চারটি ঘোড়া ফটক অতিক্রম করেই ছুটে চলে। শামসুদ্দীন এবং শাদবখতেরও বেরিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কি যেন ভেবে তারা ফিরে আসেন।
গোমস্তগীন ঘুম থেকে জেগে বেরিয়ে এসেছেন। দূতকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে এবং কোথা থেকে এসেছ? দূত তার পরিচয় প্রদান করে। দূত উপহারস্বরূপ নিয়ে আসা মেয়ে দুটোর কথাও বলল। কিন্তু গোমস্তগীন মেয়েদেরকে দেখতে পেলেন না। শামসুদ্দীন ও শাদবখত বললেন- তারা চলে গেছে। কারণ, তারা মুসলমান। যেখানে তাদের ইজ্জত নিরাপদ থাকবে, আমরা তাদেরকে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছি। তারা গোমস্তগীনকে জানালেন, কাজী সাহেবের লাশ ভিতরে পড়ে আছে।
গোমস্তগীন লাশটা দেখলেন। তিনি জ্বলে ওঠলেন। সালার শামসুদ্দীন আলী ও শাদবখত আলীকে বন্দী করে ফেললেন।
চারজন অশ্বারোহী দ্রুত ঘোড়া হাঁকিয়ে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য নিয়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর উদ্দেশ্যে ছুটে চলছে। সুলতান আইউবী আলরিস্তানের পাহাড়ী এলাকায় বসে হাসান বিন আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করছেন- শামসুদ্দীন ও শাদবখতের পক্ষ থেকে কোন সংবাদ এসেছে কি?
৪.৫ ভয়ংকর ষড়যন্ত্র
ভয়ংকর ষড়যন্ত্র
কাজী ইবনুল খাশিবের খুন এবং উপহার স্বরূপ আসা মেয়ে দুটোকে পালাবার সুযোগ করে দেয়ার অপরাধে যে সময় সালার শামসুদ্দীন ও শাদ বখৃতকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, ঠিক তখন অপর এক দূত মসুলে গাজী সাইফুদ্দীনের নিকট গিয়ে পৌঁছে। গাজী সাইফুদ্দীন খেলাফতের অধীনে মসুল ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকার গবর্নর হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর পর তিনি নিজেকে মসুলের স্বাধীন শাসক হিসেবে দাবি করে বসেন। তিনি চরিত্র ও চিন্তা-চেতনার দিক থেকে ছিলেন আইউবীর বিপরীত। মসুল ছিল ইসলামী সালতানাতের অঙ্গ। কিন্তু সাইফুদ্দীন তথাকার স্বাধীন শাসকে পরিণত হয়ে বসেন এবং সুলতান আইউবীর শত্রু পক্ষের সঙ্গে যোগ দেন। তার ভাই ইজুদ্দীন একজন অভিজ্ঞ সেনা অধিনায়ক ছিলেন। সেনা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কমান্ড ছিল তার হাতে। সাইফুদ্দীন যেহেতু নিজেকে রাজা মনে করতেন, তাই তার চাল-চলনও ছিল রাজকীয়। তিনি দেশ বিদেশের সুন্দরী নারী ও নর্তকী দ্বারা তার হেরেম পরিপূর্ণ করে রেখেছিলেন। নারী-নর্তকীর পর তার দ্বিতীয় সখের বস্তু ছিল পাখি। তার হেরেমে যেমন একটি অপেক্ষা অপরটি সুন্দরী নারী শোভা পেত, তেমনি তার ঘরে শোভা পেত খাঁচাভর্তি রং-বেরংয়ের পাখি। নারী আর পাখি নিয়েই ছিল তার জীবন।
ভাই ইজুদ্দীনের সামরিক যোগ্যতার উপর পূর্ণ আস্থা ছিল সাইফুদ্দীনের। তার আশা ছিল, ইজুদ্দীন সুলতান আইউবীকে পরাজিত করে তার জন্য স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন। এ লক্ষ্যে তিনি হাররানের দুর্গপতি গোমস্তগীনের এবং কথিত শাসক আল-মালিকুস সালিহ-এর ন্যায় নিজের জন্য খৃষ্টান উপদেষ্টা নিয়োগ করে রেখেছিলেন, যারা তাকে আশা দিয়ে রেখেছিল, সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে খৃষ্টানরা তাকে সাহায্য করবে। এভাবে মুসলমানদের তিনটি বাহিনী সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। একটি হালবে, একটি হাররানে এবং একটি মসুলে। তারা ছিল বড় বড় মুসলিম শাসক ও আমীর। ছোট ছোট শেখ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম প্রদেশের নবাবগণ- যাদের সংখ্যা বহু- তারা এই তিন বৃহৎ শাসকের সমর্থক ও সহযোগি ছিল। তারা এই তিন শাসনকর্তাকে সামরিক ও আর্থিক সাহায্যদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছিল এবং দিচ্ছিলও। তাদেরকে বুঝানো হল, সুলতান আইউবী যদি জয়লাভ করে বসেন, তাহলে যেভাবে তিনি মিশর ও সিরিয়াকে একীভূত করে একটি সাম্রাজ্য গঠন করেছিলেন, তেমনি প্রতিটি মুসলিম প্রদেশকে তাঁর সালতানাতে সংযুক্ত করে প্রত্যেককে তাঁর নিজের গোলামে পরিণত করে ফেলবেন।
তারা বাহ্যত ঐক্যবদ্ধ ছিল। কিন্তু ভিতর থেকে ছিল চরম অনৈক্য। আমি অন্যের তুলনায় দুর্বল থাকি এমনটা তাদের কেউ কামনা করত না। তাদের অবস্থা ছিল ছোট ও বড় মাছের মত। প্রতিটি ছোট মাছ বড় মাছকে ভয় করে চলে এবং কামনা করে, আমিও বড় মাছ হয়ে যাই।. সুলতান আইউবী গোয়েন্দাসূত্রে ভালভাবেই অবহিত ছিলেন যে, তার বিরুদ্ধবাদীদের মধ্যে কপটতা বিদ্যমান। তথাপি তিনি কোন ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। তিনি সবসময় এই বাস্তবতাকে সামনে রাখতেন যে, তিনটি বৃহৎ বাহিনী তার মুখোমুখি দন্ডায়মান। ফৌজ যেমনই হোক, ফৌজ-ই- তারা ভেড়া-বকরীর পাল নয়। তাঁর এই অনুভূতিও ছিল, এই ত্রিপক্ষের কমান্ডার ও জওয়ানরা মুসলমান এবং আল্লাহ পাক যে পরিমাণ সামরিক যোগ্যতা ও বীরত্ব মুসলমানদেরকে দান করেছেন, অন্য জাতিকে তা দান করেননি। ইতিহাস সাক্ষী, খৃষ্টানরা চার পাঁচগুণ বেশী শক্তিধর বাহিনী নিয়ে হামলা করা সত্ত্বেও স্বল্পসংখ্যক নিরস্ত্রপ্রায় মুসলিম সৈনিক তাদেরকে পরাজিত করেছে।
সুলতান আইউবী হাল অবরোধ করে পরিস্থিতি আন্দাজ করে নিয়েছিলেন। একদল মুসলিম বাহিনী আরেকদল মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলায় অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। হাবের মুসলিম সৈনিকরা এবং সেখানকার মুসলিম জনসাধারণ যেরূপ উদ্দীপনা ও বীরত্বের সঙ্গে হাব রক্ষা করল, তাতে সুলতান আইউবীর পা ফসকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তিনি এই লড়াইয়ের কথা ভুলতে পারছিলেন না।
