস্তগীন বললেন- তারা সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট গেছে। কী, মিথ্যা বললাম? শামসুদ্দীন ও শাদবখত কান দিলেন না। গোমস্তগীন বললেন- এই দুজনকে দেখে নাও। এরা যুবক বলে এখনো সহ্য করতে পারছে। তোমাদেরকে যদি এভাবে ঝুলিয়ে পায়ে বিশ সের ওজন বেঁধে দেই, তাহলে অল্পক্ষণের মধ্যেই বক্ষ উন্মুক্ত করে আমার সামনে রেখে দেবে। কিন্তু আমার পরামর্শ, এসব বাদেই তুমি আমাকে সব বলে দাও।
তারা কোন তথ্য নিয়ে যায়নি- শামসুদ্দীন বললেন- এখানে কোন তথ্য নেই। তোমার ব্যাপারে সালাহুদ্দীন আইউবী ভাল করেই জানেন যে, তুমি খৃষ্টানদের সহযোগিতা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছ। আইউবী পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই তোমাদেরকে পরাজিত করতে এসেছেন। এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার মত কোন তথ্য নেই। তথ্য শুধু এতটুকু ফাঁস হয়েছে যে, আমরা দুভাই তোমার ফৌজের সালার ছিলাম। তুমি আমাদেরকে বিশ্বস্ত মনে করতে। অথচ আমরা আসলে আইউবীর লোক।
অপর তথ্যটিও আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি- শামসুদ্দীনের ভাই শাদবখত বললেন- দুটি মুসলিম মেয়ে উপহার স্বরূপ তোমার কাছে এসেছিল। ঘটনাক্রমে আমরা জানতে পারলাম, তারা মজলুম এবং মুসলমান। তোমার কাজী ইবনুল খাশিব তোমার আগেই তাদেরকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমরা তাদেরকে নিজ কন্যা মনে করে পালাবার সুযোগ করে দিয়েছি এবং কাজী ইবনুল খাশিব আমাদের জন্য এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন যে, তাকে খুন করতে আমরা বাধ্য হয়েছি। তুমি ঘটনাটা জেনে ফেলেছ এবং আমাদেরকে গ্রেফতার করে বন্দী করে ফেলেছ। আমরা যদি ধরা না পড়তাম, তাহলে আমাদের পরিকল্পনা ছিল, যখন তুমি আমাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে প্রেরণ করতে, আমরা গোটা বাহিনীটিকে সুলতান আইউবীর বেষ্টনীর মধ্যে নিয়ে যেতাম এবং তাঁর হাতে আত্মসমর্পণ করে তোমাকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতাম। দুঃখ, আমাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হল না।
তারপরও আমরা সফল- শামসুদ্দীন বললেন- তুমি আমাদেরকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে দাও। আমাদেরকে ছাদের সঙ্গে ঝুলিয়ে আমাদের পায়ের সঙ্গে বিশ বিশ সের ওজনের পাথর বেঁধে দাও। আমাদের বাহু কাঁধ থেকে আলাদা করে ফেল। আমরা কষ্ট অনুভব করব না। আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য তীর ফুলে পরিণত হয়ে যায়। তাদের দেহ নিঃশেষ হয়ে যায়; আত্মা মরে না। আল্লাহর পথের পথিকের আত্মা আল্লাহর নিকট অতি প্রিয় বস্তু।
আমি তোমাদের ওয়াজ শুনতে আসিনি- গোমস্তগীন বললেন- ওহে বিশ্বাসঘাতকরা! তোমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট কী গোপন তথ্য প্রেরণ করেছ বল।
তুমি আমাদেরকে বিশ্বাসঘাতক বলছ- শামসুদ্দীন বললেন- এটাই আসল তথ্য, যা তুমি গোপন করতে চাচ্ছ যে, গাদ্দার কে? অনাগত বংশধরদের নিকট থেকে তুমি এ তথ্য গোপন করতে পারবে না যে, তুমি গাদ্দার। ইতিহাস চীৎকার করে করে বলবে, সালাহুদ্দীন আইউবী ফিলিস্তীনকে খৃষ্টানদের কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে মাঠে নেমেছিলেন; কিন্তু গোমস্তগীন নামক একজন মুসলিম দুর্গপতি তাঁর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।
