সালাহুদ্দীন আইউবীর মাথা কেটে আমরা আপনার পায়ে রাখব- দ্বিতীয় সালার বললেন- তার ফৌজ আলরিস্তানের উপত্যকা থেকে জীবিত বের হতে পারবে না। আপনি এখনি রওনা হওয়ার নির্দেশ দিন। বাহিনী প্রস্তুত।
উভয় সালার একজন অপরজনের চেয়ে নিজের অফাদারী প্রকাশে ব্যাকুল। ইজুদ্দীন চুপচাপ বসে অপেক্ষা করছেন কখন তার পালা আসবে। খতীব ইবনুল মাখদুম কখনো সালারদ্বয়ের প্রতি, কখনো সাইফুদ্দীনের প্রতি দৃষ্টিপাত করছেন। আবার কখনো মাথা নত করে বসে থাকছেন।
ইজুদ্দীন! তোমার মতামত কী বল। ভাইকে উদ্দেশ করে সাইফুদ্দীন বললেন।
আমি আপনার এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত যে, আমাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে- ইজুদ্দীন বললেন- কিন্তু আমাদের সালারদের এজাতীয় আবেগময় বক্তব্য আমি সমর্থন করি না। আইউবী খৃষ্টান ও সুদানীদের পরাজিত করতে পারেন আমাদেরকে নয় শুধু এ ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়লেই আইউবীকে পরাজিত করা যাবে না। আমি বরং বলব, যার স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিজেদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশী খৃষ্টান সেনাকে পরাজিত করতে পেরেছে, সেই তিনি আপনাকেও পরাজিত করতে পারবেন। যিনি মরুভূমির সৈন্যদের দ্বারা তুষারাবৃত এলাকায় যুদ্ধ করিয়ে চার চারটি দুর্গ জয় করলেন এবং রেমন্ডের বাহিনীকে পিছনে সরে যেতে বাধ্য করলেন, তিনি বরফ গলে যাওয়ার পর আরো ভালভাবে যুদ্ধ করতে পারবেন। আমাদের কোন প্রকার আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হওয়া উচিত হবে না। শত্রুকে কখনো দুর্বল ভাবতে নেই। কিরূপ পরিবেশ-পরিস্থিতিতে এবং কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা করতে হবে, তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে।
ইজুদ্দীন সুলতান আইউবীর সৈনিকদের বৈশিষ্ট্যের বিবরণ প্রদান করেন। তারপর আইউবীর লড়াই করার পদ্ধতি বিবৃত করেন এবং সামনের যুদ্ধটা যে ময়দানে সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তার উপর আলোকপাত করে বললেন- বরফ গলতে শুরু করেছে। এ বছর বর্ষা শুরু হয়েছে বিলম্বে। সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ তাঁবুতে অবস্থান করছে। কিন্তু উট-ঘোড়া তো আর তাবুতে রাখা যায় না। এ সময়ে তার ফৌজের উট-ঘোড়াগুলো গাছের তলে কিংবা গুহায় বাস করছে। উট-ঘোড়া এভাবে সুস্থ্য-সবল থাকতে পারে না। তাছাড়া এই আশাও রাখা যায় যে, আইউবীর সৈনিকরা পাহাড়ী অঞ্চলে অবস্থান করে করে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে উঠেছে। তাছাড়া আমাদেরকে এ বিষয়টাও নজরে রাখতে হবে যে, আমরা যদি আমাদের বাহিনীকে হাল্ব ও হাররানের বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করে যুদ্ধ করি, তাহলে আইউবীকে ঘিরে ফেলা সহজ হবে। কিন্তু আমাদেরকে একথা ভুলে গেলে চলবে না, মুসলমান সৈনিক যখন মুসলমান সৈনিকের মুখোমুখি হবে, তখন ইসলামের চিরন্তর আত্মীয়তা তাদেরকে সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে আলিঙ্গনাবদ্ধ করতে পারে। যে তরবারী পরস্পর যুদ্ধ করতে কোষমুক্ত হয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হবে, তা অবনমিতও হয়ে যেতে পারে এবং রক্ত না ঝরিয়ে-ই কোষে ফিরে যেতে পারে।
ইজুদ্দীন!–ইজুদ্দীনকে থামিয়ে দিয়ে সাইফুদ্দীন বললেন- তুমি একজন সৈনিক মাত্র। তুমি রক্ত, তরবারী আর তরবারীর কোষের কথা ভাবতে পার শুধু। মুসলমান সৈনিককে মুসলমান সৈনিকের বিরুদ্ধে কিভাবে লড়াতে হয়, সেই কৌশল তোমাকে আমার নিকট থেকে শিখতে হবে। আগামী পরশু রমযান শুরু হচ্ছে। সালাহুদ্দীন আইউবী নিজে নামায-রোযার যতটুকু পাবন্দ, ততটুকু পাবন্দী তার সৈন্যদের দ্বারাও করিয়ে থাকেন। যুদ্ধটা যখন শুরু হবে, তখন তার সব সৈন্য রোযাদার থাকবে। আমরা আমাদের সৈন্যদেরকে বলে দেব, যুদ্ধের সময় রোযা রাখার পাবন্দী নেই। মাননীয় খতীব সাহেব তোমাদের মাঝে উপস্থিত আছেন। আমি তার পক্ষ থেকে ঘোষণা করিয়ে দেব যে, যুদ্ধের সময় রোযা মাফ। আমরা হামলা করব দুপুরের পর। সকাল বেলা হামলা করলে তখন আইউবীর সৈন্যরা তরতাজা থাকবে। দুপুরের পর আমাদের সৈন্যদের পেটে খাবার থাকবে আর আইউবীর সৈন্যরা থাকবে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর। আমি শুধু এটুকু জানতে চাই যে, সালাহুদ্দীন আইউবীর বিপক্ষে লড়াই করার সিদ্ধান্তটা সঠিক কিনা।
আপনার এই সিদ্ধান্ত যথার্থ। এক সালার বললেন।
আমরা আপনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করে প্রমাণ দেব, এই সিদ্ধান্ত সর্বদিক থেকেই সঠিক। আরেক সালার বললেন।
আমি আপনার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে কোন কথা বলিনি- ইজুদ্দীন বললেন আপনাকে আমি আরো একটি পরামর্শ দেব। আপনি আমাকে রিজার্ভ রেখে দিন। যদি প্রয়োজন পড়ে, তাহলে আমি পরে সময়মত হামলা করব। প্রথম সংঘর্ষের কমান্ড আপনি নিজের হাতে রাখুন।
তা-ই হবে- সাইফুদ্দীন বললেন- বাহিনীকে দুভাগে ভাগ করে নাও এবং দ্রুত প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দাও। রিজার্ভ বাহিনীটিকে তোমার কাছে রাখ।
***
খতীব ইবনুল মাখদুম বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সাইফুদ্দীন তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করে মুচকি হেসে বললেন- মহামান্য খতীব! আপনি একাধিকবার কুরআন থেকে ফাল বের করে আমাকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। আপনি মহান আল্লাহর দরবারে আমার নিরাপত্তা ও বিজয়ের জন্য দুআও করেছিলেন। আপনি জানেন, আমি আপনার অপেক্ষা আর কাউকে বড় বুজুর্গ মনে করি না। মানুষের যদি কোন মানুষকে সেজদা করার অনুমতি থাকত, তাহলে আমি আপনাকে সেজদা করতাম। এ মুহূর্তে আমি এমন এক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছি, যার সফলতার কোন নিশ্চয়তা নেই। আমি একটি শক্তিশালী দুশমনের মোকাবেলায় যাচ্ছি। যুদ্ধে জয় হয়, নয় পরাজয়। আপনি কোরআন থেকে ফাল বের করে আমাকে বলুন, এ যুদ্ধে আমার ভাগ্যে বিজয় লেখা আছে, পরাজয়।
