গোমস্তগীনের এই কাজীটার উপর শয়তান এমনভারে জেঁকে বসেছে যে, তিনি শামসুদ্দীন ও শাদবখতের বক্তব্যকে ক্রিপে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন এবং হেসে বললেন- আসলে হিন্দুস্তানী মুসলমানরা হৃদয়মরা মানুষ। আচ্ছা, তোমরা হিন্দুস্তান থেকে এদেশে কেন এসেছ?
মন দিয়ে শোন বন্ধু!- শামসুদ্দীন বললেন- আমি তোমাকে শুধু এ কারণে শ্রদ্ধা করি যে, তুমি বিচারক। অন্যথায় তোমার আসল পরিচয় তো আমার জানা আছে। তুমি আমার একজন অধীন কমান্ডার ছিলে। তুমি এই পদমর্যাদা অর্জন করেছ তোষামোদ আর চাটুকারিতার বলে। তোমার আত্মমর্যাদাকে জাগ্রত করার লক্ষ্যে আমরা হিন্দুস্তান থেকে কেন এসেছি, তার হেতু বলছি। ছয়শত বছর আগের কথা। মোহাম্মদ বিন কাসিম নামক এক যুবক সেনাপতি একটি নির্যাতিত মেয়ের আর্তনাদে সাড়া দিয়ে এই ভূখণ্ড থেকে হিন্দুস্তান গিয়ে হামলা করেছিলেন। তুমি তো জান, এখান থেকে হিন্দুস্তানের দূরত্ব কতটুকু। তুমি কি অনুমান করতে পারছ, যুবকটি তার বাহিনীকে কিভাবে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন? তুমি নিজেও একজন সৈনিক। লোকটা এত দূরত্ব পথ অতিক্রম করে রসদ ও পিছনের সাহায্যপ্রাপ্তির আশা ব্যতীত কিভাবে যুদ্ধ করল, তুমি তো তা বুঝ। আবেগের জগত থেকে বেরিয়ে বাস্তবতা একটু ভেবে দেখ…।
মোহাম্মদ বিন কাসিম এমন কঠিন পরিস্থিতিতে বিজয় অর্জন করলেন যে, ঐ পরিস্থিতিতে তার পরাজয় বরণ করার সম্ভাবনাই ছিল বেশী। তিনি শুধু রাজ্য জয়-ই করেননি, হিন্দুস্তানীদের হৃদয়গুলোও জয় করে নিলেন এবং কোন জুলুম নির্যাতন ছাড়া সেই কুফরের মাটিতে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করলেন। তারপর একদিন তিনি মারা গেলেন। যে লোকগুলো এত পথ অতিক্রম করে একটি মেয়ের ইজ্জতের প্রতিশোধ নিলেন এবং ইসলামের আলো ছড়ালেন, তারা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। দেশটা এমন রাজা-বাদশাহদের হাতে চলে যায়, যারা মুজাহিদদের কাফেলায় ছিল-ই না। বিনা মূল্যে প্রাপ্ত দেশটায় তারাও সেসব কর্মকান্ড করতে শুরু করল, যা আজ এখানে চলছে। হিন্দুরা সে দেশের মুসলমানদের উপর জয়ী হতে শুরু করল, যেমন এদেশে খৃস্টানরা জয়ী হচ্ছে। সালতানাতে ইসলামিয়া নিঃশেষ হতে শুরু করল। আমরা যৌবনে পদার্পন করে দেখি, মোহাম্মদ বিন কাসিম ও তার যোদ্ধারা রক্ত দ্বারা যে রাজ্যটিকে জয় করেছিলেন, তার গোড়া শুকিয়ে গেছে। মুসলমান শাসকগণ আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছে। আমরা দুভাই- যাদের বংশ লড়াকু বংশ বলে খ্যাত- নিরাশ হয়ে দেশ ছেড়ে এদেশে চলে এসেছি। আমরা ভারতীয় মুসলমানদের দূত হয়ে এসেছি। ছিন্ন সম্পর্ক জুড়তে এসেছি…।
এসে আমরা সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি বললেন, কিভাবে আমি ভারতবর্ষের কথা ভাবতে পারি! কিভাবে আমি ভারত অভিযানের চিন্তা করতে পারি! আমার গোটা আরব ভূখন্ড গাদ্দারদের দ্বারা পরিপূর্ণ!
মরহুম জঙ্গী দূরের কোন অভিযানে এ কারণে যেতেন না যে, তার অবর্তমানে এখানে বিদ্রোহ ঘটে যাবে, যার দ্বারা উপকৃত হবে খৃস্টানরা। তিনি বললেন, আমার বড় আফসোস হয়, ভারতবর্ষে হিন্দুরা মুসলমানদের উপর জয়ী হচ্ছে আর এখানে জয়ী হচ্ছে খৃস্টানরা!
সুলতান জঙ্গী আমাদেরকে তার বাহিনীতে ভর্তি করে নেন। পরে গোমস্তগীন, সাইফুদ্দীন ও ইজুদ্দীন প্রমুখ যখন গোপনে গোপনে খৃস্টানদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে শুরু করেন, তখন জঙ্গী আমাদেরকে এ লক্ষ্যে গোমস্তগীনের বাহিনীতে প্রেরণ করেন, যেন আমরা তার গোপন তৎপরতার প্রতি নজর রাখি।
তার মানে তোমরা দুজন গুপ্তচর। তিরস্কারের সুরে কাজী ইবনুল খাশিব বললেন।
তুমি আমার বক্তব্য বুঝবার চেষ্টা কর- শামসুদ্দীন বললেন- তুমি তো দেখছ, আমাদের মুসলিম আমীরগণ সেই মর্দে মুজাহিদদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, যার লক্ষ্য ইসলামকে ক্রুশের হাত থেকে রক্ষা করা। আজকের দূত অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা নিয়ে এসেছে। শামসুদ্দীন বার্তাটি শুনিয়ে বললেন গোমস্তগীনের উপর তোমার প্রভাব আছে। তুমি তাকে ঠেকাতে পার। তুমি যদি আমাদের মতে একমত হও, তাহলে এস, আমরা গোমস্তগীনকে বুঝাবার চেষ্টা করি যে, আপনি গাদ্দারদের সঙ্গে ঐক্য গড়ার পরিবর্তে সুলতান আইউবীর সঙ্গে যোগ দিন। অন্যথায় তিনি এমন শোচনীয় পরাজয়বরণ করবেন যে, তাকে আজীবন কয়েদখানায় কাটাতে হবে।
তার আগে আমি তোমাদেরকে কয়েদখানায় আবদ্ধ করার ব্যবস্থা করছি ইবনুল খাশিব বললেন- মেয়ে দুটোকে আমার হাতে তুলে দাও।
ইবনুল খাশিব বসা থেকে ওঠে মেয়েরা যে কক্ষে অবস্থান করছে, সেই কক্ষের দিকে পা বাড়ায়। শাদবখত তারা বাহু ধরে পিছনের দিকে টেনে নিয়ে আসেন। বললেন- কোথায় যাচ্ছেন? ইবনুল খাশিব শাদবখতকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করেন। শাদবখত তার মুখের উপর সজোরে এক ঘুষি মারেন যে, ইবনুল খাশিস পেছন দিকে চীৎ হয়ে পড়ে যান। শামসুদ্দীন কক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে ইবনুল খাশিরের ধমনীতে পা রেখে এমনভাবে চেপে ধরেন যে, লোকটা কিছুক্ষণ ছটফট করে নির্জীব হয়ে যান।
ইবনুল খাশিব মারা গেলেন। তাকে হত্যা করা দুভাইয়ের উদ্দেশ্য ছিল না। তারা ভাবলেন, এবার আমাদের ধরা পড়া নিশ্চিত। তারা তাদের আরদালী দুজনকে ডেকে চারটি ঘোড়া প্রস্তুত করতে বললেন। ঘোড়া প্রস্তুত হয়ে গেল। শামসুদ্দীন ও শাদবখত মেয়ে দুটোকে দুটি ঘোড়ায় বসিয়ে দেন। আরদালীদেরকে তরবারী ও তীর-ধনুক দিয়ে অপর ঘোড়ায় সাওয়ার হতে বললেন। তারা সঙ্গে গিয়ে দুর্গের ফটক খুলিয়ে চারজনকে পালিয়ে যেতে বললেন। তাদেরকে বলে দেয়া হল, তোমরা সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছে যাবে। তারা আরদালীদেরকে গোমস্তগীনের পরিকল্পনাটা বিস্তারিত বলে দেন।
