মেয়েরা জানায়, —
আমাদের মন-মস্তিষ্ক থেকে ধর্ম ও চরিত্র বের করে দেয়া হয়েছিল। আমরা এক একটি সুদর্শন খেলনায় পরিণত হয়েছিলাম। কিন্তু যখন আমাদেরকে দামেস্ক পাঠানো হল, তখন আমাদের মস্তিষ্কে ধর্ম ও সচ্চরিত্রতা পুনরায় জেগে ওঠে। আমাদের রক্তে যে ইসলামী ঐতিহ্য ছিল, তা ফিরে এসে আমাদের আত্মাকে জাগ্রত করে। তখন আর আমাদের পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের ফিরে পাওয়ার সুযোগ ছিল না। আমরা মুসলিম শাসনকর্তা ও রাজা-বাদশাহদেরকে পিতা ও ভাই হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের একজনও আমাদেরকে কন্যা কিংবা বোনের চোখে দেখেনি। খৃস্টানদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়ে আমরা ততটুকু কষ্ট পায়নি, যতটুকু কষ্ট এই মুসলিম ভাইদের নিকট এসে পেয়েছি। কারণ, খৃস্টানরা আমাদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তা প্রত্যাশার বাইরে ছিল না। কিন্তু খৃস্টানরা আমাদেরকে যে মুসলমানদের নিকট প্রেরণ করেছিল, আমরা তাদের হাতে ধরেছি পায়ে ধরেছি। ইসলাম, আল্লাহ ও রাসূলের দোহাই দিয়েছি যে, আমরা আপনাদের কন্যা। আমরা নির্যাতিতা। আমরা আপনাদের মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। মদ ও শয়তান তাদের চোখে চাঁদ-তারা আর ক্রুশের মাঝে কোন ব্যবধান থাকতে দেয়নি…।
আমাদের ভিতরে প্রতিশোধের স্পৃহা জেগে ওঠে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দামেস্ক আগমনের সংবাদ শুনে আমরা অত্যন্ত আনন্দি হই। খৃস্টানদের এলাকায় মুসলমানরা সুলতান আইউবীর পথপানে চেয়ে আছে। আইউবীকে তারা ইমাম মাহদী মনে করে। তিনি যখন দামেস্ক আসেন, তখন আমরা প্রতিজ্ঞা নেই, যেভাবে হোক, আমরা তাঁর নিকট যাব। তাঁকে বলব, আপনি আমাদেরকে আপনার ফৌজে রেখে দিন এবং আমাদের কিছু একটা কাজ দিন। কিন্তু আমাদেরকে সেখান থেকে জোরপূর্বক হাব নিয়ে আসা হল। এখন আমরা আপনাদের হাতে। আমরা আপনাদের নিকট এই প্রত্যাশা রাখতে পারছি না, আপনারা আমাদেরকে কন্যা হিসেবে বরণ করে নেবেন। তবে আমরা এটুকু অবশ্যই বলব যে, আমাদের সম্ভ্রম তো ছিন্নভিন্ন, ঈমানটুকু যেন নষ্ট না হয়।
আমরা যখন খৃস্টানদের নিকট ছিলাম, সেখানেও সুলতান আইউবী ও ইসলাম বিরোধী পরিকল্পনা হতে দেখেছি, তেমনি যখন মুসলমানদের নিকট ছিলাম, তখনও আইউবী বিরোধী তৎপরাত-ই দেখেছি। এখন আপনাদের পরীক্ষা নেয়ার পালা। আমরা শুনেছি, খৃস্টান মেয়েরা এখানে গুপ্তচরবৃত্তি করতে আসে। আপনারা আমাদেরকে খৃস্টানদের এলাকায় পাঠিয়ে দিন। আমাদের এ ভয় তো নেই যে, আমাদের ইজ্জত লুণ্ঠিত হবে। তাতে লুট হয়েই গেছে। আপনারা আমাদেরকে ইসলামের সুরক্ষা ও প্রসারের জন্য সুযোগ দিন।
মেয়ে দুটোর উপাখ্যান ও জীবন কাহিনী সালার শামসুদ্দীন ও সাদবখতকে চরম প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। তাদের আবেগ ও চেতনায় প্রচন্ড একটা ধাক্কা দেয়। সব শুনে তারা মেয়েদেরকে বললেন, তোমরা নিশ্চিন্ত থাক, এখন আর তোমাদেরকে কোন বিলাস পুজারী দুশ্চরিত্র শাসকের হাতে তুলে দেয়া হবে না।
***
শামসুদ্দীন ও শাদবখত বসে কথা বলছেন। হঠাৎ এক দেহরক্ষী ভিতরে প্রবেশ করে বলল, কাজী সাহেব এসেছেন। দুভাই অভ্যর্থনা কক্ষে চলে যান। কাজী সাহেব ইবনুল খাশিব আবুল ফজল বসে আছেন। লোকটা মধ্যবয়সী। তিনি বললেন- শুনেছি, হাল্ব থেকে দূত এসেছে এবং পয়গামের সঙ্গে উপহারও এসেছে।
হ্যাঁ- শাদবখত বললেন- দুর্গপতি ঘুমিয়ে আছেন বলে দূতকে আমাদের কাছে বসিয়ে রেখেছি।
আমি উপহার দুটো দেখতে এসেছি- ইবনুল খাশিব চোখ টিপে বললেন তাদেরকে এক ঝলক দেখাও তাড়াতাড়ি।
কাজী সাহেব কেমন চরিত্রের মানুষ দুভাইয়ের জানা আছে। লোকটা গোমস্তগীনকে মুঠোর মধ্যে রেখেছে। শামসুদ্দনি মেয়ে দুটোকে অভ্যর্থনা কক্ষে ডেকে পাঠান। তাদেরকে দেখে কাজী সাহেবের চোখ আটকে যায়। তিনি বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে বললেন- শাবাশ! …এত রূপ!
শামসুদ্দীন এক ঝলক দেখিয়েই মেয়ে দুটোকে কক্ষে পাঠিয়ে দেন। কাজী সাহেব বললেন- এদেরকে আমার হাতে তুলে দাও। আমি নিজে এদেরকে দুর্গপতির নিকট নিয়ে যাব। মনে হচ্ছে, যেন তার দুচোখ থেকে দুটি শয়তান উঁকি মারছে।
আপনি একজন বিচারক- শামসুদ্দীন বললেন- জাতির নিকট আপনার মর্যাদা গোমস্তগীনের চেয়েও উচ্চে। মানুষের ন্যায় বিচার আপনার হাতে।
কাজী সাহেব খিলখিল করে হেসে ফেললেন এবং বললেন- তোমরা সৈনিকরা আসলেই বোকা হয়ে থাক। নাগরিক জীবনের ব্যাপার-স্যাপার তোমরা কিছু বুঝ না। আরে, যে কাজির হাতে আল্লাহর আইন ও আদল ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হত, সেই কাজী মারা গেছেন। তিনি শাসনকর্তাকে নয় আল্লাহকে ভয় করতেন। শাসনকর্তা বরং তার ভয়ে মানুষের উপর অবিচার করা থেকে বিরত থাকতেন। এখন শাসনকর্তারা সেই ব্যক্তিদেরকে কাজী নিয়োগ করছেন, যারা অবিচারকে বৈধ সাব্যস্ত করেন এবং সংবিধানকে নয় শাসককে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে থাকেন। আমি আমার আল্লাহর নয় শাসনকর্তার কাজী।
আর তারই ফলে কাফেররা তোমাদের হৃদয়ের উপর জেঁকে বসেছে শাদবখত বললেন- ঈমান নীলামকারী শাসকের কাজী ঈমান নীলামকারীই হয়ে থাকে। তোমাদের ন্যায় বিচারকগণ-ই আল্লাহর রাসূলের উম্মতকে এই অধঃপাতে নামিয়ে এনেছে যে, আমাদের আমীর-শাসকগণ আপন কন্যাদের সম্ভ্রম নিয়ে পর্যন্ত তামাশা করছে। এরা আপনার মুসলিম কন্যা, যাদেরকে আপনি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন।
