সুলতান আইউবীর উপর অভিযোগ আরোপ করা হয়েছিল যে, তিনি মুসলমানদের উপর সেনা অভিযান পরিচালনা করছেন। এই দুর্নাম রটনাকারীদের প্রধান লোকটি ছিলেন আব্বাসী খেলাফতের সমর্থক, যাকে সুলতান আইউবী মিশরে পদচ্যুৎ করেছিলেন। এক কথায় এই মুসলিম শাসক ও আমীরগণ সুলতান আইউবীর ফিলিস্তীন স্বাধীন করার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রথম কেবলা কাফেরদের দখলে এই বাস্তবতা সুলতানকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থির হতে দিচ্ছিল না। তিনি ইহুদীদের প্রত্যয়-পরিকল্পনা সম্পর্কেও বে-খবর ছিলেন না। তিনি জানতেন, ইহুদীরা দাবি করে ফিরছে, ফিলিস্তীন তাদের জন্মভূমি এবং প্রথম কেবলা বাইতুল মোকাদ্দাস মুসলমানদের নয়- ইহুদীদের উপাসনালয়। ইহুদীরা স্বসৈন্য সামনে আসছে না বটে; কিন্তু তারা খৃষ্টানদেরকে আর্থিক সাহায্য প্রদান করে যাচ্ছে। তারা খৃষ্টানদেরকে সবচে ভয়াবহ যে-সহযোগিতাটা দিয়ে রেখেছিল, তা ছিল, অসাধারণ রূপসী যুবতী, অতিশয় বিচক্ষণ ও চতুর নারীর আকারে। সেসব মেয়েকে গুপ্তচরবৃত্তি এবং মুসলমানদের চরিত্র ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করা হত।
সুলতান আইউবীকে আরো একটি বাস্তবতা বেশী অস্থির করে রেখেছিল যে, খৃষ্টান সৈন্যরাও তার বিরুদ্ধে সোচ্ছার, যাদের ঊর্ধ্বতন কমান্ডার ও ম্রাটগণ তার বিরুদ্ধবাদী মুসলদানদেরকে উষ্কানী দিয়ে যাচ্ছিল।
এমত পরিস্থিতিতে সুলতান আইউবী অতিশয় সাবধানতার সঙ্গে পা বাড়াচ্ছিলেন। তিনি তার বাহিনীকে অত্যন্ত সুশৃংখলভাবে বিন্যস্ত করে নেন এবং তাঁর গোয়েন্দা ব্যবস্থাপনাকে দুশমনদের এলাকায় প্রেরণ করে রাখেন। তাঁর যুদ্ধ পরিকল্পনার মধ্যে বেশী ভরসা ছিল কমান্ডো বাহিনী ও গুপ্তচরদের উপর।
***
হালবের দূত পৌঁছে গেছে মসুলেও। আল-মালিকুস সালিহ ও তার আমীরগণ মসুলের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীনের জন্য প্রেরিত পয়গামের সঙ্গে উপহার প্রেরণ করেছিলেন। তাতে তেমনি দুটি মেয়েও ছিল, যেমনটি প্রেরণ করা হয়েছিল হাররানের দুর্গপতি গোমস্তগীনের নিকট। হাররানে তো দুজন ভারতীয় সেনাপতি শামসুদ্দীন ও শাদবখত মেয়ে দুটোকে পালাবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন এবং সে সূত্রে কাজী ইবনুল খাশিবকে হত্যা করে নিজেরা কয়েদখানায় বন্দী হয়েছিলেন। কিন্তু মসুলে প্রেরিত মেয়ে দুটো সাইফুদ্দীনের হাতে পৌঁছে যায় এবং সাইফুদ্দীন তাদেরকে সাদরে বরণ করে নেন। এই দুটো মেয়ে তার হেরেমের শোভা আরো বাড়িয়ে তোলে। দূত সাইফুদ্দীনকেও সে একই পয়গাম পৌঁছায়, যা পৌঁছিয়েছিল আরেক দূত গোমস্তগীনকে। তাহল, খৃষ্টানরা হাল্ববাসীকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে প্রতারণা করেছে। সে কারণে তাদের উপর বেশী আস্থা রাখা যাবে না। তবে তাদের বন্ধুত্ব থেকেও হাত গুটানো ঠিক হবে না। তাদের থেকে সাহায্য গ্রহণ করার উত্তম পন্থা হল, আমরা পরস্পর ঐক্যবদ্ধ হয়ে সুলতান আইউবীর উপর হামলা করব। তিনি আলরিস্তানের পর্বতমালায় হামাতের শিং নামক স্থানে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় যদি আমরা তার উপর হামলা করি, তাহলে খৃষ্টানরা পিছন দিক থেকে তাদের উপর হামলা করবে।
বার্তার সঙ্গে একটি পরিকল্পনাও ছিল। তাতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, আলরিস্তানের বরফ গলছে। গোয়েন্দাদের সংবাদ মোতাবেক বরফের প্রবাহমান পানির তোড়ে সুলতান আইউবীর মোর্চাসমূহ তছনছ হয়ে গেছে। আমরা তিনটি বাহিনী একত্রিত হয়ে তাকে সেই উপত্যকায় অবরুদ্ধ করে অনায়াসে পরাজিত করতে পারি। বার্তায় আরো উল্লেখ করা হয়েছিল, গোমস্তগীনকেও পয়গাম প্রেরণ করা হয়েছে। আশা করছি, তিনি আমাদের সামরিক জোটে অংশগ্রহণ করবেন। আপনিও সময় নষ্ট না করে জোটে এসে যোগ দিন। তবেই সালাহুদ্দীন আইউবীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা সম্ভব হবে।
বার্তাটা পেয়েই সাইফুদ্দীন তার ভাই ইজুদ্দীন, দুজন সিনিয়ন সেনা অধিনায়ক ও মসুলের স্বনামধন্য খতীব ইবনুল মাখদুম কাকবুরীকে নিয়ে বৈঠকে বসেন।
তিনি সকলকে দূতের বার্তাটা শুনিয়ে বললেন
আপনারা আমার এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ভালভাবে অবগত আছেন যে, আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর আনুগত্য মেনে নেব না। তার শিরায় যে খুন প্রবাহিত, আমার শিরায়ও সেই একই খুন বিদ্যমান। আপনারা আমাকে শুধু এই পরামর্শ দিন যে, আমরা জোটে যোগ দেব কি-না। আমার ইচ্ছা হল, আমাদের বাহিনী প্রকাশ্যে সম্মিলিত বাহিনীর অধীনে থাকবে। কিন্তু আপনারা লড়াই করবেন আলাদাভাবে। যাতে আমাদের বাহিনী যে যে এলাকা জয় করবে, তার অধিকর্তা আমি ছাড়া কেউ না হতে পারে।
আপনি যে সিদ্ধান্ত স্থির করেছেন, তার চেয়ে উত্তম সিদ্ধান্ত আর কিছু হতে পারে না। আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এক সালার বললেন।
সালাহুদ্দীন আইউবী খৃষ্টান ও সুদানীদেরকে পরাজিত করতে পারেন আমাদেরকে নয়। আরেক সালার বললেন- আপনি আপনার বাহিনীকে সম্মিলিত বাহিনীতে যুক্ত করে নিন। কিন্তু কমান্ড রাখুন নিজের হাতে। আমরা আমাদের সৈন্যদের দ্বারা এমনভাবে যুদ্ধ করাব যে, আমাদের বিজয় হাল্ব ও হাররানের বাহিনী থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা দেখা যাবে।
আমরা আপনার আদেশের সামনে নিজেদেরকে কোরবান করে দেব মাননীয় সম্রাট- প্রথম সালার বললেন- আমরা আপনাকে সেই সালাতানাতে ইসলামিয়ার রাজা বানাব, সালাহুদ্দীন আইউবী যার স্বপ্ন দেখছেন।
