আমীরে মোহতারাম!–খতীব বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করলেন- একথা সঠিক যে, আপনি আমার দ্বারা কয়েকবার কুরআন থেকে ফাল বের করিয়েছিলেন। সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী মরহুমের জীবদ্দশায় আপনি একবার একদল ডাকাতকে ধাওয়া করেছিলেন। তখন আমি কুরআন থেকে ফাল বের করে আপনাকে সাফল্যের সুসংবাদ শুনিয়েছিলাম এবং আপনি সফল হয়ে ঘরে ফিরেছিলেন। আপনি যখন খৃষ্টানদের মোকাবেলায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, আমি কুরআন থেকে ফাল বের করে আপনাকে বিপদ সম্পর্কে সাবধান করেছিলাম ও কামিয়াবির সুসংবাদ প্রদান করেছিলাম। আল্লাহর শোকর, আমার বের করা প্রতিটি ফাল সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু…।
খতীব প্রথমে ইজুদ্দীনের প্রতি, তারপর সালারদ্বয়ের প্রতি তাকিয়ে বললেন
কিন্তু, মসুলের শাসনকর্তা! এবার ফাল বের না করেই আমি আপনাকে বলে দিতে পারব, আপনি যে অভিযানে বের হচ্ছেন, তাতে আপনি জয়লাভ করবেন, নাকি পরাজয়।
শীঘ্র বলুন মাননীয় শায়খ! অস্থির হয়ে সাইফুদ্দিন বললেন।
আপনি এমন শোচনীয় পরাজয় বরণ করবেন যে, যদি সময়মত পলায়ন না করেন, তাহলে আপনি নিঃশেষ হয়ে যাবেন–খতীব বললেন- আমার পরামর্শ, এ অভিযানে না আপনি নিজে যাবেন, না ভাইকে প্রেরণ করবেন, না আপনার ফৌজ পাঠাবেন।
সাইফুদ্দীনের চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে যায়। ইজুদ্দীন এবং সালারদ্বয়ের মুখও বন্ধ হয়ে যায়। খতীব সাইফুদ্দীনের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে থাকেন।
আপনি তো কুরআন খুললেনই না- সাইফুদ্দীন বললেন- কুরআন ছাড়া আপনি ফাল বের করলেন কিভাবে? আমি কিভাবে মেনে নেব যে, আপনি যে দুঃসংবাদ শোনালেন, তা সঠিক?
শুনুন মসুলের শাসক!–খতীব ইবনুল মাখদুম বললেন- আমি এতকাল কুবআন থেকে যেসব ফাল বের করে আপনাকে সুসংবাদ শুনিয়ে আসছিলাম, কুরআনের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিল না। কুরআন কোন জাদুমন্ত্রের বই নয়। কুরআন ঘোষণা করছে যে, এই কুরআনের যেসব বিধিবিধান রয়েছে, যে ব্যক্তি তা মান্য করবে, সে সফল হবে। আর যে তা অমান্য করবে, সে ব্যর্থ ও পরাজিত হবে। এর আগে আপনি ক্রুশের পূজরীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েছিলেন। তখন আমি বলেছিলাম, আপনি কামিয়াব হবেন। তারপর আপনি যখনই যে অভিযানে গিয়েছিলেন, আমি আপনাকে সাফল্যের সুসংবাদ শুনিয়েছি এবং বলেছি, এটা কুরআনের ফাল। প্রতিটি ফালই শুভ ছিল। তার কারণ একটি-ই ছিল যে, আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ ও কর্মকান্ড আল্লাহর বিধানের অনুকূলে ছিল। কিন্তু এখন আপনি যে অভিযানে বের হচ্ছেন, তা আল্লাহর বিধানের সুস্পষ্ট লংঘন ও বিরোধিতা। আপনি কাফেরদের হাতকে শক্তিশালী করছেন। তাদের সহযোগিতা নিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য নিবেদিত ঈমানদান লোকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাচ্ছেন।
আপনি কিসের ভিত্তিতে বলছেন, সালাহুদ্দীন আইউবী আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য নিবেদিত হয়ে এখানে এসেছেন?- উত্তেজিত কণ্ঠে সাইফুদ্দীন বললেন- আমি তো বলছি, তিনি একটি বিস্তৃত সাম্রাজ্যের রাজা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এসেছেন। আমরা তাঁর এই স্বপ্ন পূরণ হতে দেব না। তাকে এখানে যমে টেনে এনেছে। আমরা প্রথমে তাকে যমের হাতে তুলে দিয়ে তারপর ক্রুশের পূজারীদের খতম করব।
অন্তসারশূন্য শব্দমালা দ্বারা আপনি আমাকে ধোকা দিতে পারেন আল্লাহকে নয়- খতীব বললেন- আমাদের কার অন্তরে কী আছে, আল্লাহ পাকের সবই জানা আছে। বিজয় তার কপালেই জুটবে, যে নিজের নফসের উপর জয়ী হতে পেরেছে। এ মুহূর্তে আমি আপনাকে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ভবিষ্যদ্বানী করছি, পরাজয় আপনার কপালের লিখন হয়ে আছে। আপনি যদি ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় নেন এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করার জন্য দাঁড়ান, তবেই শুধু আপনার ললাটের লিখন টলতে পারে।
মোহতারাম খতীব!–ইজুদ্দীন বলে উঠলেন- আপনি আপনার ধর্ম আর মসজিদ নিয়ে ব্যস্ত থাকুন। সামরিক বিষয়াবলী ও রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড আপনি বুঝবেন না। আমি আপনাকে আমাদের মনোবল নষ্ট করার চেষ্টা না করার পরামর্শ দেব। যুদ্ধজয়ের সব উপকরণই আমাদের আছে, আপনার হয়ত তা জানা নেই।
আপনি যদি যুদ্ধকে ধর্ম ও মসজিদ থেকে আলাদা করে লড়াই করেন, তাহলে না হৃদয় আপনার সঙ্গ দেবে, না জযবা- খতীব বললেন- আপনি ঠিকই বলেছেন যে, আমি সামরিক বিষয়ে অনভিজ্ঞ। কিন্তু আমি এ কথাটা জানি যে, যুদ্ধ শুধু অস্ত্র আর ঘোড়া দ্বারা জয় করা যায় না এবং সেই সামরিক যোগ্যতার বলেও জয় করা যায় না, আপনি যার জন্য গর্বিত এবং যার উপর নির্ভর করে আপনি কুরআনের বিরুদ্ধাচারণে লিপ্ত হচ্ছেন। আরো একটি বিষয় এমন রয়েছে, যা জয়কে পরাজয়ে পরিণত করে দেয়।
সবাই চকিত নয়নে তাঁর প্রতি তাকিয়ে থাকে। তিনি বললেন—
যে শাসক চাটুকারিতা পছন্দ করে সে নিজের সঙ্গে দেশ ও জাতিকে নিয়ে একসঙ্গে ডুবে মরে। সে শাসক রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডকে চাটুকার ও দাস মানসিকতাসম্পন্ন লোকদের হাতে তুলে দিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিকে অন্নহীন, বস্ত্রহীন ও দাসানুদাস প্রজায় পরিণত করে ছাড়ে। আর এই শাসক যখন ফৌজের কমান্ড চাটুকার সালারদের হাতে তুলে দেয়, তখন দুশমন দেশটাকে হজম করে ফেলে। চাটুকার সেনা অধিনায়ক তার অধীনদের দ্বারা চাটুকারিতা আদায় করে। তারপর দেশ ও জাতির জন্য লড়াই করার পরিবর্তে শাসকের সন্তুষ্টি অর্জন তাদের লক্ষ্যে পরিণত হয়। আমি এই দরবারেই দেখলাম যে, উপস্থিত দুসালারই আপনার হা-এর সঙ্গে হ্যাঁ মিলার কসরত করেছে এবং এমন আবেগময় কথা-বার্তা বলেছে, যা একজন যোদ্ধ বলে না। তারা উভয়ে আপনার সিদ্ধান্ত ও প্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা করেছে বটে; কিন্তু আপনাকে সমস্যা সম্পর্কে অবহিত করেনি। তারা আপনাকে এইকথা জানায়নি যে, খৃষ্টানরা আমাদের সকলকে ঘিরে রেখেছে। আল-আক্সা কাফেরদের দখলে। এমতাবস্থায় ভাল হবে, আপনি গোমস্তগীন ও হাবের আমীর প্রমুখ সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট গিয়ে যোগ দিন এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর দুশমন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করুন। আর যদি আপনি ই সত্য পথের অনুসারী হয়ে থাকেন, তাহলে আইউবীকে মিথ্যুক ও ক্ষমতালোভী প্রমাণ করুন।
