কিন্তু আপনার সালারগণ আপনাকে এরূপ কোন পরামর্শ দেয়নি। তারা আপনাকে একথাও বলেনি যে, সালাহুদ্দীন আইউবী আলরিস্তানের পার্বত্য অঞ্চলকে ঘাটি বানিয়ে তার বাহিনীকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত এমনভাবে ছড়িয়ে রেখেছেন যে, আপনি তাকে অবরোধ করার কল্পনাও করতে পারবেন না। তার গেরিলা সেনাদের সম্পর্কে তো আপনি ভালভাবে অবহিত। কিন্তু আপনার সালারগণ আপনার চোখে পট্টি বেঁধে এ বিষয়টাকে আপনার দৃষ্টির আড়ালে সরিয়ে রেখেছে যে, আইউবীর গুপ্তচর ও কমান্ডো সেনারা আপনার অন্তর থেকে তথ্য বের করে নিয়ে যেতে পারে এবং আপনার চোখে ধূলি দিয়ে আপনার হেরেমের মেয়েদেরকে তুলে নিয়ে যেতে পারেন। আপনার ফৌজ এখান থেকে রওনা হওয়া মাত্র আইউবী তাদের গতিবিধি, সংখ্যা ও গন্তব্য জেনে ফেলবেন।
মহামান্য সুলতান!- এক সালার ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললেন- আমরা কি এভাবেই আপনার অপমান সহ্য করে যাব? মসজিদে বসে রাত-দিন আল্লাহ আল্লাহ জিকিরকারী দরবেশ আমাদের গুরু হওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে! ইনি আমাদের সামনে আপনার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচারণ করে আপনাকে অপমান করছেন। আমরা এটা সহ্য করতে পারিনা।
আমাকে শুনতে দাও- সাইফুদ্দীন বললেন- আমি আমার মোহতারাম খতীবকে এখনো সম্মানের চোখেই দেখছি।
বলুন মুহতারাম খতীব!- অবজ্ঞার সুরে ইজুদ্দীন বললেন- শেষ পর্যন্ত আপনাকে একথাও বলতে হবে, আপনার আনুগত্য কার প্রতি। আমাদের প্রতি, নাকি সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রতি।
আমার আনুগত্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলেল প্রতি- ইৰ্জ্জুদ্দীনকে উদ্দেশ করে খতীব বললেন- আমি আপনার প্রশংসা করব যে, আপনি আপনার ভাইকে দু চারটা সত্য কথা শুনিয়েছেন। বাদবাকী কথা আপনিও চোখ-দেমাগ বন্ধ করে বলেছেন। ইমামুদ্দীনও তো আপনার ভাই। আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর সুহৃদ কেন এবং কেন আপনার সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন না?
আপনি আমাদের পারিবারিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন না- ইজুদ্দীন বললেন- আপনি আসলে প্রমাণ করতে চাচ্ছেন যে, সালাহুদ্দীন আইউবী খোদার পয়গাম্বর এবং আমাদের সকলকে তাকে সেজদা করতে হবে। আপনাকে শুধু বলা হয়েছিল, কুরআন থেকে ফাল বের করে বলুন আমাদের এই অভিযান সফল হবে না ব্যর্থ।
কুরআন তার বিধি-বিধান স্পষ্টভাবেই বর্ণনা করেছে- জোরালো কণ্ঠে খতীব বললেন- আমি আপনাদের সম্মুখে বাস্তব সত্যটা খোলাখুলি ব্যক্ত করেছি। সালাহুদ্দীন আইউবী খোদার প্রেরিত পয়গাম্বর নন। তিনি একটি ঝড়, একটি স্রোত, যা কুফরকে শুষ্ক তৃণলতার ন্যায় ভাসিয়ে নেয়ার জন্য দামেস্ক থেকে উঠে এসেছে। আপনারা সবাই বৃক্ষের ভেঙ্গে পড়া ডাল, যার পাতাগুলো একে একে ঝরে পড়ছে আর সেই স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে। আইউবী আপনাদের উপর চড়াও হননি- আপনারাই-ই বরং তাঁর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। আপনাদের পরিণতি তা-ই হবে, যা স্রোতের মুখে পড়া পত্র-পল্লবের হয়ে থাকে।
খতীব!- সাইফুদ্দীন গর্জে উঠে বললেন- অনুগ্রহপূর্বক আমার অন্তর থেকে আপনার মর্যাদাবোধ বের করে ফেলবেন না।
তুমি… সাইফুদ্দীন!- গম্ভীর কণ্ঠে খতীব বললেন- তুমি পৃথিবীর এই ক্ষুদ্র ভূখন্ডটির রাজা। ভয় কর সেই সত্ত্বাকে, যিনি উভয় জগতের বাদশাহ। আমাকে তোমার শ্রদ্ধা করার প্রয়োজন নেই। তুমি আমার মুখে থু থু নিক্ষেপ কর; তবু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথ থেকে সরে যেও না। তোমার উপর রাজত্বের নেশা চেপে বসেছে। এই আত্মমর্যাদাহীন সালার এবং তোমার প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ তোমাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য তোমাকে রাজা বানিয়েছে। তুমি বুঝছ না যে, এটা নিছক চাটুকারিতা এবং তুমি রাজা নও। তুমি জান না, এই চাটুকার লোকগুলো তোমার শত্রু, জাতি ও দেশের দুশমন। যখন তোমার পতন ঘনিয়ে আসবে, তখন এরা তোমাকে চিনতেও অস্বীকার করবে এবং সেই ব্যক্তির পাপোষ চাটবে, যে তোমার সিংহাসনে বসবে। আমার প্রতি ক্রুদ্ধ চোখে দৃষ্টিপাত কর না সাইফুদ্দীন! জাহান্নামে ঠিকানা নিও না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর। এই গোলাম মানসিকতার লোকগুলো বহু প্রতাপাম্বিত রাজা-বাদশাহকে ভিখারীতে পরিণত করেছে। ইতিহাস বলছে, এমনটি অতীতেও হয়েছে এবং হতে থাকবে। দুঃখ হল, রাসূলের উম্মতও এই ধ্বংসের পথে অগ্রসর হচ্ছে।
লোকটাকে এখান থেকে নিয়ে যাও- ক্ষোভ-কম্পিত কণ্ঠে গর্জে উঠলেন সাইফুদ্দীন- একে এমন জায়গায় আবদ্ধ করে রাখ, যেখান থেকে এর কণ্ঠ আমার কানে এসে না পৌঁছে।
এক সালারের ডাকে দুজন দেহরক্ষী ভিতরে প্রবেশ করে। তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হল, খতীবকে কয়েদখানায় নিয়ে যাও।
খতীব ইবনুল মাখদুমকে যখন দুবাহুতে ধরে কয়েদখানা অভিমুখে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন সাইফুদ্দীন তার কণ্ঠ শুনতে পান
রাজত্বের মোহ মানুষকে দ্বীন থেকে সম্পর্কহীন করে তোলে। তোষামদপ্রিয় শাসক জাতিকে বিক্রি করে খায়। কাফেরের বন্ধুত্ব শত্রুতা অপেক্ষা বেশী ক্ষতিকর। ফিলিস্তীন আমাদের। ফিলিস্তীন আমার রাসূলের। কাফেররা তোমাদেরকে পরস্পর এজন্য যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে, যাতে ফিলিস্তীনের উপর তাদের দখল অটুট থাকে। তোমরা যদি আপসে লড়াই করতে থাক, তাহলে প্রথম কেবলা তোমাদেরকে অভিশম্পাৎ করতেই থাকবে।
খতীব ইবনুল মাখদুমকে টেনে-হেঁচড়ে কয়েদখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আর তিনি চিৎকার করে এ কথা বলছেন। বহু সৈনিক বাইরে বেরিয়ে আসে এবং মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের ন্যায় সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে, খতীব ইবনুল মাখদুম পাগল হয়ে গেছেন এবং তাকে কয়েদখানায় আটকে রাখা হয়েছে।
